856)(Story_69) মাটির শেকড় ও নীল পর্দা। _ Written by Junayed Ashrafur Rahman
856)(Story_69) মাটির শেকড় ও নীল পর্দা। _ Written by Junayed Ashrafur Rahman https://mywritingsjunayedmn1.blogspot.com/2019/12/about-me-junayed-ashrafur-rahman.html ✒
একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও সমকালীন উপন্যাস
🌟 The video of how to translate my writings into your language.(আমার লেখাগুলো যেভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে পড়বেন,সেটার ভিডিও।) https://youtube.com/shorts/cB4L80u1IIc?si=jJV-G14OIP_qQeLA 🌟https://www.facebook.com/share/v/1GuWS35Joi/
অধ্যায় এক.
কাঁচাচালক ও কম্পিউটারের নীল আলো
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। খালতলি নগরের প্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম শালবেষ্টের অধিকাংশ বাড়ির আলো নিভে গেছে। দূরের রেললাইনে মাঝেমধ্যে ট্রেন চলাচলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শীতের শেষ দিকের রাত। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস ঘরে প্রবেশ করছে। বাইরে ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক।
দোতলা বাড়ির একটি ঘরে তখনো আলো জ্বলছে। ঘরের অন্য সব আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে। শুধু কম্পিউটারের পর্দা থেকে বেরিয়ে আসা নীল আলো টেবিলের ওপর রাখা বই, খাতা ও অন্যান্য জিনিসের ওপর পড়ছে।
কম্পিউটারের সামনে বসে আছে রেহান।
বয়স আটাশ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর কয়েক বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিং করছে। প্রথম দিকে কাজ পাওয়া কঠিন ছিল। একেকটি কাজের জন্য অসংখ্য আবেদন পাঠাতে হয়েছে। কখনো ক্লায়েন্ট কাজ দিয়েও বাতিল করেছে, কখনো কয়েক দিন কাজ করার পর পারিশ্রমিক নিয়ে সমস্যা হয়েছে। আবার এমনও হয়েছে, পুরো সপ্তাহ কাজ করেও কোনো অর্ডার পায়নি।
কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলেছে।
কোডিং, ওয়েবসাইট তৈরি, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে দক্ষতা অর্জন করেছে সে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এখন নিয়মিত কয়েকজন ক্লায়েন্ট তার সঙ্গে কাজ করেন। প্রতি মাসে ভালো অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হচ্ছে।
তার ব্যাংক হিসাবের অর্থের পরিমাণও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
তবু এই মুহূর্তে তার মুখে আনন্দের কোনো বিশেষ চিহ্ন নেই।
কম্পিউটারের পর্দায় একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। ক্লায়েন্টের কাছে চূড়ান্ত ফাইল পাঠিয়ে রেহান চেয়ারে হেলান দিল। তারপর টেবিলের পাশে রাখা পানির বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেল।
তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। কয়েক মাস ধরে কাজের চাপ বেড়েছে। সময়ের পার্থক্যের কারণে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। কখনো রাত দুইটায় মিটিং, কখনো ভোরে কাজ জমা দেওয়ার সময়সীমা।
অর্থ উপার্জন হচ্ছে। পেশাগত পরিচিতিও তৈরি হয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, জীবনটা যেন শুধু একটি পর্দার মধ্যে আটকে যাচ্ছে।
একটি ই-মেইল আসে। নতুন ক্লায়েন্ট কাজের প্রশংসা করে পরবর্তী প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছেন। রেহান মেইলটি পড়ে উত্তর দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল।
টেবিলের এক কোণে রাখা পুরোনো নোটবুকটির দিকে তাকাল সে।
নোটবুকটির মলাট বিবর্ণ। কয়েকটি পাতা ভাঁজ হয়ে গেছে। বাবার হাতের লেখা রয়েছে তাতে। জমির হিসাব, বীজ কেনার খরচ, সার ও সেচের ব্যয় এবং বিভিন্ন মৌসুমের ফসলের পরিমাণ লেখা আছে।
বাবা জীবিত থাকতে নোটবুকটি ব্যবহার করতেন।
রেহান সেটি হাতে নিয়ে কয়েকটি পাতা উল্টাল। একটি পাতার নিচে ছোট করে লেখা—
'মাটি কখনো বিনা পরিশ্রমে কিছু দেয় না।'
বাক্যটি পড়ে তার মনে বাবার মুখ ভেসে উঠল।
তার বাবা মজিবর রহমান ছিলেন সাধারণ কৃষক। জমির পরিমাণ খুব বেশি ছিল না। কিন্তু নিজের জমি, পরিশ্রম এবং কৃষিকাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি জমিতে কাটিয়েছেন। কখনো ধান, কখনো সবজি, কখনো মৌসুমি ফলের চাষ করেছেন।
রেহান ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে জমিতে যেত। তখন মাটির কাজ তার কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হতো না। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে ভালো লাগত। বাবা যখন জমির আইল ঠিক করতেন, সে পাশের গাছের নিচে বসে থাকত।
বাবা কখনো জোর করে তাকে কৃষক বানাতে চাননি। বরং পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বলতেন।
তবে একটি কথা বারবার বলতেন।
"বাবা, যে কাজই করিস, নিজের হাতে কিছু একটা উৎপাদন করার অভ্যাস রাখবি। শুধু অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাবি না।"
রেহান একদিন প্রশ্ন করেছিল, "নিজের হাতে উৎপাদন বলতে কী বোঝাচ্ছ, বাবা?"
বাবা তখন জমির মাটি হাতে নিয়ে বলেছিলেন, "কৃষিকাজ করবি, ব্যবসা করবি, চাকরি করবি, কারিগরি কাজ করবি—যা ইচ্ছা। কিন্তু বাস্তব জীবনের কোনো কাজের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবি। শুধু কাগজের হিসাব আর মানুষের মুখের কথায় জীবন চলে না।"
রেহান হেসে বলেছিল, "আমি যদি কম্পিউটার দিয়ে অনেক টাকা আয় করি?"
"করবি। তাতে সমস্যা কী? কিন্তু কম্পিউটারে কাজ করিস বলে মাটির কাজ ভুলে যাবি কেন?"
সেদিন বাবার কথার গভীরতা সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
এখন বুঝতে পারছে।
রেহান জানে, ইন্টারনেট তার জীবনে অসাধারণ সুযোগ এনে দিয়েছে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। নিজের ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারছে। নিজের দক্ষতার মূল্য পাচ্ছে।
কিন্তু এই ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ার মধ্যে ঝুঁকি আছে।
কোনো মার্কেটপ্লেসের নীতিমালা পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো অ্যাকাউন্ট নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হতে পারে। পেমেন্ট ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্লায়েন্টের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে তার কোনো একটি দক্ষতার চাহিদাও কমে যেতে পারে।
এগুলো সে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে জানে।
কিন্তু তার চিন্তা শুধু ঝুঁকি এড়ানো নিয়ে নয়।
সে মনে করে, মানুষের জীবন কেবল উপার্জনের হিসাব নয়। মানুষকে নিজের চারপাশের বাস্তব সমাজের সঙ্গেও যুক্ত থাকতে হয়। মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, পণ্য কেনাবেচা করা, জমিতে কাজ করা, কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেওয়া—এসব অভিজ্ঞতার আলাদা মূল্য আছে।
ইন্টারনেট থেকে আয় যতই হোক, বাস্তব জীবনে তার একটি কাজ থাকতেই হবে।
কৃষিকাজ হতে পারে। ব্যবসা হতে পারে। চাকরি হতে পারে। একাধিক কাজও হতে পারে।
এই চিন্তা তার মধ্যে হঠাৎ তৈরি হয়নি। বাবার শিক্ষা, নিজের অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ করতে করতে এটি ধীরে ধীরে তার ব্যক্তিগত দর্শনে পরিণত হয়েছে।
সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
দূরে অন্ধকারের মধ্যে জমিগুলো দেখা যাচ্ছে না। তবু সে জানে, বাড়ির পেছনের জমিতে কয়েক সারি টমেটোগাছ রয়েছে। সকালে সেখানে পানি দিতে হবে। আগাছাও পরিষ্কার করা দরকার।
ল্যাপটপ বন্ধ করে সে নোটবুকটি আবার টেবিলে রাখল।
তারপর নিজের ডায়েরিতে লিখল—
'অনলাইন আমার কাজের একটি ক্ষেত্র। কিন্তু আমার পুরো জীবন নয়।'
পরদিন সকালেই সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিল।
অধ্যায় দুই.
মাটির টান ও বাস্তবের রূঢ় জমিন
সকাল আটটার কিছু আগে ঘুম থেকে উঠল রেহান। রাতে দেরিতে ঘুমানোর কারণে শরীরে ক্লান্তি ছিল। তবু বিছানায় পড়ে থাকল না।
মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গেল। মা রওশন আরা তখন সকালের নাশতা তৈরি করছেন।
"আজ এত সকালে উঠেছিস?"
"জমিতে যাব, মা।"
মা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
"অনেক দিন তোকে জমিতে কাজ করতে দেখি না। আবার কী মনে হলো?"
"কাজ করার দরকার আছে। শুধু কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলে হবে?"
রওশন আরা মৃদু হাসলেন।
"তোর বাবা এই কথাই বলতেন। তবে একটা কথা মনে রাখিস, শরীরের ওপর বেশি চাপ দিবি না।"
"চেষ্টা করব।"
নাশতা শেষ করে রেহান পুরোনো একটি শার্ট পরল। পায়ে রবারের জুতো। হাতে নিল ছোট একটি কোদাল। বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
সকালের আলোয় শালবেষ্ট গ্রামকে অন্য রকম দেখায়। বাড়ির সামনে কয়েকটি গাছ। রাস্তার পাশে ছোট নালা। দূরে কৃষিজমি। কোথাও ধানের চারা, কোথাও শীতকালীন সবজি।
জমির কাছে পৌঁছে সে দেখতে পেল কাঞ্চন চাচা আইলের মাটি ঠিক করছেন।
কাঞ্চন চাচা দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবারের সঙ্গে পরিচিত। মজিবর রহমানের সঙ্গে তিনি বহু বছর পাশাপাশি জমিতে চাষ করেছেন। এখন বয়স বেড়েছে। তবু কাজের প্রতি আগ্রহ কমেনি।
রেহানকে দেখে তিনি কোদাল থামালেন।
"কিরে দাদুভাই, আজ সূর্য ওঠার আগেই মাঠে?"
রেহান হেসে বলল, "চাচা, সূর্য তো অনেক আগেই উঠেছে। আমি একটু দেরি করেই এসেছি।"
"তা শহরের বড় কম্পিউটারওয়ালা মানুষ আজ মাঠে কী করবে?"
"কাজ করব।"
কাঞ্চন চাচা হাসলেন।
"কী কাজ?"
"আপনি যেটা করছেন, সেটাই।"
রেহান তার হাত থেকে কোদালটি নিয়ে জমির এক পাশে দাঁড়াল।
"এই জমির টমেটোগাছগুলোর অবস্থা কেমন?"
"গাছ ভালো আছে। তবে আগাছা বেড়েছে। কয়েক দিন ধরে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।"
"তাহলে আজ দুজনে মিলে পরিষ্কার করি।"
কাঞ্চন চাচা তার দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেন।
"তুই কি সত্যিই নিয়মিত মাঠে কাজ করতে চাস, নাকি আজ হঠাৎ শখ হয়েছে?"
"শখ হলে একদিন করেই চলে যাব। আমি নিয়মিত কাজ করতে চাই।"
"তাহলে একটা কথা বলি। জমির কাজকে সহজ ভাবিস না। একদিন কাজ করলে শরীর ব্যথা করবে। দুই দিন করলে হাতের তালুতে ফোসকা পড়বে। এক মাস করলে বুঝবি, কৃষিকাজ শুধু মাটি খোঁড়া নয়। এর মধ্যে হিসাব আছে, সময় আছে, আবহাওয়া আছে, বাজার আছে।"
"আমি শিখতে চাই, চাচা।"
"তাহলে শুরু কর।"
সেদিন রেহান প্রথমে টমেটোগাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে লাগল। তারপর কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করল। কোথাও পানি জমে থাকলে নালা তৈরি করে দিল।
কাজটি তার কাছে সহজ ছিল না।
প্রথম আধা ঘণ্টায়ই কপালে ঘাম জমে গেল। কিছুক্ষণ পর হাতের তালুতে ব্যথা অনুভব করল। কোদাল চালানোর অভ্যাস না থাকায় হাতের পেশিতে টান পড়ছিল।
কাঞ্চন চাচা তাকে দেখে বললেন, "আস্তে কর। জমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।"
রেহান হাসল।
"কম্পিউটারের কাজের সময় তো এত কষ্ট হয় না।"
"তাই বলে মাঠের কাজের মূল্য কমে যায়?"
"না, চাচা। বরং এখন বুঝতে পারছি, এই কাজের মধ্যে কত পরিশ্রম আছে।"
কাঞ্চন চাচা বললেন, "কম্পিউটারে তুই মাথা খাটাস। এখানে মাথাও খাটাতে হয়, শরীরও খাটাতে হয়। কোন গাছের কতটুকু পানি দরকার, কোন মাটিতে কোন সার দিতে হবে, কোন সময় ফল তুলতে হবে—এসব না জানলে ফসল নষ্ট হবে।"
রেহান কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল।
তার মনে হলো, কৃষিকাজ সম্পর্কে ছোটবেলার ধারণা ছিল অসম্পূর্ণ। সে ভাবত, জমি থাকলেই কৃষিকাজ করা যায়। এখন বুঝতে পারছে, জমি পরিচালনার জন্য জ্ঞান, পরিকল্পনা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দরকার।
তিন ঘণ্টা কাজ করার পর তারা বিশ্রাম নিল।
রেহান একটি গাছের নিচে বসে পানির বোতল থেকে পানি খেল। হাতের তালুতে লালচে দাগ পড়েছে। শার্টের পিঠ ঘামে ভিজে গেছে।
কাঞ্চন চাচা পাশে বসে বললেন, "কেমন লাগছে?"
"ভালো। তবে শরীরের অবস্থা ভালো নয়।"
"প্রথম দিনেই সব পারবি না।"
"আমি পারার জন্যই এসেছি।"
কাঞ্চন চাচা হেসে বললেন, "তোর বাবা থাকলে খুশি হতেন।"
বাবার নাম শুনে রেহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
"বাবার অনেক কথা আগে বুঝিনি, চাচা। এখন বুঝতে পারছি।"
"মানুষের কিছু কথা সময়ের আগে বোঝা যায় না।"
রেহান আবার জমির দিকে তাকাল।
গত রাতে সে একটি প্রকল্প থেকে তিনশ ডলার আয় করেছে। ওই অর্থ উপার্জনের জন্য তাকে কয়েক ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করতে হয়েছে। আর আজ সকালে জমিতে তিন ঘণ্টা কাজ করে যে ক্লান্তি অনুভব করছে, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কোনো কাজকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
একটি কাজ তাকে প্রযুক্তির দক্ষতা দিয়েছে। অন্যটি তাকে মাটির সঙ্গে সম্পর্কের অনুভূতি দিচ্ছে।
দুপুরের আগে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় রেহান সিদ্ধান্ত নিল, জমির কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করবে। শুধু শখের বশে নয়, পরিকল্পিতভাবে কৃষিকাজ করবে।
বাড়িতে ফিরে গোসল করার আগে সে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
আঙুলের পাশে ছোট একটি ফোসকা তৈরি হয়েছে।
সে মৃদু হাসল।
এই ফোসকাও তার কাছে এক ধরনের অর্জন।
অধ্যায় তিন.
বাজারের কোলাহল ও বাণিজ্যের হিসাব
দুপুরের খাবার শেষ করে রেহান কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। তারপর পরিষ্কার পোশাক পরে বাজারের দিকে রওনা হলো।
শালবেষ্ট গ্রামের প্রধান বাজারটির নাম কাশুগঞ্জ বাজার। গ্রামের সঙ্গে আশপাশের কয়েকটি এলাকার যোগাযোগের কেন্দ্র এটি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারে মানুষের আনাগোনা থাকে।
বাজারের প্রবেশপথে সবজি, মাছ, ফল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। ভেতরের দিকে কাপড়, ওষুধ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং কৃষি উপকরণের দোকান রয়েছে।
চৌরাস্তার মোড়ে রেহানের একটি মুদি ও মনিহরি দোকান আছে। দোকানটি বাবার জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে রেহান সেটি নতুনভাবে সাজিয়ে চালু করেছে।
দোকানের নাম 'নির্ভর স্টোর'।
দোকানটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে তার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই নিবিড়। রেহান নিজে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা দোকানের হিসাব, পণ্য কেনা এবং বিক্রির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে।
সে দোকানটিকে শুধু অতিরিক্ত আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখে না। তার কাছে এটি বাস্তব ব্যবসা পরিচালনার একটি অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র।
দোকানে পৌঁছে সে দেখতে পেল, নিবিড় কয়েকজন ক্রেতাকে পণ্য দিচ্ছে।
"ভাই, এসেছেন?"
"হ্যাঁ। আজকের হিসাবটা দেখাও।"
নিবিড় ক্যাশ বাক্সের পাশে রাখা খাতা এগিয়ে দিল।
"সকালে বিক্রি ভালো হয়েছে। তবে চালের দাম বেড়েছে। পাইকারি দোকান থেকে নতুন মাল আনতে হবে। তেলও কমে এসেছে।"
রেহান খাতা খুলে হিসাব দেখতে লাগল।
একটি দোকান পরিচালনা করতে হলে শুধু বিক্রি হলেই হয় না। পণ্যের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, পরিবহন খরচ, কর্মচারীর পারিশ্রমিক, বাকির পরিমাণ, নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষতি—সবকিছু হিসাব করতে হয়।
রেহান কম্পিউটারের কাজের হিসাবও রাখে। সেখানে প্রকল্পের বাজেট, ক্লায়েন্টের পেমেন্ট, সফটওয়্যারের খরচ এবং করসংক্রান্ত নথি থাকে।
মাটির শেকড় ও নীল পর্দা
খণ্ড দুই
অধ্যায় পাঁচ.
নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে
পরদিন সকাল সাড়ে সাতটা। কিরায়ণ নাশতা শেষ করে নিজের ঘরে ঢুকল। ল্যাপটপ খুলে প্রথমেই মার্কেটপ্লেসের নিরাপত্তা বিভাগের পাঠানো বার্তা পরীক্ষা করল। এখনো তার অ্যাকাউন্টের সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার করা হয়নি। তবে আবেদনটি পর্যালোচনাধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সে প্রয়োজনীয় নথিপত্র আবার পরীক্ষা করল। কোনো ভুল আছে কি না নিশ্চিত হয়ে নিল। তারপর কৃষিজমির হিসাবের ফাইল খুলল।
কৃষিকাজের জন্য আগামী সপ্তাহে কিছু বীজ ও জৈব সার কেনা দরকার। কাঞ্চল চাচা আগের দিন জানিয়েছিলেন, জমির একাংশে নতুন করে সবজি চাষ করা সম্ভব। কিন্তু কোন ফসল চাষ করলে উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে ভালো সমন্বয় থাকবে, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে।
কিরায়ণ বাজারের আগের কয়েক মাসের সবজির দাম সংগ্রহ করল। স্থানীয় পাইকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। আবহাওয়ার তথ্যও পরীক্ষা করল।
তারপর একটি পরিকল্পনা তৈরি করল।
সকাল দশটার দিকে সে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, আজ শহরে যাব।"
"কেন?"
"একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখেছি। মার্কেটিং বিভাগের জন্য লোক নেবে। আবেদন করতে চাই।"
অর্পিতা অবাক হলেন।
"তুই আবার চাকরি করবি?"
"চেষ্টা করতে চাই।"
"তোর অনলাইন কাজ, জমি, দোকান—এত কিছু সামলে চাকরি করতে পারবি?"
"সবকিছুর সময় ঠিক করতে হবে। চাকরি পেলে দায়িত্ব বুঝে কাজ করব।"
অর্পিতা বললেন, "শুধু আয়ের জন্য চাকরি করতে যাচ্ছিস?"
"না। মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা নিতে চাই। কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, কর্মীদের সমন্বয়, পণ্য বিপণন এবং মাঠপর্যায়ের কাজ সম্পর্কে জানতে চাই।"
মা আর কিছু বললেন না।
কিরায়ণ নিজের সিভি প্রস্তুত করল। সেখানে ফ্রিল্যান্সিংয়ের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা ও কৃষি প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোও উল্লেখ করল।
তারপর শহরের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল।
অম্বরবেষ্ট নগরের বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত একটি কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের নাম অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনস। প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের কাছে উন্নত বীজ, কৃষি উপকরণ এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার পরামর্শ সরবরাহ করে।
কিরায়ণ কয়েক দিন আগে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখেছিল। সেখানে বিপণন নির্বাহী পদে একজন দক্ষ কর্মী চাওয়া হয়েছে।
অফিসে পৌঁছে সে অভ্যর্থনা বিভাগে নিজের পরিচয় দিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তাকে সাক্ষাৎকার কক্ষে ডাকা হলো।
কক্ষে তিনজন কর্মকর্তা বসে ছিলেন। মাঝখানে ছিলেন প্রতিষ্ঠানের বিপণন পরিচালক অদ্রিবান। তার পাশে মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা নৈরিশ এবং আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
অদ্রিবান কিরায়ণের সিভি হাতে নিয়ে বললেন, "আপনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফ্রিল্যান্সিং করেন?"
"জি।"
"ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কাজ করেন?"
"জি।"
"আপনার অভিজ্ঞতা তো বেশ ভালো। তাহলে আমাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করলেন কেন?"
কিরায়ণ শান্তভাবে উত্তর দিল, "আমি শুধু আয়ের জন্য চাকরি খুঁজছি না। বাস্তব ব্যবসা ও বিপণনব্যবস্থা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই।"
অদ্রিবান বললেন, "কিন্তু আপনার বর্তমান আয় এই পদের বেতনের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।"
"সেটা হতে পারে। কিন্তু সব কাজের মূল্য শুধু বেতন দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।"
"কীভাবে?"
"আমি অনলাইনে বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করি। সেখানে প্রকল্পের লক্ষ্য, সময়সীমা এবং অর্থের হিসাব থাকে। কিন্তু একটি কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে কৃষক, সরবরাহকারী, পরিবেশক, বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারব। পণ্যের বাস্তব চাহিদা বুঝতে পারব।"
নৈরিশ প্রশ্ন করলেন, "আপনি কি মনে করেন অনলাইন আয় অনিরাপদ?"
"না। অনলাইন আয় একটি বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনের ক্ষেত্র। কিন্তু কোনো একটি মাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা উচিত নয়।"
অদ্রিবান এবার একটু আগ্রহী হলেন।
"আপনার নিজের কি অন্য কোনো ব্যবসা রয়েছে?"
"জি। একটি ছোট মুদি ও মনিহরি দোকান পরিচালনা করি। পাশাপাশি পরিবারের কৃষিজমির কাজেও যুক্ত আছি।"
"তাহলে এতগুলো কাজ একসঙ্গে করেন কীভাবে?"
"সময় ভাগ করে। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা দায়িত্ব ও পরিকল্পনা রেখেছি।"
"ধরুন, আপনাকে এখানে প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করতে হবে। তখন আপনার অন্য কাজগুলো কীভাবে সামলাবেন?"
কিরায়ণ বলল, "চাকরির সময় চাকরির দায়িত্ব পালন করব। কৃষিকাজ ও দোকানের জন্য অন্য সময় নির্ধারণ করব। প্রয়োজন হলে কর্মীদের দায়িত্ব আরও সুসংগঠিত করব। তবে কোনো কাজের দায়িত্ব নিয়ে সেটিকে অবহেলা করতে চাই না।"
অদ্রিবান তার উত্তর শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, "আমাদের প্রতিষ্ঠানে শুধু অফিসে বসে কাজ করলেই হবে না। বিভিন্ন এলাকায় যেতে হবে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বাজার পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পণ্যের চাহিদা ও বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পারবেন?"
"পারব।"
"আপনি কম্পিউটারে দক্ষ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে?"
"নিজের জমিতে কাজ করি। কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তবে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই।"
সাক্ষাৎকার প্রায় চল্লিশ মিনিট স্থায়ী হলো।
শেষে অদ্রিবান বললেন, "আমরা কয়েকজন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। সিদ্ধান্ত হলে জানিয়ে দেব।"
কিরায়ণ ধন্যবাদ জানিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে এসে সে রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকানে দাঁড়াল। চা হাতে নিয়ে ভাবল, চাকরিটি পেলে তার জীবনে নতুন একটি কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
কিন্তু সে শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে চায় না।
তার নিজের জমি আছে। দোকান আছে। অনলাইন কাজও আবার স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছে।
মানুষের জীবনে সুযোগের অপেক্ষা করার পাশাপাশি নিজের প্রস্তুতিও থাকা দরকার।
অধ্যায় ছয়.
প্রস্তাব ও দায়িত্বের পরীক্ষা
তিন দিন পর সকালে কিরায়ণের ফোনে একটি কল এল।
অপরিচিত নম্বর।
ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে একজন বললেন, "আপনি কি কিরায়ণ সাহেব বলছেন?"
"জি।"
"আমি অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনস থেকে বলছি। আপনার সাক্ষাৎকারের ফলাফল জানাতে ফোন করেছি।"
কিরায়ণ মনোযোগ দিয়ে শুনল।
"আমরা আপনাকে বিপণন নির্বাহী পদে নির্বাচিত করেছি। আগামী সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে যোগদান করতে পারবেন?"
কিরায়ণের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
"জি, পারব।"
"আপনার নিয়োগপত্র ই-মেইলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিস্তারিত সেখানে উল্লেখ থাকবে।"
"ধন্যবাদ।"
ফোন রেখে সে প্রথমে মাকে খবর দিল।
অর্পিতা বললেন, "ভালো খবর। তবে এবার নিজের শরীরের দিকেও খেয়াল রাখবি।"
"রাখব।"
কিরায়ণ নিয়োগপত্র খুলে দেখল। নির্ধারিত বেতন খুব বেশি নয়। কিন্তু কাজের পরিধি বিস্তৃত। প্রথম তিন মাস পরীক্ষামূলক সময়। কাজের মান ভালো হলে স্থায়ী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
সে শর্তগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ল।
তারপর নিজের সময়সূচি তৈরি করতে বসল।
সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অফিসের কাজ। অফিস শেষে নির্দিষ্ট সময়ে দোকানের হিসাব। কৃষিজমির কাজের জন্য সকাল কিংবা ছুটির দিন। অনলাইন প্রকল্পের কাজ করতে হবে রাতের নির্দিষ্ট সময়ে।
তবে প্রতিদিন সব কাজ একসঙ্গে করা সম্ভব হবে না। তাই কিছু দায়িত্ব অন্যদের হাতে দিতে হবে।
সে নিবেশকে ফোন করল।
"দোকানের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে নিতে হবে।"
নিবেশ বলল, "কেন ভাই? আপনি কি বাইরে যাচ্ছেন?"
"চাকরি শুরু করছি। তাই দোকানের দৈনন্দিন কাজ তোমাকে আরও স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হবে।"
"তাহলে হিসাবের বিষয়গুলো?"
"প্রতিদিন বিক্রির হিসাব রাখবে। সপ্তাহে দুদিন আমি এসে পরীক্ষা করব। বড় অঙ্কের পণ্য কেনার আগে আমার সঙ্গে আলোচনা করবে।"
নিবেশ বলল, "ঠিক আছে।"
তারপর কিরায়ণ কাঞ্চল চাচাকে ফোন করল।
"চাচা, আগামী সপ্তাহ থেকে চাকরি শুরু করব। জমির কাজের জন্য একটা নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে হবে।"
"চাকরি পেয়েছিস?"
"জি।"
"ভালো হয়েছে। কিন্তু জমি ফেলে রাখিস না।"
"সেটা হবে না। আমরা কাজ ভাগ করে নেব। আপনি মাঠের দৈনন্দিন কাজ দেখবেন। আমি প্রতিদিন উৎপাদনের হিসাব নেব।"
"তোর চাকরির সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে হবে।"
"সেটাই করব।"
কাঞ্চল চাচা বললেন, "তোর বাবা থাকলে খুশি হতেন। তবে একটা কথা মনে রাখিস। একসঙ্গে অনেক কাজ করতে গিয়ে কোনো কাজের ক্ষতি করিস না।"
"মনে রাখব।"
সেদিন বিকেলে কিরায়ণ দোকানে গেল।
নিবেশকে নিয়ে বসে নতুন হিসাবপদ্ধতি তৈরি করল। প্রতিদিনের বিক্রি, বাকির পরিমাণ, পণ্য কেনার খরচ এবং নগদ অর্থের হিসাব আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করল।
তারপর কৃষিজমির খরচ ও উৎপাদনের হিসাবও নতুনভাবে সাজাল।
কাজ শেষ করে সে নিজের ঘরে ফিরল।
ল্যাপটপ খুলে দেখল, ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস থেকে একটি নতুন বার্তা এসেছে। তার জমা দেওয়া নথিপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত নিরাপত্তা যাচাই এখনো শেষ হয়নি।
কিরায়ণ বুঝতে পারল, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
সে কোনো তাড়াহুড়ো করল না।
চাকরি, কৃষিকাজ, ব্যবসা এবং অনলাইন পেশা—প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করল।
তারপর ডায়েরিতে লিখল—
'একাধিক কাজ করা মানে সব কাজ নিজের হাতে করা নয়। দায়িত্ব ভাগ করা, হিসাব রাখা এবং প্রতিটি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা—এগুলোও কাজের অংশ।'
অধ্যায় সাত.
প্রথম কর্মদিবস
সোমবার সকাল।
নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে পৌঁছাল কিরায়ণ। নতুন পোশাক, পরিচ্ছন্ন জুতো এবং হাতে একটি ফাইল। অফিসের অভ্যর্থনা বিভাগে পরিচয় দেওয়ার পর তাকে বিপণন বিভাগের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
সেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা কাজ করছিলেন।
বিভাগীয় প্রধান অদ্রিবান তাকে স্বাগত জানালেন।
"স্বাগতম। আশা করি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবেন।"
"চেষ্টা করব, স্যার।"
অদ্রিবান তাকে অফিসের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়ে দেখালেন। পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, বিপণন বিভাগের কার্যক্রম, বিক্রয় প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজ সম্পর্কে ধারণা দিলেন।
তারপর একটি সভাকক্ষে নিয়ে গেলেন।
সেখানে একজন কর্মী বসে ছিলেন। নাম ত্রিয়াম।
অদ্রিবান বললেন, "ইনি আমাদের মাঠপর্যায়ের বিপণন সমন্বয়কারী। আগামী কয়েক সপ্তাহ আপনাকে কাজ বুঝিয়ে দেবেন।"
ত্রিয়াম হাত বাড়িয়ে বললেন, "স্বাগতম।"
কিরায়ণ হাত মেলাল।
ত্রিয়াম তাকে কয়েকটি নথি দেখালেন। সেখানে বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের চাহিদা, পণ্যের বিক্রি এবং সরবরাহের তথ্য ছিল।
"আমাদের প্রধান সমস্যা হলো, অনেক এলাকায় পণ্যের চাহিদা থাকলেও সঠিক সময়ে সরবরাহ পৌঁছায় না। আবার কিছু এলাকায় চাহিদা যাচাই না করেই অতিরিক্ত পণ্য পাঠানো হয়।"
কিরায়ণ নথি পরীক্ষা করল।
"এখানে কি গত বছরের বিক্রির তথ্যও আছে?"
"আছে।"
"কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি মতামত নেওয়া হয়?"
"হয়। তবে সব তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ করা হয় না।"
কিরায়ণ বলল, "তাহলে প্রথমে তথ্যগুলো একত্র করতে হবে। কোন এলাকায় কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, কোন মৌসুমে বিক্রি বাড়ে, কোথায় সরবরাহের সমস্যা হয়—এসব জানা দরকার।"
ত্রিয়াম হাসলেন।
"আপনি প্রথম দিনেই তথ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলছেন।"
"এটা আমার কাজের অভ্যাস।"
অফিসের কাজের প্রথম দিনেই কিরায়ণ বুঝতে পারল, এখানে শুধু কম্পিউটার চালানো বা বিজ্ঞাপন তৈরি করলেই হবে না। বাস্তব বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে হবে।
কৃষকেরা কী চান, তাদের ক্রয়ক্ষমতা কত, পণ্যের ব্যবহার সম্পর্কে তারা কতটা জানেন, সরবরাহকারীরা কী সমস্যায় পড়েন—এসব বিষয়ও জানতে হবে।
দুপুরে বিভাগের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় হলো। তাদের মধ্যে একজন বললেন, "আপনি নাকি অনলাইনে অনেক টাকা আয় করেন?"
কিরায়ণ হেসে বলল, "কাজ করি। আয় হয়।"
"তাহলে এখানে চাকরি করছেন কেন?"
"অন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য।"
"কম বেতনে এত সময় দেওয়ার দরকার কী?"
কিরায়ণ বলল, "প্রতিটি কাজের অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। অনলাইনে যে দক্ষতা অর্জন করেছি, এখানে সেটি কাজে লাগাতে পারব। আবার এখানে নতুন কিছু শিখব।"
কর্মীটি আর প্রশ্ন করলেন না।
বিকেলের দিকে কিরায়ণকে একটি এলাকার কৃষি উপকরণ বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করতে দেওয়া হলো। সে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তথ্যগুলো সাজিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন তৈরি করল।
ত্রিয়াম প্রতিবেদন দেখে বললেন, "আপনার কাজের গতি ভালো। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য না জেনে শুধু সংখ্যার ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।"
কিরায়ণ বলল, "আমি সেটাই বুঝতে চাই।"
"আগামীকাল আমরা একটি কৃষি এলাকায় যাব। সেখানে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলব।"
"ঠিক আছে।"
অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পথে কিরায়ণ বাজারে থামল।
মাটিরেখা বাণিজ্যঘরে ঢুকে দেখল, নিবেশ ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যস্ত।
কিরায়ণ দিনের বিক্রির হিসাব পরীক্ষা করল। একটি পণ্যের ক্রয়মূল্য ভুলভাবে লেখা হয়েছে। সেটি সংশোধন করতে বলল।
তারপর বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খেল।
রাত দশটার দিকে ল্যাপটপ খুলল।
মার্কেটপ্লেসের অ্যাকাউন্টে প্রবেশের চেষ্টা করতেই দেখা গেল, সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কিরায়ণ কিছুক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার অনলাইন কাজ আবার স্বাভাবিক হয়েছে।
কিন্তু এই কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা তাকে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝিয়েছে।
অনলাইন আয় ফিরে আসা মানে বাস্তব জীবনের কাজ বন্ধ করে দেওয়া নয়।
বরং এখন তার সামনে আরও বেশি দায়িত্ব।
অধ্যায় আট.
মাঠের মানুষের কাছ থেকে শিক্ষা
পরদিন সকালেই কিরায়ণ অফিসে পৌঁছাল। কিছুক্ষণ পর ত্রিয়াম একটি গাড়ি নিয়ে এলেন।
"চলুন, আজ মাঠপর্যায়ের কাজ দেখাব।"
তারা অম্বরবেষ্ট নগরের বাইরে অবস্থিত কয়েকটি কৃষি অঞ্চলের উদ্দেশে রওনা হলো।
প্রথমে তারা গেল নীলকাঞ্চন নামের একটি জনপদে। সেখানে অনেক কৃষক বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করেন।
একটি কৃষি উপকরণ বিক্রয়কেন্দ্রে তাদের সঙ্গে দেখা হলো কয়েকজন কৃষকের।
ত্রিয়াম পরিচয় করিয়ে দিলেন।
কিরায়ণ তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
একজন কৃষক বললেন, "আমরা বীজ কিনি, কিন্তু অনেক সময় প্যাকেটের তথ্য বুঝতে পারি না। কোন বীজ কোন মৌসুমে ভালো হবে, সেটাও সব সময় জানা থাকে না।"
আরেকজন বললেন, "কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু বাজারে ফসলের দাম সব সময় একই থাকে না।"
কিরায়ণ মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনল।
সে বুঝতে পারল, বিপণন বিভাগের কাজ শুধু পণ্য বিক্রি করা নয়। কৃষকের প্রয়োজন বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।
সে প্রশ্ন করল, "আপনারা কি ফসলের উৎপাদন ও খরচের হিসাব রাখেন?"
একজন কৃষক বললেন, "খাতায় কিছু লিখি। সব হিসাব থাকে না।"
কিরায়ণ বলল, "যদি প্রতিটি ফসলের বীজ, সার, শ্রমিক, সেচ এবং পরিবহন খরচ আলাদা করে লিখে রাখেন, তাহলে লাভ-ক্ষতি বুঝতে সুবিধা হবে।"
কৃষকটি বললেন, "আমাদের কি এত হিসাব রাখার সময় আছে?"
কিরায়ণ হেসে বলল, "খুব বেশি জটিল করার দরকার নেই। কয়েকটি তথ্য লিখে রাখলেই হবে।"
ত্রিয়াম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি কি কৃষিকাজ করেন?"
"জি। নিজের জমিতে সবজি চাষ করি।"
"তাহলে এই বিষয়গুলো আপনার পরিচিত।"
"কিছুটা। তবে এখানকার কৃষকদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি।"
কৃষকেরা নিজেদের সমস্যার কথা বলতে লাগলেন। কেউ পরিবহন খরচ নিয়ে চিন্তিত। কেউ ভালো বীজের অভাবের কথা বললেন। কেউ আবার বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সময় নিয়ে সমস্যার কথা জানালেন।
কিরায়ণ সব তথ্য নোট করল।
ফেরার পথে ত্রিয়াম বললেন, "আপনি কৃষকদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলতে পারেন।"
"কারণ আমি নিজেও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।"
"তাহলে আপনার জন্য এই কাজটি সহজ হবে।"
"সহজ নয়। তবে পরিচিত।"
ত্রিয়াম বললেন, "অনেক কর্মী মাঠে গেলে শুধু পণ্য বিক্রির কথা বলেন। কৃষকদের কথা শোনেন না।"
কিরায়ণ উত্তর দিল, "কোনো পণ্য বিক্রি করতে হলে আগে জানতে হবে মানুষ কেন সেটি কিনবে। তাদের সমস্যার সমাধান না হলে শুধু প্রচার করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা করা যায় না।"
অফিসে ফিরে সে কৃষকদের মতামত নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করল।
সেখানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করল।
প্রথমত, কৃষি উপকরণের ব্যবহারবিধি সহজ ভাষায় জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
তৃতীয়ত, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদর সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিবেদনটি অদ্রিবানের কাছে জমা দেওয়া হলো।
অদ্রিবান পড়ে বললেন, "আপনি শুধু বিপণনের দিকটি দেখেননি। কৃষকদের বাস্তব সমস্যাও তুলে ধরেছেন।"
কিরায়ণ বলল, "কৃষক পণ্য ব্যবহার করে উপকার না পেলে আমাদের ব্যবসাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"
অদ্রিবান মাথা নাড়লেন।
"ঠিক বলেছেন।"
সেদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় কিরায়ণের মনে হলো, চাকরিটি তার কাছে নতুন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো।
এখানে সে শুধু বেতন পাবে না। মানুষের সঙ্গে কাজ করার নতুন অভিজ্ঞতাও অর্জন করবে।
অধ্যায় নয়.
সময়ের সঙ্গে লড়াই
চাকরি শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই সপ্তাহ কিরায়ণ বেশ ব্যস্ত সময় কাটাল।
সকালে জমির অবস্থা দেখতে হয়। তারপর অফিস। বিকেলে বাজারে দোকানের হিসাব। রাতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রকল্প।
প্রথম দিকে সবকিছু ঠিকভাবে চলছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে ক্লান্তি বাড়তে লাগল।
একদিন রাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে গিয়ে সে ভোর পর্যন্ত জেগে রইল। পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় মাথা ভারী লাগছিল।
অফিসে পৌঁছে ত্রিয়াম তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি কি অসুস্থ?"
"না। একটু ঘুম কম হয়েছে।"
"এভাবে চললে সমস্যা হবে।"
কিরায়ণ হাসল।
"কাজের চাপ একটু বেশি।"
ত্রিয়াম বললেন, "আপনি কি সব কাজ নিজেই করেন?"
"অনেক কাজ অন্যদের দিয়ে করাই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিজে দেখতে হয়।"
"তবু সময়ের সীমা আছে।"
কথাটি কিরায়ণের মনে রইল।
সেদিন অফিস শেষে সে সরাসরি বাড়ি ফিরল। দোকানে ফোন করে নিবেশের কাছ থেকে হিসাব নিল। জমির জন্য কাঞ্চল চাচার সঙ্গে কথা বলল।
তারপর নিজের কাজের সময়সূচি আবার পরীক্ষা করল।
সে বুঝতে পারল, একাধিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা আর সব কাজের চাপ নিজের ওপর তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়।
তার কিছু কাজের ধরন পরিবর্তন করতে হবে।
প্রথমত, ফ্রিল্যান্সিংয়ে নতুন কাজ নেওয়ার আগে সময় বিবেচনা করবে।
দ্বিতীয়ত, দোকানের প্রতিদিনের হিসাব নিবেশ নিজেই তৈরি করবে। কিরায়ণ শুধু যাচাই করবে।
তৃতীয়ত, কৃষিকাজের দৈনন্দিন কাজ কাঞ্চল চাচার তত্ত্বাবধানে চলবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিরায়ণ নেবে।
চতুর্থত, চাকরির সময় অন্য কাজের জন্য ব্যবহার করবে না।
পঞ্চমত, প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় রাখবে।
পরিকল্পনা তৈরি করে সে ডায়েরি বন্ধ করল।
পরদিন থেকে নতুন সময়সূচি অনুসরণ করতে শুরু করল।
কয়েক দিনের মধ্যে তার কাজের চাপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এল।
একদিন অফিসে অদ্রিবান তাকে ডেকে বললেন, "আপনার তৈরি করা কৃষক-তথ্য প্রতিবেদনটি আমরা পর্যালোচনা করেছি। কয়েকটি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।"
কিরায়ণ খুশি হলো।
"ধন্যবাদ, স্যার।"
"আগামী মাস থেকে আপনাকে একটি ছোট প্রকল্পের সমন্বয়ের দায়িত্ব দিতে চাই।"
"কী ধরনের প্রকল্প?"
"কৃষকদের জন্য সহজ তথ্যভিত্তিক বিপণন ও উৎপাদন সহায়তা ব্যবস্থা।"
কিরায়ণ আগ্রহ নিয়ে বলল, "এটি খুব ভালো উদ্যোগ হবে।"
অদ্রিবান বললেন, "তবে দায়িত্ব বাড়বে।"
"আমি প্রস্তুত।"
সেদিন বাড়ি ফিরে সে বাবার পুরোনো নোটবুকটি আবার খুলল।
পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার মনে হলো, বাবার কাছ থেকে সে শুধু কৃষিকাজের শিক্ষা পায়নি। পেয়েছে দায়িত্ব ভাগ করার শিক্ষা, হিসাব রাখার শিক্ষা এবং পরিশ্রমের মূল্য বোঝার শিক্ষা।
তার বর্তমান জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই শিক্ষাগুলো কাজে লাগছে।
অধ্যায় দশ.
ব্যবসার নতুন সংকট
পরের মাসের প্রথম সপ্তাহে মাটিরেখা বাণিজ্যঘরে একটি সমস্যা দেখা দিল।
দোকানের বিক্রি আগের তুলনায় কমে গেছে। একই সময়ে কয়েকটি পণ্যের পাইকারি দাম বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমাণও কমে এসেছে।
নিবেশ বিষয়টি কিরায়ণকে জানাল।
"ভাই, গত সপ্তাহের তুলনায় বিক্রি কম। কয়েকজন ক্রেতা অন্য দোকানে চলে যাচ্ছে।"
"কেন?"
"তারা বলছে, অন্য দোকানে কিছু পণ্যের দাম কম।"
কিরায়ণ বিক্রির হিসাব পরীক্ষা করল। তারপর বাজারে কয়েকটি দোকানের দাম যাচাই করল।
দেখা গেল, কিছু পণ্যের দাম সত্যিই কম। তবে সব পণ্যে নয়।
কিরায়ণ বুঝতে পারল, তাদের ব্যবসার কয়েকটি দুর্বলতা রয়েছে।
দোকানে ক্রেতাদের জন্য পণ্যের বিন্যাস ভালো নয়। কিছু পণ্যের মজুত বেশি। আবার কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
সে নিবেশকে নিয়ে দোকানের পুরো ব্যবস্থা পর্যালোচনা করল।
প্রথমে পণ্য সাজানোর ধরন পরিবর্তন করা হলো। দ্রুত বিক্রি হয় এমন পণ্য সামনে রাখা হলো। মেয়াদযুক্ত পণ্য আলাদা করে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হলো।
তারপর সরবরাহকারীদের সঙ্গে নতুন করে দরদাম শুরু হলো।
কিরায়ণ কয়েকজন পাইকারের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারল, একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করার কারণে তাদের কেনার খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
সে বিকল্প সরবরাহকারীদের তালিকা তৈরি করল।
কয়েক দিনের মধ্যে নতুন একটি সরবরাহব্যবস্থা চালু হলো।
নিবেশ বলল, "ভাই, দোকানের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে।"
"হিসাব ঠিক রাখতে হবে। শুধু বিক্রি বাড়লেই হবে না।"
"এবার বুঝতে পারছি।"
কিরায়ণ বলল, "ব্যবসা মানে প্রতিদিন নগদ টাকা গোনা নয়। ব্যবসা হলো মূলধন, পণ্য, ক্রেতা এবং দায়িত্বের সমন্বয়।"
ঠিক তখন দোকানে প্রবেশ করলেন মেঘরুল।
তিনি কয়েকটি পণ্য কিনলেন। তারপর কিরায়ণকে বললেন, "আপনার দোকানে আগের চেয়ে পণ্য বেশি পাওয়া যাচ্ছে।"
"চাহিদা অনুযায়ী পণ্য রাখার চেষ্টা করছি।"
মেঘরুল বললেন, "আমাদের মতো মানুষদের জন্য যদি ছোট প্যাকেটের কিছু পণ্য রাখেন, তাহলে সুবিধা হয়। একসঙ্গে বেশি কেনার সামর্থ্য থাকে না।"
কিরায়ণ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নিল।
"ভালো পরামর্শ দিয়েছেন।"
সেদিন সন্ধ্যায় সে কয়েকটি পণ্যের ছোট প্যাকেটের ব্যবস্থা করল।
পরবর্তী কয়েক দিনে দোকানে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে শুরু করল।
কিরায়ণ বুঝল, ব্যবসার উন্নতির জন্য শুধু নিজের ধারণার ওপর নির্ভর করলে হবে না। ক্রেতার মতামতও জানতে হবে।
অধ্যায় এগারো.
অদৃশ্য প্রতিযোগিতা
অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনসে কিরায়ণের নতুন প্রকল্প শুরু হলো।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের কাছে পণ্যের সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা।
কিরায়ণ প্রথমে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করল। সেখানে কৃষকদের মতামত, পণ্যের ব্যবহার, সরবরাহের সময়, বিক্রির পরিমাণ এবং মৌসুমি চাহিদা সংরক্ষণ করা হলো।
তারপর একটি সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থার পরিকল্পনা তৈরি করল।
অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা এতে আগ্রহ দেখালেন।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো অন্য জায়গায়।
বিপণন বিভাগের একজন কর্মী, নাম ভ্রান্তিল, মনে করলেন কিরায়ণের নতুন ব্যবস্থা তার নিজের কাজের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে।
তিনি একদিন সভায় বললেন, "আমাদের এতদিনের ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা ছিল না। নতুন করে এত পরিবর্তন আনার দরকার কী?"
কিরায়ণ বলল, "সমস্যা না থাকলে পরিবর্তনের দরকার নেই। কিন্তু তথ্যগুলো এক জায়গায় না থাকায় অনেক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে।"
ভ্রান্তিল বললেন, "আমরা বহু বছর ধরে এভাবেই কাজ করছি।"
"সেটা ঠিক। তবে কাজের পদ্ধতি উন্নত করা মানে আগের কাজকে অস্বীকার করা নয়।"
অদ্রিবান বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
তিনি বললেন, "আমরা পরীক্ষামূলকভাবে নতুন ব্যবস্থা চালু করব। ফলাফল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
ভ্রান্তিল আর কিছু বললেন না।
কিরায়ণ বুঝতে পারল, বাস্তব প্রতিষ্ঠানে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেই হয় না। মানুষের মনোভাব, দায়িত্বের সীমা এবং পারস্পরিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সে ভ্রান্তিলের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলল।
"আপনার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। নতুন ব্যবস্থায় আপনার অভিজ্ঞতা খুব কাজে লাগবে।"
ভ্রান্তিল বললেন, "আপনি কি মনে করেন কম্পিউটারে সব সমস্যার সমাধান আছে?"
"না। কম্পিউটার শুধু তথ্য সাজাতে পারে। মাঠের বাস্তবতা বুঝতে মানুষের অভিজ্ঞতা দরকার।"
"তাহলে?"
"আমরা দুটোকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারি।"
ভ্রান্তিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, "ঠিক আছে। দেখি কী করা যায়।"
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কিরায়ণ ও ভ্রান্তিল একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন।
নতুন ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হলো।
কয়েকটি অঞ্চলে পণ্যের সরবরাহের সময় কমল। অপ্রয়োজনীয় মজুতও কিছুটা কমানো গেল।
অদ্রিবান ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হলেন।
তিনি কিরায়ণকে বললেন, "আপনার কাজ প্রতিষ্ঠানের জন্য উপকারী হচ্ছে।"
কিরায়ণ বলল, "দলের সবাই সহযোগিতা করেছেন।"
অদ্রিবান হাসলেন।
"সেটাই তো একজন ভালো সমন্বয়কারীর কাজ।"
অধ্যায় বারো.
জমির হিসাব ও নতুন উদ্যোগ
একদিন বিকেলে কিরায়ণ জমিতে গেল।
কাঞ্চল চাচা তাকে জানালেন, টমেটো ও অন্যান্য সবজির ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি গাছের পাতায় রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
কিরায়ণ গাছগুলো পরীক্ষা করল।
সে কৃষিবিষয়ক কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিল। তবে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ কৃষি পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ জমি পরিদর্শনে এলেন। তিনি রোগের লক্ষণ পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন।
কিরায়ণ সব নির্দেশনা লিখে রাখল।
কাঞ্চল চাচা বললেন, "আগে আমরা অভিজ্ঞতা দিয়ে অনেক কিছু বুঝতাম। এখন তুই যন্ত্র আর তথ্য ব্যবহার করিস।"
কিরায়ণ বলল, "দুটোই দরকার, চাচা।"
"কীভাবে?"
"আপনার অভিজ্ঞতা না থাকলে আমি জমির পরিবর্তন বুঝতে পারব না। আবার হিসাব না রাখলে কোন পদ্ধতিতে খরচ কমছে, কোনটিতে উৎপাদন বাড়ছে, সেটাও বুঝতে পারব না।"
কাঞ্চল চাচা মাথা নাড়লেন।
"ঠিক বলেছিস।"
কিরায়ণ এবার জমির উৎপাদনব্যবস্থা আরও পরিকল্পিত করার কথা বলল।
সে সিদ্ধান্ত নিল, পরবর্তী মৌসুমে একসঙ্গে অনেক ফসল চাষ করবে না। বরং কয়েকটি ফসল নির্বাচন করে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করবে।
প্রতিটি ফসলের জন্য আলাদা হিসাব থাকবে।
কত টাকা খরচ হলো, কত শ্রম লাগল, কত উৎপাদন হলো এবং কত দামে বিক্রি করা গেল—সব তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
কাঞ্চল চাচা বললেন, "তাহলে তো কৃষিকাজও একটা ব্যবসার মতো পরিচালনা করতে হবে।"
"অবশ্যই। তবে মাটির যত্ন ও ফসলের প্রয়োজন বুঝে।"
"তোর বাবা থাকলে এই পরিকল্পনা দেখে খুশি হতেন।"
কিরায়ণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, "আমি বাবার পুরোনো পদ্ধতি ভুলতে চাই না। শুধু সময়ের সঙ্গে নতুন কিছু যোগ করতে চাই।"
সেদিন জমির পাশে দাঁড়িয়ে সে চারপাশের দিকে তাকাল।
এখানে তার কাজের কোনো কম্পিউটার নেই। নেই আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের বার্তা। নেই অফিসের সভা।
তবু এই জমিও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র।
কৃষিকাজ থেকে যে অর্থ আসে, সেটি হয়তো অনলাইন আয়ের তুলনায় কম। কিন্তু এই কাজের মধ্যে উৎপাদন, পরিকল্পনা এবং বাস্তব দায়িত্ব রয়েছে।
তার কাছে এই অভিজ্ঞতার মূল্য আলাদা।
অধ্যায় তেরো.
আয়ের প্রকৃত অর্থ
এক শুক্রবার বিকেলে কিরায়ণ বাড়ির বারান্দায় বসে হিসাব করছিল।
গত মাসে তার অনলাইন আয় ভালো হয়েছে। চাকরির বেতনও জমা হয়েছে। দোকানের ব্যবসা থেকে নির্দিষ্ট লাভ এসেছে। কৃষিজমি থেকেও কিছু অর্থ পাওয়া গেছে।
সে সব আয় আলাদা করে লিখল।
তারপর প্রতিটি ক্ষেত্রের ব্যয় হিসাব করল।
অনলাইন কাজের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার, ইন্টারনেট, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য খরচ রয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে যাতায়াত ও ব্যক্তিগত ব্যয় রয়েছে। দোকানের ক্ষেত্রে পণ্য কেনা, কর্মচারীর পারিশ্রমিক ও পরিবহন খরচ রয়েছে। কৃষিকাজে বীজ, সার, শ্রমিক, সেচ এবং জমির পরিচর্যার ব্যয় রয়েছে।
সব হিসাব শেষ করে সে বুঝতে পারল, একাধিক আয়ের উৎস থাকলেও প্রতিটি ক্ষেত্রের প্রকৃত লাভ আলাদা করে বুঝতে হয়।
তার ফোনে তখন একটি বার্তা এল।
তার পুরোনো বন্ধু ত্রিশাল দেখা করতে চায়।
সন্ধ্যায় ত্রিশাল বাড়িতে এল।
সে নিজেও অনলাইন কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
কথা বলতে বলতে ত্রিশাল বলল, "তোর চাকরির খবর শুনেছি। তুই নাকি এখন জমি, দোকান, চাকরি আর ফ্রিল্যান্সিং সব একসঙ্গে করিস?"
কিরায়ণ হাসল।
"হ্যাঁ।"
"এত কাজ করে লাভ কী?"
"প্রতিটি কাজ থেকে কিছু না কিছু শিখছি।"
ত্রিশাল বলল, "আমি তো শুধু অনলাইনে কাজ করি। মাসে ভালো টাকা পাই। অন্য কিছু করার দরকার দেখি না।"
"তোর ইচ্ছা। তবে একটি বিকল্প কাজের ক্ষেত্র রাখলে ভালো হয়।"
"কেন? অনলাইনে তো অনেক সুযোগ।"
"অবশ্যই আছে। কিন্তু সব সুযোগ স্থায়ী নয়।"
ত্রিশাল বলল, "অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলব।"
"সব সময় সেটা সম্ভব হয় না। আবার ক্লায়েন্টের কাজ বন্ধ হতে পারে। বাজারের চাহিদা বদলাতে পারে।"
"তাহলে কি ফ্রিল্যান্সিং করা উচিত নয়?"
"আমি তো তা বলিনি। ফ্রিল্যান্সিং করবি। দক্ষতা বাড়াবি। আয় করবি। কিন্তু পাশাপাশি বাস্তব জীবনের কোনো কাজে যুক্ত থাকলে ক্ষতি কী?"
ত্রিশাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, "তুই কি মনে করিস, জমিতে কাজ করা বা দোকানে বসা অনলাইন আয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?"
কিরায়ণ বলল, "আমি কোনো কাজকে অন্য কাজের চেয়ে বড় বলছি না। প্রতিটি কাজের নিজস্ব মূল্য আছে। তবে আমার জীবনে বাস্তব কাজের একটা জায়গা থাকা জরুরি।"
"তোর দর্শনটা বেশ আলাদা।"
"এটা শুধু দর্শন নয়। আমার জীবন পরিচালনার পদ্ধতি।"
ত্রিশাল হাসল।
"দেখি, তোর এই পদ্ধতি কত দিন চলে।"
কিরায়ণও হাসল।
"সময়ই বলে দেবে।"
রাত বাড়তে থাকল।
ত্রিশাল চলে যাওয়ার পর কিরায়ণ নিজের ঘরে ঢুকে ল্যাপটপ খুলল।
একটি নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছে।
সে কাজটি পরীক্ষা করল। সময় ও পারিশ্রমিক বিবেচনা করে গ্রহণ করল।
তারপর পরদিনের সময়সূচি লিখে রাখল।
সকালে জমিতে যেতে হবে। দুপুরে অফিসের একটি প্রকল্পের প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। বিকেলে দোকানের হিসাব দেখতে হবে। রাতে অনলাইন কাজের প্রথম অংশ শেষ করতে হবে।
সে জানে, জীবনকে শুধু আয়ের পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না।
কাজের দায়িত্ব, দক্ষতা, স্বাধীনতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাও মানুষের জীবনের অংশ।
অধ্যায় চৌদ্দ.
নতুন দায়িত্বের ভার
পরবর্তী মাসে অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনসে কিরায়ণের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল।
প্রতিষ্ঠানের একটি নতুন প্রকল্পের জন্য তাকে সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। প্রকল্পটির আওতায় কয়েকটি কৃষি অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ, পণ্যের চাহিদা নির্ধারণ এবং কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
অদ্রিবান তাকে ডেকে বললেন, "আমরা আপনার কাজের ওপর সন্তুষ্ট। তাই নতুন প্রকল্পের দায়িত্ব দিচ্ছি।"
কিরায়ণ বলল, "ধন্যবাদ।"
"তবে মনে রাখবেন, প্রকল্পের সাফল্য শুধু বিক্রির ওপর নির্ভর করবে না। কৃষকদের বাস্তব উপকার হচ্ছে কি না, সেটাও দেখতে হবে।"
"আমি বুঝতে পেরেছি।"
"আপনার অধীনে কয়েকজন কর্মী থাকবে। তাদের কাজ ভাগ করে দিতে হবে।"
কিরায়ণ প্রকল্পের নথি হাতে নিল।
পরদিন থেকে নতুন কাজ শুরু হলো।
প্রথমে দলের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হলো। তাদের মধ্যে কেউ তথ্য সংগ্রহে দক্ষ, কেউ মাঠপর্যায়ে যোগাযোগে অভিজ্ঞ, কেউ আবার প্রযুক্তিগত কাজে পারদর্শী।
কিরায়ণ প্রত্যেকের কাজের ধরন বুঝে দায়িত্ব ভাগ করে দিল।
একটি সভায় সে বলল, "আমরা শুধু পণ্য বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করব না। কৃষকদের সমস্যা জানতে হবে। পণ্য ব্যবহারের সঠিক তথ্য দিতে হবে। সরবরাহের সময় ও মান নিশ্চিত করতে হবে।"
একজন কর্মী প্রশ্ন করলেন, "এতে কি আমাদের বিক্রির লক্ষ্য পূরণ হবে?"
কিরায়ণ বলল, "কৃষকের আস্থা তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে বিক্রির সুযোগ বাড়বে। তবে ভুল তথ্য দিয়ে বা অপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে লক্ষ্য পূরণ করতে চাই না।"
দলের সদস্যরা তার বক্তব্যে সম্মতি জানালেন।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে গেল।
কিরায়ণ অফিস, মাঠ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করল।
কৃষকদের মতামত সংগ্রহের জন্য সহজ একটি ফরম তৈরি করা হলো। পণ্যের তথ্য সহজ ভাষায় সাজানো হলো। সরবরাহের অগ্রগতি দেখার জন্য নতুন হিসাবপদ্ধতি চালু করা হলো।
এতে অফিসের কাজের স্বচ্ছতা বাড়ল।
অদ্রিবান একদিন বললেন, "আপনার প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে মাঠের অভিজ্ঞতা যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটি ভালোভাবে এগোচ্ছে।"
কিরায়ণ বলল, "দলের সবার অবদান আছে।"
অদ্রিবান বললেন, "আপনি কি ভবিষ্যতে এই বিভাগে আরও বড় দায়িত্ব নিতে চান?"
কিরায়ণ উত্তর দিল, "সুযোগ পেলে অবশ্যই। তবে আমার অন্য কাজগুলোও থাকবে।"
অদ্রিবান হেসে বললেন, "আপনার জীবনটা তো বেশ ব্যস্ত।"
"ব্যস্ততা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সেটি সমস্যা নয়।"
"আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে?"
"তাহলে কাজের পরিমাণ কমাতে হবে।"
অদ্রিবান মাথা নাড়লেন।
"এটাই বাস্তব সিদ্ধান্ত।"
অধ্যায় পনেরো.
পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে
একদিন সকালে কিরায়ণ জমিতে পৌঁছে দেখল, কয়েকটি অংশে পানি জমে আছে। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছে। নালার একটি অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি বের হতে পারেনি।
কাঞ্চল চাচা উদ্বিগ্ন ছিলেন।
"এই পানি দ্রুত না সরালে কিছু গাছ নষ্ট হতে পারে।"
কিরায়ণ জমির অবস্থা পরীক্ষা করল।
তারপর শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে নালার মুখ পরিষ্কার করতে শুরু করল।
কাজ করতে করতে তার অফিসের ফোন এল।
অদ্রিবান জরুরি একটি সভায় উপস্থিত থাকতে বলেছেন।
কিরায়ণ সময় দেখল। সভা শুরু হতে মাত্র এক ঘণ্টা বাকি।
সে কাঞ্চল চাচাকে বলল, "চাচা, নালার কাজটা আগে শেষ করতে হবে। আমি শ্রমিকদের সঙ্গে থাকছি।"
কাঞ্চল চাচা বললেন, "তুই অফিসে যা। বাকিটা আমি দেখছি।"
কিরায়ণ কিছুক্ষণ চিন্তা করল।
তারপর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শেষ করে জমির দায়িত্ব কাঞ্চল চাচার হাতে দিল।
সে দ্রুত বাড়ি ফিরে পোশাক পরিবর্তন করল। অফিসে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হলো।
সভায় অদ্রিবান জানতে চাইলেন, "আপনি দেরি করলেন কেন?"
কিরায়ণ সরাসরি বলল, "জমিতে জরুরি পানি নিষ্কাশনের কাজ ছিল। দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে এসেছি।"
অদ্রিবান বললেন, "আগে জানালে ভালো হতো।"
"ঠিক বলেছেন। ভবিষ্যতে জরুরি পরিস্থিতিতে আগেই জানাব।"
সভা শুরু হলো।
সেখানে নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হলো। কিরায়ণ নিজের অংশের প্রতিবেদন উপস্থাপন করল।
সভা শেষে অদ্রিবান তাকে আলাদা করে বললেন, "আপনার অন্য কাজগুলো সম্পর্কে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু অফিসের দায়িত্বের সময় কোনো সমস্যা হলে আগে জানাতে হবে।"
"আমি বুঝতে পেরেছি।"
"একাধিক কাজ করা ভালো। তবে প্রতিটি কাজের সঙ্গে অন্যদেরও প্রত্যাশা জড়িত থাকে।"
কিরায়ণ বলল, "আমি দায়িত্বের বিষয়টি আরও ভালোভাবে সমন্বয় করব।"
সেদিন বাড়ি ফিরে সে নিজের সময়সূচি আবার পরীক্ষা করল।
কৃষিকাজে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকবে। দোকানের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা করতে হবে।
কোনো কাজ যেন একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে বন্ধ হয়ে না যায়।
এই উপলব্ধি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
রাতের দিকে সে জমির হিসাব পরীক্ষা করল। পানি দ্রুত বের হয়ে গেছে। অধিকাংশ গাছ ভালো আছে।
কিরায়ণ স্বস্তি পেল।
তার মনে হলো, বাস্তব জীবনের কাজ তাকে শুধু আয় দেয় না। দায়িত্ব পালনের নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়।
অধ্যায় ষোলো.
একটি বড় সিদ্ধান্ত
কয়েক মাসের মধ্যে কিরায়ণের জীবন অনেকটা পরিবর্তিত হলো।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ আবার ভালোভাবে চলছে। অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনসেও তার অবস্থান শক্ত হয়েছে। মাটিরেখা বাণিজ্যঘরের বিক্রি আগের তুলনায় বেড়েছে। কৃষিজমিতেও উৎপাদন পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
কিন্তু নতুন একটি সমস্যা দেখা দিল।
অনলাইন কাজের একজন বড় ক্লায়েন্ট তাকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রস্তাব দিলেন। কাজের পরিমাণ অনেক বেশি। পারিশ্রমিকও আকর্ষণীয়।
চুক্তিটি গ্রহণ করলে মাসিক অনলাইন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
কিন্তু শর্ত ছিল, নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ক্লায়েন্টের প্রকল্পে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি জরুরি সভায় অংশ নিতে হবে।
এতে চাকরি, কৃষিকাজ ও ব্যবসার সময়সূচিতে চাপ পড়বে।
কিরায়ণ কয়েক দিন চিন্তা করল।
একদিন রাতে সে অর্পিতার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করল।
"মা, একটা বড় অনলাইন কাজের প্রস্তাব পেয়েছি।"
"ভালো তো।"
"কিন্তু কাজটা নিলে সময়ের চাপ বাড়বে।"
"তাহলে কী করবি?"
"ভাবছি, নেব কি না।"
অর্পিতা বললেন, "টাকার পরিমাণ দেখে সিদ্ধান্ত নিস না। তোর সময় ও দায়িত্বের কথাও ভাব।"
কিরায়ণ বলল, "কাজটা ভালো। কিন্তু সবকিছু সামলানো কঠিন হতে পারে।"
"তাহলে কি না করে দিবি?"
"পুরোপুরি না-ও বলতে চাই না।"
অর্পিতা কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন।
"তোর বাবা বলতেন, সুযোগ গ্রহণ করতে হলে নিজের সামর্থ্য বুঝতে হয়।"
কিরায়ণ মাথা নাড়ল।
পরদিন সে ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
প্রস্তাবটি গ্রহণ করার আগে কাজের সময় ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করল। ক্লায়েন্টকে জানাল, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করতে পারবে, তবে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে না।
ক্লায়েন্ট প্রথমে কিছুটা দ্বিধা প্রকাশ করলেন।
কিরায়ণ নিজের কাজের অভিজ্ঞতা ও পূর্ববর্তী প্রকল্পের ফলাফল তুলে ধরল।
শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতা হলো।
কাজের সময় নির্দিষ্ট করা হলো। জরুরি যোগাযোগের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হলো। প্রকল্পের কাজ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হলো।
কিরায়ণ চুক্তিটি গ্রহণ করল।
কিন্তু সে নিজের চাকরি ছাড়ল না। দোকান বন্ধ করল না। জমির কাজও কমিয়ে দিল না।
বরং সবকিছুর জন্য নতুন সময়সূচি তৈরি করল।
সে জানত, আয় বাড়ানোর সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সুযোগের জন্য নিজের জীবনের ভিত্তি নষ্ট করা ঠিক হবে না।
অধ্যায় সতেরো.
বাবার নোটবুকের শেষ পাতা
এক শুক্রবার সকালে কিরায়ণ বাড়ির পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করছিল।
সেখানে বাবার ব্যবহৃত কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেল। পুরোনো দলিল, জমির নকশা, কৃষি উপকরণের রসিদ এবং কয়েকটি চিঠি।
একটি ছোট খাতার ভেতরে বাবার লেখা কয়েকটি ব্যক্তিগত নোট ছিল।
কিরায়ণ খাতাটি খুলে পড়তে শুরু করল।
একটি পাতায় লেখা—
'ছেলেকে শুধু জমির মালিক বানাতে চাই না। তাকে কাজের মূল্য বুঝতে শেখাতে চাই।'
আরেকটি পাতায় লেখা—
'সময় বদলাবে। কাজের ধরন বদলাবে। কিন্তু মানুষের নিজের পরিশ্রমের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দরকার।'
কিরায়ণ ধীরে ধীরে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
শেষের দিকে একটি বাক্য তার চোখে পড়ল।
'যে মানুষ শুধু আয়ের ওপর নির্ভর করে, সে আয় বন্ধ হলে পথ হারায়। যে মানুষ কাজ করতে জানে, সে নতুন পথ তৈরি করতে পারে।'
কিরায়ণের চোখ স্থির হয়ে গেল।
সে খাতাটি বন্ধ করল না।
বাবার লেখাগুলো আবার পড়ল।
তার মনে হলো, নিজের জীবনের যে দর্শনকে সে এত দিন ধরে অনুসরণ করছে, তার মূল ভিত্তি বাবার এই শিক্ষাগুলোতেই রয়েছে।
বাবা তাকে কখনো বলেননি, শুধু কৃষক হতে হবে। শুধু দোকান চালাতে হবে। শুধু চাকরি করতে হবে।
তিনি শিখিয়েছিলেন, কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
কিরায়ণ খাতাটি যত্ন করে সংরক্ষণ করল।
তারপর জমির দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
সেদিন জমিতে কাঞ্চল চাচা অপেক্ষা করছিলেন।
কিরায়ণ বাবার নোটবুকের কথা বলল।
কাঞ্চল চাচা শুনে বললেন, "তোর বাবা অনেক দূর চিন্তা করতেন।"
"আমি তখন বুঝিনি।"
"সব কথা তখন বুঝতে হয় না।"
কিরায়ণ বলল, "চাচা, আমি চাই জমিটা আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে। পাশাপাশি নতুন কিছু কৃষিপণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করব।"
"তা হলে আগে ছোট পরিসরে শুরু কর।"
"সেটাই ভাবছি।"
"বেশি জমিতে একসঙ্গে নতুন পরীক্ষা করবি না।"
"না।"
কিরায়ণ জমির দিকে তাকাল।
এখানেই তার জীবনের অনেক স্মৃতি। এখানেই বাবার পরিশ্রমের চিহ্ন রয়েছে।
সে সিদ্ধান্ত নিল, জমিটিকে শুধু পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে রাখবে না। একটি কার্যকর উৎপাদনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলবে।
অধ্যায় আঠারো.
মানুষের কাছে কাজের পরিচয়
কয়েক মাস পর অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনসের নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে একটি সভার আয়োজন করা হলো।
বিভিন্ন এলাকার কৃষক, বিপণনকর্মী এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কিরায়ণ প্রকল্পের প্রতিবেদন উপস্থাপন করল।
সে দেখাল, কীভাবে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পণ্যের সরবরাহ উন্নত হয়েছে। কৃষকদের মতামত নিয়ে কীভাবে ব্যবহারবিধি সহজ করা হয়েছে। কোন অঞ্চলে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভায় একজন কর্মকর্তা প্রশ্ন করলেন, "এই প্রকল্পে প্রযুক্তির ভূমিকা কতটুকু?"
কিরায়ণ বলল, "প্রযুক্তি আমাদের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং যোগাযোগ সহজ করেছে। কিন্তু মাঠের মানুষের অভিজ্ঞতা ছাড়া এই তথ্যের সঠিক অর্থ বোঝা সম্ভব হতো না।"
আরেকজন প্রশ্ন করলেন, "আপনার মতে, ভবিষ্যতে কৃষিকাজ কি পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাবে?"
কিরায়ণ উত্তর দিল, "প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। কিন্তু কৃষির মূল কাজের সঙ্গে মাটি, পানি, আবহাওয়া, ফসল এবং মানুষের অভিজ্ঞতা জড়িত। প্রযুক্তি এসব কাজকে উন্নত করতে পারে, কিন্তু বাস্তব উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা দূর করতে পারে না।"
সভা শেষে অদ্রিবান তার কাছে এলেন।
"আপনার উপস্থাপনা ভালো হয়েছে।"
"ধন্যবাদ, স্যার।"
"আপনি আমাদের প্রতিষ্ঠানে আসার পর অনেক পরিবর্তন এসেছে।"
কিরায়ণ বলল, "আমি নিজেও অনেক কিছু শিখেছি।"
অদ্রিবান বললেন, "আমরা আপনাকে বিভাগীয় সমন্বয়কের পদে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
কিরায়ণ কিছুটা অবাক হলো।
"ধন্যবাদ।"
"আগামী মাস থেকে নতুন দায়িত্ব কার্যকর হবে।"
কিরায়ণ প্রস্তাবটি গ্রহণ করল।
তবে তার মনে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল। নতুন পদ মানে নতুন দায়িত্ব। সে নিজের অন্য কাজগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই এগোবে।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে মাকে খবর দিল।
অর্পিতা খুশি হলেন।
"তোর পরিশ্রমের ফল পাচ্ছিস।"
কিরায়ণ বলল, "হ্যাঁ মা। তবে কাজ আরও বাড়বে।"
"সব কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখিস।"
"রাখব।"
রাতের খাবারের পর সে জমির হিসাব পরীক্ষা করল। তারপর দোকানের বিক্রির প্রতিবেদন দেখল। সবশেষে অনলাইন ক্লায়েন্টের কাজের অগ্রগতি পরীক্ষা করল।
চারটি ক্ষেত্রই এখন তার জীবনের অংশ।
কিন্তু কোনো একটি ক্ষেত্রকে অন্যগুলোর ওপর অযথা চাপিয়ে দিতে চায় না সে।
অধ্যায় উনিশ.
বিকল্প পথের বাস্তব পরীক্ষা
একদিন সকালে কিরায়ণের ফ্রিল্যান্সিংয়ের বড় ক্লায়েন্টের প্রতিষ্ঠান থেকে একটি বার্তা এল।
তাদের ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের কারণে কয়েক মাসের জন্য সব নতুন প্রকল্প স্থগিত করা হচ্ছে।
কিরায়ণ বার্তাটি পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
এটি তার অনলাইন আয়ের একটি বড় অংশ ছিল।
চুক্তির কাজ আপাতত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাসিক আয় কমে যাবে।
কিন্তু এবার সে আগের মতো উদ্বিগ্ন হলো না।
সে নিজের আয়ের হিসাব খুলে দেখল। অন্য ক্লায়েন্টদের কাজ রয়েছে। চাকরির বেতন রয়েছে। দোকান থেকে আয় হচ্ছে। কৃষিজমি থেকেও উৎপাদন চলছে।
অবশ্যই বড় অঙ্কের আয় কমে যাবে। কিন্তু জীবনের সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে না।
সে ক্লায়েন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতে কাজের সুযোগ থাকলে যোগাযোগ করতে বলল।
তারপর নিজের অনলাইন পেশার পরিকল্পনা নতুন করে সাজাল।
কয়েকজন পুরোনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করল। নতুন প্রকল্পের জন্য আবেদন পাঠাল। নিজের পোর্টফোলিও হালনাগাদ করল।
একই সময়ে অফিসের নতুন দায়িত্বও পালন করতে থাকল।
দুপুরে অদ্রিবান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার মুখটা আজ কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছে।"
কিরায়ণ বলল, "একজন বড় অনলাইন ক্লায়েন্টের কাজ আপাতত বন্ধ হয়েছে।"
"তাতে কি আপনার সমস্যা হবে?"
"আয়ের পরিমাণ কিছুটা কমবে। তবে অন্য কাজগুলো চলছে।"
অদ্রিবান বললেন, "এ কারণেই কি আপনি এতগুলো কাজের সঙ্গে যুক্ত?"
কিরায়ণ হাসল।
"এটি একটি কারণ। তবে একমাত্র কারণ নয়।"
"আর কী কারণ?"
"আমি বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাই। শুধু অনলাইন আয় নয়, সরাসরি উৎপাদন ও ব্যবসার অভিজ্ঞতাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।"
অদ্রিবান বললেন, "আপনার চিন্তাটা ভালো।"
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে কিরায়ণ বাজারে গেল।
নিবেশ দোকানের হিসাব দেখাল। বিক্রি ভালো হয়েছে। কয়েকটি নতুন পণ্যও এসেছে।
তারপর সে জমিতে গেল।
কাঞ্চল চাচা জানালেন, নতুন মৌসুমি ফসলের প্রস্তুতি চলছে।
কিরায়ণ কাজের অগ্রগতি দেখে সন্তুষ্ট হলো।
রাতে বাড়ি ফিরে সে ডায়েরিতে লিখল—
'একটি আয়ের উৎস বন্ধ হওয়া মানে জীবনের সব পথ বন্ধ হওয়া নয়। তবে বিকল্প পথ তৈরি করতে হলে আগে থেকেই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।'
অধ্যায় বিশ.
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ
শীতের সকাল।
কালদ্রুমের আকাশে হালকা কুয়াশা। দূরের মাঠে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
কিরায়ণ সকালে জমিতে পৌঁছাল।
কাঞ্চল চাচা আগেই কাজ শুরু করেছেন। কয়েকজন শ্রমিক জমির এক পাশে নতুন সবজি লাগাচ্ছেন।
কিরায়ণ তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাজ করল।
তারপর উৎপাদনের হিসাব পরীক্ষা করল।
মাটিরেখা বাণিজ্যঘর থেকেও ভালো খবর এসেছে। দোকানের বিক্রি স্থিতিশীল। নিবেশ এখন অনেক দায়িত্ব নিজে পরিচালনা করতে পারে।
অরবেল অ্যাগ্রো সলিউশনসে কিরায়ণের নতুন পদ কার্যকর হয়েছে। তার অধীনে একটি ছোট দল কাজ করছে।
অনলাইন কাজেও সে নতুন কয়েকজন ক্লায়েন্ট পেয়েছে।
বড় ক্লায়েন্টের কাজ বন্ধ থাকলেও সে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আয়ের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পেরেছে।
একদিন বিকেলে ত্রিশাল আবার তার সঙ্গে দেখা করতে এল।
"কিরায়ণ, তোর কথা ভেবে আমিও একটা কাজ শুরু করেছি।"
"কী কাজ?"
"আমার পরিবারের একটা ছোট জমি আছে। আগে অন্য একজনকে দিয়ে চাষ করাতাম। এখন নিজে পরিকল্পনা করে সবজি উৎপাদন শুরু করেছি।"
কিরায়ণ হাসল।
"ভালো উদ্যোগ।"
"তবে আমার অনলাইন কাজও বন্ধ করিনি।"
"সেটাই তো।"
ত্রিশাল বলল, "আগে মনে করতাম, অনলাইনে ভালো আয় হলে অন্য কাজের প্রয়োজন নেই। এখন বুঝতে পারছি, বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখারও মূল্য আছে।"
কিরায়ণ বলল, "প্রত্যেকের জীবন আলাদা। সবাইকে একইভাবে চলতে হবে না। তবে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একাধিক দক্ষতা তৈরি করা ভালো।"
ত্রিশাল বলল, "তোর এই চিন্তা আগে বুঝিনি।"
"সবকিছু একদিনে বোঝা যায় না।"
সন্ধ্যার দিকে ত্রিশাল চলে গেল।
কিরায়ণ বাড়ির পেছনের জমির পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে পড়ল বাবার কথা।
দ্রুবাক্ষের পুরোনো নোটবুক এখনো তার টেবিলের ড্রয়ারে রাখা আছে। মাঝেমধ্যে সে সেটি খুলে পড়ে।
বাবা তাকে বড়লোক হওয়ার শিক্ষা দেননি। কোনো নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে আটকে থাকার কথাও বলেননি।
তিনি শিখিয়েছিলেন, মানুষকে কাজের মধ্যে থাকতে হয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উৎপাদন করতে হয়। অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়। উপার্জনের পাশাপাশি দায়িত্বও পালন করতে হয়।
কিরায়ণ এখন বুঝতে পারে, তার জীবনের দর্শনের গভীরতা কোথায়।
অনলাইন কাজ তার স্বাধীনতার একটি বড় ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জনের সুযোগ। কিন্তু সেটিই তার পুরো পরিচয় নয়।
জমির মাটি তার কাছে উৎপাদনের বাস্তব শিক্ষা।
দোকান তাকে মানুষের চাহিদা ও ব্যবসার হিসাব শেখায়।
চাকরি তাকে দলগত দায়িত্ব, শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা দেয়।
আর ফ্রিল্যান্সিং তাকে প্রযুক্তি, স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
চারটি ক্ষেত্রের কোনোটিই অন্যটির বিকল্প নয়। প্রতিটির নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে।
রাত নামতে শুরু করেছে।
কিরায়ণ ঘরে ফিরে ল্যাপটপ খুলল। নতুন একটি ক্লায়েন্টের বার্তা এসেছে। আগামী সপ্তাহে একটি প্রকল্প শুরু হবে।
সে উত্তর লিখে পাঠাল।
তারপর আগামীকালের কাজের তালিকা তৈরি করল।
সকালে জমিতে যেতে হবে। অফিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা রয়েছে। বিকেলে দোকানের হিসাব দেখতে হবে। রাতে অনলাইন প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হবে।
সবকিছু নির্দিষ্ট করে সে ডায়েরি বন্ধ করল।
অধ্যায় একুশ.
দর্শনের উত্তরাধিকার
কয়েক মাস পর কালদ্রুমে কৃষি উৎপাদন নিয়ে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী, কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সেখানে অংশ নিলেন।
কিরায়ণও নিজের জমিতে উৎপাদিত কয়েকটি পণ্য নিয়ে উপস্থিত হলো।
তার উদ্দেশ্য শুধু পণ্য প্রদর্শন নয়। কৃষিকাজে প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার ব্যবহার সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
প্রদর্শনীর এক পাশে কৃষকদের জন্য একটি তথ্যকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদন ব্যয়, ফসলের বাজারদর, পণ্যের গুণগত মান এবং কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হচ্ছে।
কিরায়ণ কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা বলল।
তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, নাকি ফ্রিল্যান্সার?"
কিরায়ণ হাসল।
"সবগুলোর সঙ্গেই যুক্ত আছি।"
তরুণটি অবাক হয়ে বলল, "একজন মানুষ এতগুলো কাজ করেন কীভাবে?"
"প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা সময় ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে।"
"আপনার কাছে কোন কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?"
কিরায়ণ কিছুক্ষণ চিন্তা করল।
তারপর বলল, "যে কাজের দায়িত্ব নিয়েছি, সেই সময়ে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে থাকলে জমির কাজ, অফিসে থাকলে অফিসের কাজ, দোকানে থাকলে ব্যবসার কাজ। আর অনলাইনে কাজ করলে ক্লায়েন্টের কাজ।"
তরুণটি বলল, "তাহলে আপনি কি মনে করেন অনলাইন আয় কখনো স্থায়ী হতে পারে না?"
"আমি তা বলছি না। অনেকের জন্য অনলাইন পেশা দীর্ঘমেয়াদি ও সফল কর্মজীবন হতে পারে। কিন্তু কোনো আয়ের মাধ্যমকে শতভাগ নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বাস্তব জীবনের অন্য দক্ষতাও থাকা দরকার।"
আরেকজন তরুণ বলল, "আপনি যদি শুধু অনলাইনে কাজ করতেন, তাহলে কি বেশি টাকা আয় করতে পারতেন?"
কিরায়ণ উত্তর দিল, "হতে পারে। কিন্তু আমার লক্ষ্য শুধু বেশি টাকা আয় করা নয়। আমি এমন জীবন চাই, যেখানে নিজের দক্ষতা ব্যবহার করব, বাস্তব কাজ করব, মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকব এবং প্রয়োজনে এক ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রে যাওয়ার সামর্থ্য রাখব।"
তরুণেরা তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল।
সন্ধ্যার আগে প্রদর্শনী শেষ হলো।
কিরায়ণ নিজের পণ্যগুলো গুছিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।
রাস্তার দুই পাশে কৃষিজমি। বাতাসে ফসলের গন্ধ। দূরে বাজারের আলো জ্বলতে শুরু করেছে।
বাড়িতে পৌঁছে সে বাবার নোটবুকটি বের করল।
শেষ পাতাটি আবার খুলল।
সেখানে বাবার লেখা বাক্যটি এখনো স্পষ্ট।
'যে মানুষ শুধু আয়ের ওপর নির্ভর করে, সে আয় বন্ধ হলে পথ হারায়। যে মানুষ কাজ করতে জানে, সে নতুন পথ তৈরি করতে পারে।'
কিরায়ণ নোটবুকটি বুকের কাছে ধরে কিছুক্ষণ বসে রইল।
তারপর সেটি আবার যত্ন করে রেখে দিল।
অধ্যায় বাইশ.
শেষ নয়, চলমান জীবন
রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
কিরায়ণ নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। বাইরে হালকা বাতাস বইছে। দূরের রাস্তা থেকে মাঝে মাঝে যানবাহনের শব্দ আসছে।
কম্পিউটারের পর্দায় একটি নতুন প্রকল্পের কাজ চলছে।
পাশের টেবিলে কৃষিজমির হিসাবের খাতা। আরেক পাশে মাটিরেখা বাণিজ্যঘরের মাসিক বিক্রির প্রতিবেদন। অফিসের কিছু নথিও রয়েছে।
সবকিছু দেখে তার নিজেরই হাসি পেল।
কয়েক বছর আগে সে ভাবত, ভালো ফ্রিল্যান্সার হওয়াই তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
এখন সে বুঝতে পারে, পেশাগত সাফল্য জীবনের একটি অংশ মাত্র।
মানুষের জীবনে কাজের বৈচিত্র্য থাকতে পারে। কেউ চাকরি করবে, কেউ ব্যবসা করবে, কেউ কৃষিকাজ করবে, কেউ প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করবে। কেউ আবার একাধিক ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এতে কোনো বিরোধ নেই।
বিরোধ তৈরি হয় তখন, যখন মানুষ একটি কাজকে অন্য সব কাজের চেয়ে বড় মনে করে এবং নিজের জীবনের অন্য সম্ভাবনাগুলো বন্ধ করে দেয়।
কিরায়ণ সেই ভুল করতে চায় না।
তার অনলাইন আয় এখনো ভালো। ভবিষ্যতেও সে নিজের দক্ষতা বাড়াবে। নতুন প্রযুক্তি শিখবে। আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করবে।
একই সঙ্গে কৃষিজমির উৎপাদনব্যবস্থা উন্নত করবে। দোকানের ব্যবসা পরিচালনা করবে। চাকরির দায়িত্বও পালন করবে।
কোনো একটি ক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে অন্য ক্ষেত্রগুলো তার জীবনকে সচল রাখতে সাহায্য করবে।
তবে সে এটাও জানে, একাধিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য পরিকল্পনা, সময়ানুবর্তিতা এবং দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। শুধু অনেকগুলো কাজের নাম থাকলেই জীবনে নিরাপত্তা আসে না। প্রতিটি কাজকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হয়।
সে ল্যাপটপের কাজ শেষ করল।
তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে অন্ধকার। দূরের জমিগুলো এখন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সে জানে, সকালে আবার সূর্যের আলোয় সেগুলো দেখা যাবে।
সকালে জমিতে যেতে হবে।
দুপুরে অফিসে একটি নতুন প্রকল্পের সভা রয়েছে।
বিকেলে দোকানের হিসাব পরীক্ষা করতে হবে।
রাতে অনলাইন ক্লায়েন্টের কাজের পরবর্তী অংশ শেষ করতে হবে।
জীবন চলবে।
কিরায়ণ জানে, কোনো দিন হয়তো কৃষিকাজে ক্ষতি হবে। কোনো দিন ব্যবসায় লোকসান হবে। কোনো দিন চাকরির দায়িত্ব বাড়বে। আবার কোনো দিন অনলাইন আয় কমে যেতে পারে।
কিন্তু সে এসব সম্ভাবনাকে জীবনের শেষ বলে মনে করে না।
কারণ তার হাতে কাজ করার দক্ষতা আছে। তার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি আছে।
সে নিজের ডায়েরি খুলে শেষবারের মতো কয়েকটি লাইন লিখল।
'আমার জীবন শুধু কম্পিউটারের পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। আমি প্রযুক্তি ব্যবহার করব, আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করব, অর্থ উপার্জন করব। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব না। মাটিতে কাজ করব, ব্যবসা পরিচালনা করব, প্রয়োজনে চাকরি করব। কোনো একটি আয়ের উৎস বন্ধ হলে নতুন পথ খুঁজে নেব। কারণ আমার পরিচয় শুধু আমি কত টাকা আয় করি, সেটি নয়। আমার পরিচয় আমি কতটা কাজ করতে জানি, কতটা দায়িত্ব পালন করি এবং নিজের জীবনকে কতটা সচল রাখতে পারি।'
লেখা শেষ করে কিরায়ণ কলমটি বন্ধ করল।
ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়ার আগে একবার কম্পিউটারের দিকে তাকাল।
নীল পর্দার আলো নিভে গেল।
কিন্তু তার জীবনের কাজ থেমে রইল না।
বাইরে যে মাটি অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে, সকালে আবার সেই মাটিতেই নতুন কাজ শুরু হবে।
কিরায়ণ জানে, তার আগামীকাল প্রস্তুত।
ইন্টারনেট থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, নতুন কাজ থাকবে। পাশাপাশি থাকবে জমি, বাজার, অফিস এবং মানুষের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক।
সে কোনো একটি পৃথিবীকে বেছে নিয়ে অন্য পৃথিবীকে পরিত্যাগ করেনি।
দুটি পৃথিবীর মধ্যেই নিজের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন তৈরি করেছে।
তার কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা হওয়া নয়। সাফল্যের অর্থ হলো নিজের সামর্থ্য দিয়ে কাজ করতে পারা, নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়া এবং প্রতিকূল সময়েও নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখা।
বাবার শেখানো কথাগুলো এখন তার জীবনের মূল ভিত্তি।
মাটির শেকড় যত গভীরে থাকবে, মানুষ তত সহজে নিজের অবস্থান হারাবে না।
আর প্রযুক্তির জ্ঞান যত বাড়বে, সেই শেকড়কে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তত বাড়বে।
কিরায়ণের জীবনের দর্শন তাই একটিই—
ইন্টারনেট থেকে যত আয়ই হোক, বাস্তব জীবনের কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকতে হবে। কৃষিকাজ, ব্যবসা কিংবা চাকরি—নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তব পৃথিবী থেকে উপার্জনের সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
কারণ ভার্চুয়াল পৃথিবী মানুষের সামনে অসংখ্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাস্তব জীবনে কাজ করার সামর্থ্যই মানুষকে প্রতিকূল সময়ে নতুন পথ খুঁজে নিতে শেখায়। (সমাপ্ত) ©️All Right Reserved by Junayed Ashrafur Rahman
24°33'58.6"N 90°41'30.4"E
My home Location ✒ https://goo.gl/maps/RoKi3ekrhkm5PAHPA , But I don't live here. Rented out to other people.
Nandail Municipality, Mymensingh, Bangladesh.
Junayedmn1@gmail.com
My Writings ✒ https://www.blogger.com/profile/11734624718328723069
702) My success in writing. (লেখালেখিতে আমার সাফল্য।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2023/06/702-my-success-in-writing-written-by.html
707)After the fantasy of ministry.(মন্ত্রিত্বের ফ্যান্টাসির পরে।)– Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://mytimemyexperiencesjunayedmn1.blogspot.com/2023/06/707after-fantasy-of-ministry-written-by.html
637)Win prizes.(পুরস্কার জিতুন।) - Written by Junayed Ashrafur ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2022/10/637win-prizes-written-by-junayed.html
667)Case against AI ChatGPT. (এআই চ্যাট জিপিটির বিরুদ্ধে মামলা।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://lawforjusticejunayedmn1.blogspot.com/2023/02/667case-against-chat-gpt-written-by.html http://ow.ly/Zawy104u7kO
#Intellectualproperty #Literature #Law #Contract #Writing #Wisdom
