821)(Story_50) Bairam Khan. (বৈরাম খাঁ।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman
821)(Story_50) Bairam Khan. (বৈরাম খাঁ।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman https://mywritingsjunayedmn1.blogspot.com/2019/12/about-me-junayed-ashrafur-rahman.html ✒
🌟 The video of how to translate my writings into your language.(আমার লেখাগুলো যেভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে পড়বেন,সেটার ভিডিও।) https://youtube.com/shorts/cB4L80u1IIc?si=jJV-G14OIP_qQeLA 🌟https://www.facebook.com/share/v/1GuWS35Joi/
এক.
সম্রাট হুমায়ুনের ইন্তেকাল
সম্রাট হুমায়ুন অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে পতিত হয়েছিলেন। সাম্রাজ্য হারিয়ে তিনি হয়েছিলেন প্রায় নিঃস্ব। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সাম্রাজ্য আবার ফিরে পেয়েছিলেন।
পাঠান সম্রাট শের শাহর বিরুদ্ধে পরাজিত হয়ে সম্রাট হুমায়ুন প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ছিলেন। একসময়ের সম্রাট হয়েও তাকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছিল। নিজের সাম্রাজ্য হারানোর পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু রাজবংশের পরিচয় থাকলেই ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না; এর জন্য দরকার শক্তিশালী সহযোগী, দক্ষ সেনাপতি এবং অনুগত সৈন্যবাহিনী।
পরবর্তীতে পারস্য সম্রাটের সহযোগিতায় সম্রাট হুমায়ুন আবার সাম্রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন। পারস্য থেকে পাওয়া সাহায্য তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই সময় তার পাশে ছিলেন এমন কয়েকজন মানুষ, যারা বিপদের সময় তাকে ছেড়ে চলে যাননি। তাদের মধ্যে বৈরাম খাঁ ছিলেন অন্যতম।
অবশ্য সম্রাট হুমায়ুন সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার আগে শের শাহ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। এই দুর্ঘটনার কারণেও সম্রাট হুমায়ুন কর্তৃক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার আরো সহজ হয়েছিলো।
আর ছিলেন বৈরাম খাঁর মতো দক্ষ সেনাপতি। যুদ্ধক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সম্রাটের প্রতি আনুগত্য হুমায়ুনের জন্য বড় সহায়তা হয়ে উঠেছিল।
শের শাহর মৃত্যুর পর সম্রাট হুমায়ুন আবার নিজের সাম্রাজ্য ফিরি পান। নিজের সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার পর সম্রাট হুমায়ুন ইন্তেকাল করেন।
সম্রাট হুমায়ুনের জীবনের শেষ মুহূর্তে তার সামনে ছিল এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে তার নিজের সন্তানকে সাম্রাজ্যের ভার নিতে হবে। সেই সন্তান তখনো বালক। কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম কখনো মানুষের বয়সের অপেক্ষা করে না। হুমায়ুনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার তেরো বছরের সন্তান আকবারকে বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিতে হলো।
দুই.
আকবারের অভিভাবক
তেরো বছরের বালক আকবার। বাবা হুমায়ুনের মৃত্যু হয়েছে। এখন সে হতে চলেছে বিশাল সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাট।
আকবারের পিতামহ বাবর যখন বালক, তখন বাবরের বাবাও মারা গিয়েছিলেন।
এর অনেক বছর পর বাবর উজবেকিস্তানের ফারগানা থেকে দিল্লিতে আসেন, এবং মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
আজ আকবারও বাল্য বয়সে নতুন সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও আকবারের একজন অভিভাবক দরকার।
তাই সম্রাট হুমায়ুনের বিশ্বস্ত সঙ্গী বৈরাম খাঁকে করা হলো আকবারের অভিভাবক।
বৈরাম খাঁ বুঝতে পারছিলেন, তার সামনে এখন একটি কঠিন দায়িত্ব। একজন বালককে শুধু সিংহাসনে বসিয়ে দিলেই সম্রাট বানানো যায় না। তাকে রাজ্যের অবস্থা বুঝতে সাহায্য করতে হয়, শত্রুদের মোকাবিলা করতে হয় এবং রাজদরবারের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র থেকে তাকে রক্ষা করতে হয়।
আকবারের বয়স কম হলেও তার চারপাশে থাকা মানুষদের বয়স ছিল অনেক বেশি। কেউ তাকে সত্যিকার অর্থে রক্ষা করতে চাইবে, আবার কেউ তার অল্প বয়সকে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে।
বৈরাম খাঁ তাই মনে মনে স্থির করলেন, যতদিন তার হাতে দায়িত্ব থাকবে, ততদিন তিনি হুমায়ুনের সন্তানকে রক্ষা করবেন।
কিন্তু রাজদরবারে সবাই বৈরাম খাঁর মতো চিন্তা করছিল না।
তিন.
সম্রাট আকবার
ইতিহাসের কিছু ঘটনা ঘুরেফিরে আবার ঘটতেও পারে অথবা না ঘটতে পারে।
কিন্তু অতীতের একটা ঘটনার সাথে পরবর্তী সময়ের আরো ঘটনার মিল থাকতে পারে।
বাল্য বয়সে সম্রাট আলেকজান্ডার কর্তৃক ক্ষমতা গ্ৰহণ।
বাল্য বয়সে চেঙ্গিস হয়েছিলেন নিজের সম্প্রদায়ের সর্দার_খাঁ।
তেমনি আজ বালক আকবারও হলেন মোগল সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাট।
তবে আকবারের সামনে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তিনি এমন একটি সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেছিলেন, যার ভিতরে ছিল বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন অঞ্চল, বিভিন্ন স্বার্থ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার লড়াই।
তার বয়স কম হওয়ার কারণে অনেকেই ধরে নিয়েছিল, তিনি সহজেই অন্যদের কথায় পরিচালিত হবেন।
কেউ ভাবছিলেন, সম্রাটকে সামনে রেখে তারা নিজেরাই ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।
কেউ আবার ভাবছিলেন, বালক সম্রাট রাজকার্যের পরিবর্তে খেলাধুলা ও আনন্দ-বিনোদনে ব্যস্ত থাকবেন।
কিন্তু আকবারের প্রকৃত স্বভাব তখনো তারা বুঝতে পারেনি।
চার.
সংযত বালক সম্রাট
সম্রাট আকবার সিংহাসনে আরোহণ করেই কোন রাজ্যের কী অবস্থা,সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে লাগলেন।
তিনি এমনভাবে খোঁজখবর নিতে লাগলেন,যেন তিনি আরো আগে থেকেই সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন।
সিংহাসনে আরোহণ করেই বৈরাম খাঁকে সম্রাট আকবার বললেন,“আমার পিতার সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য আমিই যথেষ্ট।সাম্রাজ্যের কোথায় কী আছে, আমাকে আপনি শুধু সেটার হিসাব প্রদান করুন।”
পরিণত মানুষের মতো একরকম কথাবার্তার আশা বৈরাম খাঁ করেন নি।তিনি মনে করেছিলেন,সম্রাট আকবার সিংহাসনে আরোহণ করে শিশুদের মতো খেলাধুলা করবেন আর এর কোল থেকে ওর কোলে উঠবেন। অবশেষে হৈ হুল্লোড় করে নিজের ঘরে চলে যাবেন।
কিন্তু পরিণত মানুষের মতো আচরণ দেখে বৈরাম খাঁ সতর্ক হয়ে উঠলেন। শিশু হোক অথবা বালক হোক,সম্রাট আকবারের কথা মতো কাজ করতেই হবে।
তা না হলে,এই ভরা মজলিসে বৈরাম খাঁকে সম্রাট আকবার কী করেন,সেটা আঁচ করা কঠিন।
তাই সম্রাট আকবারের কথা মতো বৈরাম খাঁ সাম্রাজ্যের হিসাব প্রদান করতে লাগলেন।
দরবারে উপস্থিত অনেকেই তখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিল, এই বালক সম্রাট কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবেন।
আকবার একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন। কোথায় কত সৈন্য রয়েছে, কোথায় রাজস্ব আদায় কমেছে, কোথায় কোনো বিদ্রোহের আশঙ্কা রয়েছে—সবকিছু তিনি জানতে চাইলেন।
বৈরাম খাঁ বুঝলেন, এই বালককে অবহেলা করা যাবে না।
পাঁচ.
ষড়যন্ত্রের সূচনা
ওদিকে কিছু মানুষ মনে করেছিলো,বালক আকবার সিংহাসনে আরোহণ করেই বালখিল্যতা শুরু করবেন। কিন্তু আকবার সিংহাসনে আরোহণ করে কোন রকম বালখিল্যতা তো দূরের কথা ,বরং সংযত আচরণ শুরু করলেন।
এটা দেখে যে ক’জন অসন্তুষ্ট হয়েছে, তাদের মধ্যে বারুদ খাঁ (কাল্পনিক চরিত্র) অন্যতম।
সম্রাট আকবারের সংযত আচরণ দেখে সে ছটফট করছিলো।ওর সহ্য হচ্ছিলো না সম্রাট আকবারের সংযত আচরণ।
তাই কামান খাঁকে (কাল্পনিক চরিত্র) সে বলল,“আকবার সিংহাসনে আরোহণ করেই পরিণত বয়সের সম্রাটদের মতো আচরণ শুরু করেছে।এভাবে চলতে থাকলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।আমরা তো গোপনে প্রচার করেছিলাম যে,আকবারকে সিংহাসনে বসিয়ে তামাশা করব।আর মূল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করব আমরাই। এ ব্যাপারটা মোটামুটি আমাদের মাধ্যমে সকলেরই জানা হয়েছিলো। এর মধ্যে বিপরীত ঘটনা শুরু হয়ে গেলো।”
কামান খাঁ বলল,“আমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে হলে আরো কিছু কাজ করতে হবে।”
বারুদ খাঁ বলল,“কী কাজের কথা তুমি বলছো?”
কামান খাঁ বলল,“আমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে হলে বৈরাম খাঁকে আমাদের দলে যুক্ত করতে হবে।”
বারুদ খাঁ বলল,“আমাদের তো একটাই দল।আমরা মুঘল সাম্রাজ্যের রক্ষক।আর কোন দলের কথা বলছো?”
কামান খাঁ বলল,“আমরা মুঘল সাম্রাজ্যের রক্ষক_এটা ঠিক। কিন্তু আমরা যারা পারস্য থেকে এসে মুঘল সাম্রাজ্যের রক্ষক হয়েছি,তাদের রয়েছে আলাদা একটা দল।আমি সেই দলের কথাই বলছি।”
বারুদ খাঁ বলল,“এ দিক দিয়ে বৈরাম খাঁ তো আমাদের দলেরই অন্তর্ভুক্ত।”
কামান খাঁ বলল,“হ্যাঁ,বৈরাম খাঁ আমাদের দলের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু পুরোপুরি আমাদের দলের অন্তর্ভুক্ত না। কেননা,মুঘল সাম্রাজ্যের অনুগত হতে হতে বৈরাম খাঁ এখন নিজের স্বার্থের ব্যাপারে কোন চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু আমরা মুঘল সাম্রাজ্যের সেবক হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের স্বার্থের ব্যাপারে সচেতন।সম্রাট আকবার যদি এভাবে সংযতভাবে চলতে থাকেন,তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।তাই সম্রাট আকবারকে বেসামাল করতে হলে অবশ্যই বৈরাম খাঁকে আমাদের দলে যুক্ত করতে হবে।”
বারুদ খাঁ বলল,“কীভাবে সফল করবে?তুমি কি দেখছো না যে, সিংহাসনে সম্রাট আকবার আরোহণ করতে না করতেই বৈরাম খাঁ কীভাবে চামচামি শুরু করে দিয়েছে।”
কামান খাঁ বলল,“এটাই তো হচ্ছে বড় সমস্যা।বৈরাম খাঁ মুঘল সাম্রাজ্যের এতো অনুগত হয়েছে যে,এখন সে বিন্দুমাত্র বিরোধিতা করার চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু অত্যন্ত কৌশলে বৈরাম খাকে সম্রাট আকবারের বিরুদ্ধে উস্কে দিতে হবে।”
বারুদ খাঁ বলল,“এটাই করতে হবে।তা না হলে অবশেষে বৈরাম খাঁ_ই আমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।”
দুজনেই বুঝতে পারছিল, বৈরাম খাঁকে সরাসরি সম্রাটের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো সম্ভব হবে না। তাই তার মনে ধীরে ধীরে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করাই হবে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
ছয়.
বৈরাম খাঁকে বিভ্রান্ত করা
অনেক চেষ্টার পর বৈরাম খাঁকে বারুদ খাঁ ও কামান খাঁ একাকী পেল।
ওদেরকে বৈরাম খাঁ জিজ্ঞেস করলেন,“কী ব্যাপার,আমার সাথে তোমরা কথা বলার জন্য এভাবে ব্যাকুল হলে কেন?”
বারুদ খাঁ বলল,“আমাদের সকল আশা আকাঙ্ক্ষা নিরাশায় পরিণত হওয়ার পথে।তবে এখনো আশা পূরণের অনেক সম্ভাবনা আছে।”
বৈরাম খাঁ বললেন,“আমাদের কোন আশা পূরণের কথা বলছো? অভিভাবক হিসেবে আমার তো আশা ছিলো আকবারকে সিংহাসনে আরোহণ করানো।আর এটা ছিলো আমার জন্য একটা বিরাট ব্যাপার। আমার সেই আশা পূরণ হয়েছে আকবারকে সিংহাসনে বসিয়ে সম্রাট বানানোর মাধ্যমে।এবং এটা ছিলো সম্রাট হুমায়ুনের প্রতি আমার ওয়াদা।আমি আমার ওয়াদা পূরণ করতে পেরেছি। তাছাড়া মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি সারা জীবন অনুগত থাকার শপথ করেই আমি পারস্য থেকে হিন্দুস্তানে এসেছি।আমি এখনো মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি।তাই নতুন করে আমার কোন আশা আকাঙ্ক্ষা নাই।”
কামান খাঁ বলল,“সমস্যা তো এটাই।আপনি নিজে চাইলেই সম্রাট হতে পারেন। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য আপনাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে রেখেছে।মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাটরা কি আল্লাহর প্রেরিত দূত যে, তাদেরকে সরিয়ে নিজেরা সম্রাট হওয়া অসম্ভব?”
একথা শোনে প্রায় চমকে উঠে বৈরাম খাঁ বললেন,“তুমি কী বলতে চাচ্ছো?”
বারুদ খাঁ বলল,“আমরা পারস্য থেকে নিজেদের জন্মভূমি ত্যাগ করে হিন্দুস্তানে এসেছি।রাজ্যহারা হুমায়ুনকে আবার আমরা সিংহাসনে বসিয়েছি।বিনিময়ে আমরা কী পেয়েছি?কিছু বেতন ভাতা ছাড়া কিছুই না।অথচ ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে উজবেকিস্তানের কিছু লোক।অথচ চাইলে সহজেই আমরা আকবারকে সরিয়ে এই হিন্দুস্তানের একচ্ছত্র শাসক হতে পারি।”
বৈরাম খাঁ বললেন,“তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে? নিজেদের সম্রাটকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করার ষড়যন্ত্র করছো?”
কামান খাঁ বলল,“এটা তো অন্যায় কিছু না। ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে আকবারের দাদা বাবর ক্ষমতা দখল করেছিলেন,তেমনি আমরাও আকবারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেব।”
বৈরাম খাঁ বললেন,“তোমার কথায় যুক্তি আছে। তবে এটা তোমাদের একেবারেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।সম্রাট আকবার যদি জানতে পারেন,তাহলে তোমাদের পরিণতি হবে একেবারেই ভয়াবহ।এমনকি তোমাদেরকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিতে পারেন।”
বারুদ খাঁ বলল,“তাহলে আমরা একটু কৌশল অবলম্বন করতে পারি। আকবারকে ক্ষমতা থেকে একেবারে সরিয়ে না দিয়ে অন্যভাবে ক্ষমতায় রাখতে পারি।”
কামান খাঁ বলল,“সেটা কীভাবে?”
বারুদ খাঁ বলল,“আকবারকে আমরা সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসিয়ে রাখব। কিন্তু সাম্রাজ্যের ক্ষমতা আমরা নিয়ন্ত্রন করব।আকবারকে আমরা পুতুলের মতো পরিচালনা করব।আর লোকজন যাতে বুঝতে পারে, আকবার যদিও সম্রাট, কিন্তু তাকে আমরাই পরিচালনা করছি।ফলে সাম্রাজ্যের অন্য রাজারা আকবারকে রেখে আমাদের আনুগত্য করবে।”
এ সকল কথায় বৈরাম খাঁ প্রভাবিত হতে শুরু করলেন।তিনি প্রায় বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“এটা তো তোমাদের মনের অভিলাস মাত্র।এটা বাস্তবায়ন করা কি এতোই সহজ?তোমরা কি দেখনি যে,প্রথম দিনেই আকবার কীরকম জ্ঞান বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে।”
কামান খাঁ বলল,“এটা তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। ছোটবেলা এরকম পাকনামী কমবেশি সকল পোলাপানই করে।প্রথম প্রথম বাপ দাদার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সিংহাসন পেয়ে একটু একটু পাকনামী করছে। কিছুদিন গেলেই আবার ছেলে মানুষী শুরু করবে। বাজপাখি,ঘোড়া প্রভৃতি নিয়ে খেলা শুরু করবে। তাছাড়া আকবারকে আমরা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েদেরকে এনে দেব।তাতে ওর মন সাম্রাজ্য পরিচালনার চেয়ে মেয়েদেরকে নিয়ে মেতে থাকবে।”
এরকম কথায় বৈরাম খাঁ আরো বিভ্রান্ত হতে শুরু করলেন।তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে জিজ্ঞেস করলেন,“সবই তোমরা করবে,তাহলে আমি কী করব?”
বারুদ খাঁ বলল,“আপনি করবেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা।আপনি তো আকবারের অভিভাবক। আপনার কাজ হবে ভরা দরবারে আপনার অভিভাবক সুলভ ক্ষমতা জাহির করা।তাতে অন্যান্য রাজ্যের রাজারা আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে আর আকবারকে তাচ্ছিল্য করবে। এভাবে ক্রমে ক্রমে আপনি হয়ে উঠবেন মুঘল সাম্রাজ্যের মূল ক্ষমতার অধিকারী আর আমরা হব আপনার প্রধান সহচর।”
কামান খাঁ বলল,“এরপর একদিন আকবারকে লাথি মেরে পাঠিয়ে দেব আফগানিস্তানে। সেখানে সে বাকিটা জীবন সাধারনভাবে কাটাবে।”
বৈরাম খাঁ বললে,“আমি অনুগত ছিলাম সম্রাট হুমায়ুনের প্রতি। এখন আমি সম্রাট আকবারের প্রতি অষনুগত থাকব। সম্রাট হুমায়ুনের পরিবারের প্রতি অনুগত থাকার প্রতিজ্ঞা করেই আমি পারস্য থেকে ভারতে এসেছি। আমি পারব না আমার প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করতে।”
বারুদ খাঁ বলল,“এটা আপনার মনের ভুল।আপনি তখনের পরিস্থিতির কারণে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আর এখনের পরিস্থিতিতে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবেন। ক্ষমতার কাছে এসকল প্রতিজ্ঞার কোন গুরুত্ব নাই। আপনি এখন চাইলেই এই ভারতের সম্রাট হতে পারবেন।শুধুমাত্র আকবারকে সরিয়ে দিলেই হবে। অযথাই পাগলের মতো অতীতের কোন প্রতিজ্ঞার উপর নিজেকে স্থির করে রাখবেন না।”
একথা শোনে বৈরাম খাঁ মর্মাহত হয়ে ভাবলেন,“কী, এতো বড় স্পর্ধা ? আমি আমার প্রতিজ্ঞার উপর স্থির থেকেছি, আর এটাকে বারুদ খাঁ বলতেছে, পাগলের মতো। বারুদ খাঁ তো আমার অন্তরে আঘাত করেছে।”
কামান খাঁ বলল,“যারা ক্ষমতা পরিচালনার যোগ্য, তাদের কাছে ওই সকল প্রতিজ্ঞার কোন গুরুত্ব নাই। কিন্তু যারা পাগল প্রকৃতির মানুষ, ওরাই অতীতের প্রতিজ্ঞা নিয়ে বসে থাকে।”
বারুদ খাঁ বলল,“আপনি সম্রাট হুমায়ুনের জন্য এতো শ্রম দিলেন, বিনিময়ে তিনি আপনাকে কী দিয়েছেন? আপনি তো সেই গোলামই রয়ে গেলেন। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, আপনি পারস্য থেকে ভারতে এসেছেন। কিন্তু আকবারের পিতামহ বাবরও তো উজবেকিস্তান থেকে এসেছেন এই ভারতে।এদিক দিয়ে আপনি আর বাবর, দুজনই ভিনদেশি মানুষ। বাবর যদি উজবেকিস্তান থেকে এসে ভারতের সম্রাট হতে পারেন, তাহলে আপনি পারস্য থেকে এসে ভারতের সম্রাট হতে পারবেন না কেন?”
ক্ষমতার লোভ কখন কাকে বেসামাল করে তোলে _ সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা খুবই কঠিন।
এ সকল কথায় বৈরাম খাঁ অনেকটা প্রভাবিত হয়ে উঠলেন। একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য আর অন্যদিকে ক্ষমতার লোভ।এদুটো বিষয় বৈরাম খাঁকে সত্যি সত্যিই বেসামাল করে তুললো।
এবার বৈরাম খাঁ না পারছেন সম্রাট আকবারের পক্ষে কথা বলতে আর না পারছেন বারুদ খাঁ ও কামান খাঁর পক্ষে কথা বলতে।
তাই বৈরাম খাঁ বললেন,“আমি তোমাদের কথা বিবেচনা করে দেখব।আমি হচ্ছি আকবারের অভিভাবক।তাই তোমাদের কথা মতো আকবারের সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। আবার তোমাদের কথায় যুক্তিও আছে।আচ্ছা,আমি এখন যাচ্ছি,তোমরা তোমাদের কাজ করতে থাক।”
বারুদ খাঁ বলল,“আমরা ধরে নিচ্ছি যে,আপনি আমাদের কথায় রাজি হয়েছেন।তাই আমরা আমাদের কাজ শুরু করে দিচ্ছি।”
বৈরাম খাঁ বললেন,“ঠিক আছে।” এরপর তিনি নিজের মহলে চলে গেলেন।
বৈরাম খাঁ নিজের মহলে ফিরে এলেন। কিন্তু তার মনে তখন আর আগের মতো স্থিরতা নেই।
তিনি জানতেন, তিনি এখনো আকবারের অভিভাবক। কিন্তু বারুদ খাঁ ও কামান খাঁর কথাগুলো তার মনে এমন একটি দরজা খুলে দিয়েছে, যার ভেতরে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে ছিল।
সাত.
ছেলে খেলার প্ররোচনা
পরদিন থেকেই আকবারের জন্য সুন্দর সুন্দর মেয়ের ব্যবস্থা করা হলো।
রাজদরবারের কয়েকজন মানুষ মনে করল, এটাই হয়তো তাদের পরিকল্পনা সফল করার সবচেয়ে সহজ উপায়। বালক সম্রাটকে রাজকার্য থেকে দূরে রাখা গেলে অন্যরা ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজেদের হাতে নিতে পারবে।
কিন্তু ওদের সাথে আকবারের হৈ হুল্লোড় চলতে লাগলো।এটা দেখে বারুদ খাঁ আর কামান খাঁ ভাবতে লাগলো,আকবার এবার সাম্রাজ্য বাদ দিয়ে মেয়ে মানুষ নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়বেন।
আকবার হাসলেন, খেললেন, আনন্দ করলেন। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে লাগল, তিনি সত্যিই রাজকার্যের চেয়ে খেলাধুলাতেই বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন।
ওদের এই আশার কিছুটা পূর্ণ হলেও সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ হয় নি।
কারণ আকবারের আচরণের মধ্যে তারা এমন একটি বিষয় বুঝতে পারেনি—আনন্দের সময়ও তিনি চারপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
কেননা সুন্দর সুন্দর মেয়েদেরকে নিয়ে সম্রাট আকবার হৈ হুল্লোড় করার পর সাম্রাজ্যের হিসাব ঠিক ঠিকভাবে নিতে লাগলেন।
তিনি আবার দরবারে বসলেন। রাজস্বের হিসাব শুনলেন, সৈন্যদের অবস্থা জানলেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের খবর নিলেন।
এটা দেখে কামান খাঁ আর বারুদ খাঁর প্রতিহিংসা আরো মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।
তারা বুঝল, শুধু আনন্দ-বিনোদনের ব্যবস্থা করে আকবারকে রাজকার্য থেকে সরানো যাবে না।
তাদের আরও গভীর ষড়যন্ত্র করতে হবে।
তারা লক্ষ্য করল, আকবার আনন্দের সময় হাসছেন ঠিকই, কিন্তু রাজকার্যের সময় তার মনোযোগে কোনো ঘাটতি নেই। বরং তিনি আগের দিনের তুলনায় আরও বেশি প্রশ্ন করছেন।
কামান খাঁ তখন বারুদ খাঁকে বলল, তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করা দরকার।
বারুদ খাঁ বুঝল, এবার বৈরাম খাঁকে সামনে রেখে আকবারের ওপর প্রভাব বিস্তার করার পরিকল্পনাই তাদের শেষ বড় সুযোগ।
আট.
আবার ষড়যন্ত্র
সেদিনের মতো আকবারের রাজ দরবারের কাজ শেষ হওয়ার পর বৈরাম খাঁকে নিয়ে কামান খাঁ আর বারুদ খাঁ আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।
তারা এবার আরও সতর্ক হয়ে বৈরাম খাঁর কাছে গেল। কারণ তারা বুঝেছিল, আকবারকে সরাসরি দুর্বল করা সম্ভব হচ্ছে না।
বৈরাম খাঁকে বারুদ খাঁ বলল,“আমরা যতটুকু সহজ মনে করেছিলাম,ততোটুকু সহজ হলো না। অপ্রত্যাশিতভাবে আকবার নিজেকে সামলে নিয়েছে।এখন একটাই কাজ করতে হবে।ভরা রাজ সভায় আকবারের উপর আপনি মাতব্বরি ফলাবেন,যাতে সকলেই বুঝতে পারে যে,আপনাকে ছাড়া আকবার একেবারেই চলতে পারে না। অর্থাৎ,আপনার পুতুল রাজা হিসেবে আকবার নামমাত্র সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসে আছে।”
বৈরাম খাঁ চুপ করে শুনলেন।
ততোদিনে বৈরাম খাঁ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।তিনি এতোদিন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত ছিলেন,এখনো আছেন। কিন্তু সম্রাট বাসনা তিনিকে বিভ্রান্ত করা শুরু করেছে।একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য,আর এক দিকে সম্রাট হওয়ার বাসনায় বৈরাম খাঁর অবস্থা প্রায় বেসামাল।
তার মনের ভেতর তখন যেন দুইটি কণ্ঠ কথা বলছিল। একটি বলছিল, আকবার হুমায়ুনের সন্তান; তাকে রক্ষা করাই তার দায়িত্ব। অন্যটি বলছিল, এত বছর পর ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার সুযোগ হয়তো আর কখনো আসবে না।
তিনি কোন মতে নিজেকে সামলে বললেন,“আমি চেষ্টা করব এটা করার। কিন্তু তোমাদের মতো আমি এতোটা আগ্ৰাসি হব না।”
কামান খাঁ বলল,“আপনাকে আগ্ৰাসি হতে হবে না।আগ্ৰাসি যতটুকু হওয়ার আমরা হব।আপনি শুধু আকবারের উপর অভিভাবক ফলাবেন।বাকিটা আমরাই সামলে নেব।”
একথা বলার পর সেদিনের মতো ষড়যন্ত্র শেষ হলো।
বৈরাম খাঁ নিজের মহলে ফিরে গেলেন। কিন্তু সেদিন রাতে তার ঘুম সহজে এলো না।
তিনি ভাবতে লাগলেন, তিনি কি সত্যিই ক্ষমতার লোভে নিজের পুরোনো প্রতিজ্ঞা ভুলে যাচ্ছেন?
অথচ পরদিনই তাকে রাজদরবারে এমন আচরণ করতে হবে, যার মাধ্যমে অন্যরা বুঝবে আকবার তার ওপর নির্ভরশীল।
রাত গভীর হলো। প্রাসাদের অন্য সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, বৈরাম খাঁ তখনো জেগে ছিলেন। একসময় তিনি নিজের হাতে থাকা পুরোনো অস্ত্রটির দিকে তাকালেন। এই অস্ত্র দিয়ে তিনি বহু যুদ্ধ করেছেন। হুমায়ুনের জন্য লড়েছেন। মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য লড়েছেন।
কিন্তু এখন সেই একই মানুষ নিজের মনেই ক্ষমতার হিসাব করতে শুরু করেছেন।
নাইন.
রাজদরবারে মাতুব্বরি
পরদিন থেকেই শুরু হলো রাজদরবারে বৈরাম খাঁর মাতুব্বরি।
প্রথম দিনেই রাজদরবারে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারল, বৈরাম খাঁর আচরণ বদলে গেছে।
একটা কিছু হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় বৈরাম খাঁর শাসন বারন।
সম্রাটের প্রতিটি কাজের মধ্যেই তিনি ত্রুটি খুঁজতে শুরু করলেন।
“তুমি এটা করলে কেন?তুমি ওটা করলে কেন?তুমি এটা বললে কেন?তুমি ওটা বললে কেন?তুমি এভাবে বসলে কেন?তুমি ওভাবে বসলে কেন?” সম্রাট আকবারকে বৈরাম খাঁ এভাবেই শাসন করতে লাগলেন।
দরবারে উপস্থিত লোকেরা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল।
কেউ কিছু বলল না।
কেউ বৈরাম খাঁকে থামাল না।
এমনভাবে সম্রাট আকবারকে বৈরাম খাঁ শাসন করতে লাগলেন,যেন সম্রাট আকবার একটা নির্বোধ বালক মাত্র।
আকবার বাইরে থেকে শান্ত থাকলেন। তিনি কোনো তর্কে গেলেন না।
কিন্তু তার চোখে তখন আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা।
তিনি লক্ষ্য করলেন, বৈরাম খাঁর এই আচরণ হঠাৎ কেন পরিবর্তিত হলো।
কেউকে কিছু না বলা সত্ত্বেও রাজদরবারে উপস্থিত সকলেই বুঝতে শুরু করলেন যে, আকবার নিছক নামমাত্র সম্রাট।মূলত বৈরাম খাঁ_ই হচ্ছেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান ব্যক্তি।
এই ধারণা ধীরে ধীরে রাজদরবারের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
একটা সময় এই বিষয়টা রাজসভায় সীমাবদ্ধ রইলো না। রাজসভা থেকে সেনাবাহিনী,এমনকি অন্দর মহলেও বিষয়টা জানাজানি হতে লাগলো।
বৈরাম খাঁর নামের সঙ্গে তখন ক্ষমতার আলোচনা জড়িয়ে গেল।
কিন্তু আকবার নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।
তিনি বুঝলেন, তার সামনে থাকা মানুষটি শুধু একজন অভিভাবক নন। তার আচরণের পেছনে অন্য কারও প্ররোচনা থাকতে পারে।
তবে আকবার কোনো তাড়াহুড়ো করলেন না।
তিনি জানতেন, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো ধৈর্য।
দশ.
নজরদারিতে বৈরাম খাঁ
আকবার শুরুতে অন্য দশ জন বালকের মতোই খেলাধূলা করতে লাগলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর যতটুকু দুঃখ _ বেদনা ছিলো, সেটা এখন মেয়েদের সাথে খেলাধূলা করে কমে যেতে লাগলো।
রাজপ্রাসাদের বাইরে থেকে মনে হতে লাগল, আকবার সত্যিই রাজকার্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
ওরা ভেবেছিলো, মেয়েদের সাথে খেলাধূলা করে আকবার সাম্রাজ্যের বিষয় ভুলে যাবেন। আর অতি সহজেই আকবারের সিংহাসন ওরা দখল করে নেবে।
কিন্তু তাদের পরিকল্পনায় একটি বড় সমস্যা ছিল।
কিন্তু বালক সম্রাট আকবারের সন্দেহ শুরু এটা দেখে যে, মেয়েদের সাথে ফুর্তি করার সময় বৈরাম খাঁ কিছুই বলেন না_অথচ রাজ সভায় শাসনের কোন শেষ নাই।
আকবার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবলেন।
এই কারণে বৈরাম খাঁর প্রতি আকবারের সন্দেহ জাগ্ৰত হলো। কেননা, বর্তমানে আকবারের অভিভাবক হিসেবে বৈরাম খাঁ সক্রিয় আছেন।
একজন অভিভাবক যদি সত্যিই সম্রাটের মঙ্গল চান, তাহলে আনন্দের সময়ও তাকে সতর্ক করতে পারেন। কিন্তু বৈরাম খাঁ যেন অন্য সময়ের তুলনায় এখানে সম্পূর্ণ উদাসীন।
তাই বৈরাম খাঁকে সম্রাট আকবার নজরদারিতে অন্তর্ভুক্ত করলেন। এর জন্য রাজ সভার একজনকে সম্রাট আকবার নিয়োজিত করে রাখলেন।
আকবার সেই লোকটিকে গোপনে নির্দেশ দিলেন বৈরাম খাঁ কোথায় যান, কার সঙ্গে কথা বলেন এবং কী আলোচনা করেন—এসব খেয়াল রাখতে।
কিন্তু সেই লোককে সম্রাট আকবার এটাও বলে রাখলেন,বিশ্বাসঘাতকতা করলে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে।
নজরদারিতে থাকা লোকটি বুঝল, তার দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন।
অন্যদিকে বৈরাম খাঁ বুঝতেই পারলেন না, তার চারপাশে ইতিমধ্যে সম্রাটের চোখ পৌঁছে গেছে।
দিন যেতে লাগল। বৈরাম খাঁ ভাবছিলেন, তার পরিকল্পনা ধীরে ধীরে সফল হচ্ছে। দরবারে অনেকেই এখন তাকে আকবারের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান মনে করছে।
কিন্তু তিনি জানতেন না, আকবার তার প্রতিটি পদক্ষেপের হিসাব রাখছেন।
এগারো.
সন্দেহ যখন বাস্তব হলো
কিন্তু একটা ঘটনার পর বৈরাম খাঁর ব্যাপারে সম্রাট আকবারের সন্দেহ বাস্তব বিষয়ে পরিণত হলো।
একদিন আকবার নিজের খাস কামরায় ছিলেন।
সম্রাট আকবার নিজ খাস কামরায় তিনির চেয়ে প্রায় দশ বছরের বড় একটা অবিবাহিত মেয়ের সাথে ইনটিমেট হলেন।
এরপর তিনি মখমলের বিছানায় বসে কস্তুরি মিশ্রিত আঙুরের রস খাচ্ছিলেন আর ভাবের জগতে ডুবে যাচ্ছিলেন।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি তার কাছে বসে কথা বলতে শুরু করল।
এমন সময় মেয়েটা বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনমতে বিছানা থেকে উঠে সম্রাট আকবারের পায়ের কাছে বসল।
মেয়েটা সম্রাট আকবারের পা মালিশ করতে করতে জিজ্ঞেস করলো,“তুমি যখন আফগানিস্তানে চলে যাবে,তখন কি আমাদেরকে ভুলে যাবে?”
আকবারের মুখের স্বাভাবিক ভাব মুহূর্তে বদলে গেল।
একথা শোনে সম্রাট আকবার হতবাক উঠলেন। কিন্তু তখনই নিজেকে সামলে নিলেন।
তিনি বুঝলেন, এই তথ্য সাধারণভাবে কারও জানার কথা নয়।
তিনি স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটাকে বললেন,“তোমাদেরকে আমি কখনই ভুলতে পারব না। এমনকি আফগানিস্তানে আমি চলে গেলেও তোমাদেরকে আমার খুব মনে পড়বে।আচ্ছা,আমি যে আফগানিস্তানে চলে যাব,সেটা তুমি জানলে কীভাবে?”
মেয়েটি কোনো সন্দেহ না করেই উত্তর দিল।
মেয়েটা বলল,“আমি সেটা জেনেছি বারুদ চাচার স্ত্রী জামিনা চাচীর কাছ থেকে।”
আকবার এবার আরও সতর্ক হলেন।
মেয়েটা আরো কিছুক্ষণ সম্রাট আকবারের সেবাযত্ন করল।এরপর মেয়েটাকে একটা মুক্তার মালা উপহার দিয়ে সম্রাট আকবার বিদায় করলেন।
মেয়েটি চলে যাওয়ার পর আকবার কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন।
তার মনে এখন একটি প্রশ্ন স্পষ্ট—তার ব্যক্তিগত কথাবার্তা কীভাবে বাইরে পৌঁছাচ্ছে?
আর সেই তথ্য কার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে?
তিনি সঙ্গে সঙ্গে জামিনাকে ডাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।
বারো.
বারুদ খাঁর বউ জামিনাকে তলব
সেদিনই বারুদ খাঁর বউ জামিনাকে সম্রাট আকবার খবর দিয়ে নিজের মহলে আনলেন।
জামিনা সম্রাটের সামনে এসে মাথা নত করে দাঁড়াল।
আকবার তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।
সম্রাট আকবার জিজ্ঞেস করলেন,“এই ভারতের প্রতি আমার মন বিষিয়ে উঠেছে। আমি আফগানিস্তানে চলে যাব।তবে বিষয়টা সকলেই জানে না।আমি কয়েকজনকে বিষয়টা বলছিলাম।তা আপনি এটা জানলেন কীভাবে?”
জামিনা কিছুক্ষণ দ্বিধা করলেও শেষ পর্যন্ত সত্য কথাই বলল।
জামিনা বলল,“আমার স্বামী আমাকে বলেছেন।আর তিনি সেটা জেনেছেন মহান সেনাপতি বৈরাম খাঁর কাছ থেকে।”
এই উত্তর শুনে আকবারের মনে থাকা সন্দেহ আরও দৃঢ় হলো।
তিনি বুঝলেন, বিষয়টি কেবল জামিনা বা তার স্বামীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তার অভিভাবক বৈরাম খাঁ পর্যন্ত সেই গোপন কথার সঙ্গে জড়িত।
একথা শোনার পর জামিনাকে সম্রাট আকবার কিছু স্বর্ণ মুদ্রা উপহার দিয়ে বিদায় দিলেন।
জামিনা চলে যাওয়ার পর আকবার একা বসে রইলেন।
তার মনে পড়ল, বৈরাম খাঁর প্রতি তার বাবার বিশ্বাসের কথা।
আকবার ভাবলেন, এমন একজন মানুষ কেন তার বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়বেন?
তিনি তখনো বৈরাম খাঁকে সরাসরি অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করলেন না।
কিন্তু তিনি নিশ্চিত হলেন, বৈরাম খাঁর ওপর নজর আরও বাড়াতে হবে।
আকবার বুঝতে পারলেন, এখনো সময় আছে। কিন্তু সেই সময় বেশি দিন থাকবে না।
তিনি গোপনে তার বিশ্বস্ত লোকদের নির্দেশ দিলেন, বৈরাম খাঁর সঙ্গে কারা দেখা করছে এবং কারা তার কাছে যাচ্ছে, সেসবের খোঁজ রাখতে।
তেরো.
বারুদ খাঁ ও কামান খাঁকে হত্যা
সেদিন আবার বৈরাম খাঁকে নিয়ে বারুদ খাঁ আর কামান খাঁ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।
তারা বুঝতে পারছিল, তাদের পরিকল্পনার সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কামান খাঁ বলল,“আকবারের কাছে মেয়ে মানুষকে পাঠিয়ে তেমন কাজ হচ্ছে না।মেয়ে মানুষদের সাথে সে ঠিকই ফুর্তি করছে, আবার রাজ্যের হিসাবও নিচ্ছে।”
বারুদ খাঁ বলল,“এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আকবার জেনে ফেলবে।তখন সে আমাদেরকে হত্যা করতেও দ্বিধা করব না।তাই আমাদের ষড়যন্ত্র জানার আগেই আকবারকে আমাদের হত্যা করতে হবে।”
কামান খাঁ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কামান খাঁ বলল,“আকবারকে হত্যা করা কি এতোই সহজ?সে ওর মহলের নিরাপত্তা আরো জোরদার করেছে।”
বৈরাম খাঁ তখন পর্যন্ত তাদের কথা শুনছিলেন। সম্রাটকে হত্যা করার কথা শুনে তার মুখের রং বদলে গেল।
বৈরাম খাঁ হতবাক হয়ে বললেন,“ছিঃ, তোমরা এরকম কীভাবে হলে? আমাদের সম্রাটকে আমরা কেন হত্যা করব? এটা কোনভাবেই আমরা করব না।”
কিন্তু ক্ষমতার লোভে আক্রান্ত বারুদ খাঁ আর পিছু হটল না।
বারুদ খাঁ বলল,“আকবারকে আমরা হত্যা করবই। আমাদেরকে সেটা করতেই হবে।”
বৈরাম খাঁর মনে আবার দ্বন্দ্ব শুরু হলো।
একদিকে তিনি জানতেন, আকবার তার সম্রাট।
অন্যদিকে এতদিন ধরে শুনতে শুনতে ক্ষমতার চিন্তা তার মনকে দুর্বল করে ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত সেই দুর্বলতাই তাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিল।
ক্ষমতার লোভে পড়ে বৈরাম খাঁ রাজি হলেন।তিনি বললেন,“আচ্ছা, তোমাদের কথা আমি মেনে নিলাম। কিন্তু আকবারকে হত্যা করতে হবে অত্যন্ত কৌশল করে। সে বয়সে বালক হলেও বুদ্ধিতে খুবই অভিজ্ঞ মানুষের মতো।”
বারুদ খাঁ ও কামান খাঁ মনে করল, তাদের পরিকল্পনা সফল হয়েছে।
কিন্তু তারা জানত না, সম্রাট আকবার ইতিমধ্যেই তাদের কথোপকথনের খবর পেয়ে গেছেন।
হঠাৎ বাইরে সৈন্যদের পদশব্দ শোনা গেল।
তিনজনেই চমকে উঠল।
দরজা খুলে সৈন্যদের সঙ্গে সম্রাট আকবার প্রবেশ করলেন।
এমন সময় সম্রাট আকবার সৈন্য নিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনিকে দেখে সকলেই হতবাক হয়ে গেলো। বারুদ খাঁ আর কামান খাঁকে সৈন্যরা পাকড়াও করলো।আর সম্রাট আকবার তাদেরকে হত্যা করলেন।
বারুদ খাঁর মুখে আর কোনো যুক্তি রইল না।
কামান খাঁও বুঝতে পারল, তাদের ষড়যন্ত্র শেষ।
কিন্তু বৈরাম খাঁ তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি জানতেন, তার নিজের নামও এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত।
তার মনে তখন শুধু একটি প্রশ্ন—আকবার তার সঙ্গে কী করবেন?
দরবারের সৈন্যরা বারুদ খাঁ ও কামান খাঁকে নিয়ে গেল। তাদের ষড়যন্ত্রের পরিণতি সেখানেই শেষ হলো।
কিন্তু বৈরাম খাঁর বিচার তখনো বাকি।
চৌদ্দ.
বৈরাম খাঁর নির্বাসন
আকবারের বিশ্বস্ত লোক গনি মির্জা বলল,“সম্রাট, এবার বৈরাম খাঁকেও আমরা হত্যা করব।”
রাজদরবারে উপস্থিত অন্যদের মধ্যেও একই ধরনের আলোচনা শুরু হলো। কারণ বৈরাম খাঁ শুধু সন্দেহভাজন নন; তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে এক পর্যায়ে সম্মত হয়েছিলেন।
কিন্তু আকবার কিছুক্ষণ নীরবে বৈরাম খাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তার চোখে রাগের সঙ্গে পুরোনো স্মৃতিও ছিল।
আকবার বললেন,“না, বৈরাম খাঁকে আমি হত্যা করব না। বরং তাকে আমি নির্বাসনে পাঠিয়ে দেব। সে আমার সাথে সে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে, কিন্তু অতীতে সে ছিলো আমার একনিষ্ঠ সেবক। তাই আমি তাকে হত্যা করব না।”
আকবারের সিদ্ধান্তে দরবারের অনেকে বিস্মিত হলো।
বৈরাম খাঁ নিজেও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার মনে তখন নিজের ভুলের ভার।
তিনি বুঝলেন, ক্ষমতার লোভ তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের অতীতের আনুগত্যকেও অস্বীকার করার পথে চলে গিয়েছিলেন।
পরদিন বৈরাম খাঁকে সম্রাট আকবার নির্বাসনে পাঠিয়ে দিলেন।
বৈরাম খাঁকে একটি ঘোড়া দেওয়া হলো। তার সামনে ছিল দীর্ঘ পথ।
তিনি আর রাজদরবারের সেনাপতি নন।
তিনি আর সম্রাটের অভিভাবক নন।
তিনি এখন একজন নির্বাসিত মানুষ।
সম্রাট আকবার দেখলেন, বৈরাম খাঁ ঘোড়ায় উঠে ইরানের দিকে যাচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ বৈরাম খাঁর চলে যাওয়া দেখলেন। এরপর চলে এলেন নিজের মহলে।
আকবারের মনে বৈরাম খাঁর প্রতি ক্রোধ থাকলেও তার অতীতের সেবার কথাও রয়ে গেল।
আর বৈরাম খাঁ নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন যাত্রা শুরু করলেন।
ঘোড়ার পিঠে বসে তিনি পেছনের দিকে তাকালেন। রাজপ্রাসাদ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
যে প্রাসাদে তিনি একসময় ক্ষমতার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন, সেই প্রাসাদ এখন তার কাছ থেকে অনেক দূরে।
তিনি বুঝলেন, ক্ষমতা মানুষের হাতে স্থায়ীভাবে থাকে না।
আজ যে মানুষ দরবারের কেন্দ্রে থাকে, কাল সে-ই হতে পারে নির্বাসিত।
পনেরো.
বৈরাম খাঁর পরিচয় প্রকাশ
পথ চলতে চলতে বৈরাম খাঁ চলে এলেন বহুদূর। এই স্থান থেকে দেখা যায়না সম্রাট আকবারের প্রাসাদ। এবং সম্রাট আকবারের সৈন্য বাহিনীকেও দেখা যায়না।
দিল্লির রাজদরবার তখন তার কাছে কেবল স্মৃতি। সামনে শুধু দীর্ঘ পথ।
আরো পথ পেরোলেন। এবার পেলেন একটা ছোট জনপদ। এই এলাকার লোকদেরকে লেখে বৈরাম খাঁর মনে হলো, ওরা কৃষি কাজ করে জীবন নির্বাহ করে।
জনপদের মানুষজন নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিল। একজন অচেনা ঘোড়সওয়ারকে দেখে তাদের মধ্যে কৌতূহল জন্ম নিল।
বৈরাম খাঁকে ঘোড়ায় চড়ে আগমন করতে দেখে অনেক লোক এসে জড়ো হলো।
লোকদের মধ্যে আলাল ও আবুলও ছিল।
আলালকে আবুল বলল,“এই লোক নিশ্চয়ই বড় সওদাগর হবে। ভারতে ব্যবসা করেছে। এখন ব্যবসা শেষ করে ইরান যাচ্ছে আরো মালামাল আনার জন্য। নিশ্চয়ই ওর কাছে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা আছে। চলঝ, আমরা ওর সেবাযত্ন করি। তাহলে হয়তো সে খুশি হয়ে আমাদেরকে পুরস্কার স্বরূপ স্বর্ণমুদ্রা দেবে।”
একথা শোনে আলাল বলল,“চলো সেটাই করি। অনেক দিন যাবৎ আমাদের কাছে তেমন টাকা নাই। এবার এই সওদাগরের সেবা করে টাকা পাবো।”
একথা বলে ওরা দুজনই এগিয়ে গেলো বৈরাম খাঁর কাছে।
আলাল বলল,“জনাব, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছেন। তাই দয়া করে যদি আমাদের বাড়িতে বিশ্রাম নিতেন, তাহলে আমরা ধন্য হয়ে যেতাম।”
আবুল বলল,“জ্বি জনাব, আপনি দয়া করে আমাদের এলাকায় বিশ্রাম গ্ৰহণ করুন।”
বৈরাম খাঁ ক্লান্ত ছিলেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর বিশ্রামের প্রয়োজনও ছিল।
একথা শোনে বৈরাম খাঁ ভাবলেন,“অনেক পথ তো অতিক্রম করলাম।এবার বিশ্রাম নিয়ে ইরানের পথে আবার চলা শুরু করব।”
আলালকে বৈরাম খাঁ বললেন,“চলো, তোমার ঘরেই আমি বিশ্রাম নেব। তবে একদিনের বেশি আমি থাকবনা।”
আলাল মনে মনে খুশি হলো।
আলাল ভাবলো,“এমন সেবা করব যে, এই লোক একদিনেই প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দেবেন।”
এরপর বৈরাম খাঁকে আলাল ঘরে নিয়ে গেলো।
ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে বসার ব্যবস্থা করা হলো।
লেবুর শরবত খাওয়ার পর বৈরাম খাঁ একটু পাশ ফিরে শুইলেন। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে আলাল জিজ্ঞেস করল,“জনাব, আপনার পরিচয় কী? আপনি কোথা থেকে এসেছেন?”
বৈরাম খাঁ বললেন,“আমার নাম বৈরাম খাঁ, আমি দিল্লি থেকে এসেছি। আমি ছিলাম সম্রাট হুমায়ুনের সেনাপতি এবং বর্তমান সম্রাট আকবারের সেনাপতি।”
আলাল কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
একথা শোনে আলাল ভাবলো,“লোকটা পাগল নাকি? বৈরাম খাঁ বলে নিজেকে দাবি করতেছে। লোকটা একাকী এভাবে কোথায় যাচ্ছে?”
বৈরাম খাঁকে আলাল বলল,“জনাব, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আর আপনি এভাবে একা কেন?”
বৈরাম খাঁ তখন নিজের জীবনের ঘটনাগুলো বলতে শুরু করলেন।
বৈরাম খাঁ বললেন,“প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে আমাকে সম্রাট আকবার নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। তাই আমি এখন ইরানে চলে যাচ্ছি। কতিপয় ব্যক্তি সম্রাট আকবারকে হত্যা করার ব্যবস্থা করেছিলো। এবং আমাকে সম্রাট বানাতে চেয়েছিলো। কিন্তু ওরা ধরা পড়ে যায়। তাই ওদেরকে সম্রাট আকবার হত্যা করেছেন। কিন্তু আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন।”
আলাল অতীতে কখনো বৈরাম খাঁকে দেখেনি।
অতীতে আলাল কখনই বৈরাম খাঁকে দেখেনি। তাই বৈরাম খাঁ ঘুমিয়ে পড়লে সে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
সে দ্রুত নিজের পিতামহের কাছে গেল।
আলাল অতীতে বৈরাম খাঁকে না দেখলেও ওর পিতামহ আবেদ খাঁ একবার বৈরাম খাঁকে দেখেছিলেন।
তাই আলাল গেলো ওর পিতামহের কাছে এবং সকল কথা বলল।
আবেদ খাঁ মনোযোগ দিয়ে আলালের কথা শুনলেন।
আবেদ খাঁ বললেন,“আমি অনেক আগে বৈরাম খাঁকে দিল্লিতে দেখেছিলাম। ওই লোক যদি বৈরাম খাঁ হয়, তাহলে ওর আজ রেহাই নাই।”
আলাল বিস্মিত হয়ে গেল।
আলাল বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,“আপনি কেন এগুলো বলতেছেন?”
আবেদ খাঁর চোখে পুরোনো ক্ষোভ ফুটে উঠল।
আবেদ খাঁ বললেন,“আমাদের এই দুর্দশার জন্য বৈরাম খাঁ দায়ি। আমরা আফগান পাঠান। আমরাই ছিলাম এই ভারতবর্ষের শাসক। কিন্তু মোগলরা এসে ক্ষমতা দখল করে নেয়। এরপর হুমায়ুনকে শেরশাহ পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু বৈরাম খাঁর নেতৃত্বে ইরানি সৈন্যরা হুমায়ুনকে আবার ক্ষমতায় বসিয়েছিলো। এই কারণেই বর্তমানে আমরা পাঠানদের এই দুর্দশা। যদি ওই লোক বৈরাম খাঁ হয়, তাহলে তাকে আমি আজ হত্যা করে প্রতিশোধ নেব।”
আবেদ খাঁর মনে বহু বছরের পুরোনো ক্ষোভ জমে ছিল।
একথা বলে আবেদ খাঁ প্রবেশ করলেন আলালের ঘরে। গিয়ে দেখলেন, সত্যিই বৈরাম খাঁ শুয়ে আছেন।
তিনি কিছুক্ষণ বৈরাম খাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তাই আবেদ খাঁ খাপ থেকে তলোয়ার বের করে বৈরাম খাঁকে গেলেন হত্যা করার জন্য।
কিন্তু আলাল সামনে এসে দাঁড়াল।
কিন্তু তাকে আলাল থামিয়ে বলল,“না পিতামহ, বৈরাম খাঁকে আপনি হত্যা করবেন না। কেননা, তিনি এখন আমার মেহমান। আমি কখনই তা হতে দেব না।”
আবেদ খাঁ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
আবেদ খাঁ বললেন,“আচ্ছা, বৈরাম খাঁকে তোমার ঘরে আমি হত্যা করব না। কিন্তু তোমার ঘরের বাইরে তাকে আমি হত্যা করলে, তুমি আমাকে আটকাবেনা।”
আলাল বুঝতে পারল, তার পিতামহের ক্রোধ এখনো শেষ হয়নি।
একথা বলে আবেদ খাঁ বের হয়ে গেলেন আলালের ঘর থেকে।
বৈরাম খাঁ তখনো জানতেন না, তার সামনে কী অপেক্ষা করছে।
ষোলো.
নিহত হলেন বৈরাম খাঁ
পরদিন আলালের ঘর থেকে বৈরাম খাঁ বিদায় নিয়ে চলতে লাগলেন ইরানের পথে।
আলাল তাকে বিদায় দিল। আবেদ খাঁ দূর থেকে তাকিয়ে রইলেন।
বৈরাম খাঁ তখনও ভাবছিলেন, তার নির্বাসনের জীবন হয়তো দীর্ঘ হবে। কিন্তু অন্তত তিনি বেঁচে আছেন।
প্রায় দশ মাইল যাওয়ার পর আবেদ খাঁর সাথে বৈরাম খাঁর দেখা হলো।
বৈরাম খাঁ ঘোড়া থামালেন।
মূলত শেষ রাতেই ঘুম থেকে উঠে আবেদ খাঁ এখানে এসে অপেক্ষা করতে থাকেন বৈরাম খাঁর আগমনের জন্য।
আবেদ খাঁ জানতেন, বৈরাম খাঁকে ইরানের দিকে যেতে হলে এই পথই ব্যবহার করতে হবে।
এই এলাকায় ইরানে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পথ ধরেই যাওয়া আসা করতে হয়।
পাহাড়ের দুই পাশে পাথুরে ভূমি। সামনে সরু পথ।
আবেদ খাঁ ঘোড়া নিয়ে বৈরাম খাঁর পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইলেন। পথ আটকানোর কারণে বৈরাম খাঁ বললেন,“আমি তো যেতে পারছিনা। তুমি সরো।”
আবেদ খাঁ ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরলেন।
আবেদ খাঁ বললেন,“আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।”
বৈরাম খাঁ বিস্মিত হলেন।
বৈরাম খাঁ বললেন,“তোমার কত বড় সাহস? আমাকে তুমি হত্যা করতে চাও। তুমি কি জানো আমি কে? আমি মোগল সাম্রাজ্যের সেনাপতি বৈরাম খাঁ।”
আবেদ খাঁ যেন এই পরিচয় শোনার অপেক্ষাতেই ছিলেন।
আবেদ খাঁ বললেন,“আমি গতকালই তোমাকে চিনতে পেরেছি। এখন তোমার মুখে পরিচয় শোনে আরো নিশ্চিত হলাম। বৈরাম খাঁ, আজ তোমার রেহাই নাই। যত পাঠান সেনাকে তুমি হত্যা করেছো, এর প্রতিশোধ আজ আমি নেব।”
বৈরাম খাঁ নিজের তলোয়ারের দিকে হাত বাড়ালেন।
বৈরাম খাঁ বললেন,“মোগল সাম্রাজ্যের সেনাপতি হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সূত্রে পাঠান সেনারা নিহত হয়েছে।”
আবেদ খাঁর চোখে তখন পুরোনো যুদ্ধের স্মৃতি।
আবেদ খাঁ বললেন,“এখন নিহত পাঠান সেনাদের প্রতিনিধি হয়ে আমি তোমাকে হত্যা করব।”
দুজনের মধ্যে আর কোনো কথার প্রয়োজন রইল না।
আবেদ খাঁ একথা বলে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে বৈরাম খাঁর দিকে ঘোড়া ছুটালেন। বৈরাম খাঁ ঘোড়ার উপরে বসেই খাপ থেকে তলোয়ার বের করে আবেদ খাঁর দিকে ঘোড়া ছুটালেন। দুজনেই তলোয়ার দ্বারা যুদ্ধ করতে লাগলেন।
পাহাড়ি পথের নীরবতা ভেঙে গেল তলোয়ারের শব্দে। দুই ঘোড়া এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। দুজনেই অভিজ্ঞ যোদ্ধা হওয়ায় কেউ সহজে অন্যকে পরাস্ত করতে পারছিল না।
বৈরাম খাঁ বহু যুদ্ধ করেছেন। আবেদ খাঁর মধ্যেও ছিল প্রবল প্রতিশোধস্পৃহা।
দুজনের তলোয়ার বারবার পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে লাগল। পাহাড়ের পাথুরে পথ তাদের যুদ্ধকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
কিছুক্ষণ পর যুদ্ধের পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গেল।
কিছুক্ষণ পর বৈরাম খাঁর ঘোড়া পাথরে হোঁচট লাগলো এবং উলটে পড়ল। তাই বৈরাম খাঁ উল্টে পতিত হলেন মাটিতে। আর মাটিতে থাকা একটা পাথরে বৈরাম খাঁর মাথাটা আঘাত লাগলো। এর ফলে বৈরাম খাঁর অজ্ঞান হলেন না, কিন্তু চোখে অন্ধকার দেখতে পেলেন।
তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মাথায় আঘাত লাগায় তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল।
এই সুযোগে আবেদ খাঁ ঘোড়া থেকে নামলেন। এবং বৈরাম খাঁকে হত্যা করলেন।
বৈরাম খাঁর জীবনের দীর্ঘ পথের এখানেই সমাপ্তি ঘটল।
যে মানুষ একসময় হুমায়ুনকে সিংহাসনে ফিরিয়ে আনতে লড়েছিলেন, যে মানুষ আকবারকে সিংহাসনে বসানোর পর তার অভিভাবক হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষই নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে নির্বাসিত হয়ে অপরিচিত ভূমিতে মৃত্যুবরণ করলেন।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন আবেদ খাঁ। এরপর বৈরাম খাঁর দেহটাকে বৈরাম খাঁর ঘোড়ার পিঠে শক্ত করে বাঁধলেন। এবার আবেদ খাঁ নিজের ঘোড়ার উপরে উঠলেন। বৈরাম খাঁর ঘোড়ার দড়িটা একহাতে ধরলেন, এবং আরেক হাতে নিজের ঘোড়া চালাতে লাগলেন আবেদ খাঁ। ঘোড়া ছুটিয়ে আবেদ খাঁ চলে এলেন লোকালয়ের কাছে।
লোকালয়ের কাছে এসে আবেদ খাঁ বৈরাম খাঁর দেহ নামিয়ে আনলেন।
এরপর বৈরাম খাঁর লাশটা আবেদ খাঁ ঘোড়া থেকে নামালেন। এরপর মুসলিম রীতিতে দাফন করলেন।
একসময়ের শক্তিশালী সেনাপতির শেষ ঠিকানা হয়ে গেল একটি সাধারণ কবর।
বৈরাম খাঁর ঘোড়া থেকে সকল জিনিসপত্র নামালেন, এবং ফেলে দিলেন পাহাড়ি নদীতে। এরপর ঘোড়াটাকে মুক্ত করে দিলেন। কিছুদিন পর এই ঘোড়াটা বুনো ঘোড়ায় পরিণত হবে।
ঘোড়াটি ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ধরে দূরে চলে গেল।
আবেদ খাঁ কিছুক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এরপর আবেদ খাঁ নিজের ঘোড়ার উঠলেন এবং চলতে লাগলেন নিজের গ্ৰামের দিকে।
পাহাড়ের পথ আবার নীরব হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে দুই যোদ্ধার তলোয়ারের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, সেখানে এখন শুধু বাতাসের শব্দ।
পিছনে রইলো মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সেনাপতি বৈরাম খাঁর কবর। (সমাপ্ত।) ©️All Right Reserved by Junayed Ashrafur Rahman
24°33'58.6"N 90°41'30
My home Location ✒ https://goo.gl/maps/RoKi3ekrhkm5PAHPA , But I don't live here. Rented out to other peo
Nandail Municipality, Mymensingh, Banglad
Junayedmn1@gmail
My Writings ✒ https://www.blogger.com/profile/1173462471832872
702) My success in writing. (লেখালেখিতে আমার সাফল্য।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2023/06/702-my-success-in-writing-written-by.
707)After the fantasy of ministry.(মন্ত্রিত্বের ফ্যান্টাসির পরে।)– Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://mytimemyexperiencesjunayedmn1.blogspot.com/2023/06/707after-fantasy-of-ministry-written-by.
636) About the intellectual property of my writing.(আমার লেখার মেধাস্বত্ব সম্পর্কে।)— Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://parg.co/
637)Win prizes.(পুরস্কার জিতুন।) - Written by Junayed Ashrafur ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2022/10/637win-prizes-written-by-junayed.
667)Case against AI ChatGPT. (এআই চ্যাট জিপিটির বিরুদ্ধে মামলা।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://lawforjusticejunayedmn1.blogspot.com/2023/02/667case-against-chat-gpt-written-by.html http://ow.ly/Zawy104
#Intellectualproperty #Literature #Law #Contract #Writing #Wisd omu7kOhtmlUdXGhtmlhtml3069.comesh.ple..4"E
