852)(Story_65) (বাংলা ভার্সন।) অন্তর্বৃত্তেব় সীমানা। _ Written by Junayed Ashrafur Rahman
852)(Story_65) (বাংলা ভার্সন।) অন্তর্বৃত্তেব় সীমানা। _ Written by Junayed Ashrafur Rahman https://mywritingsjunayedmn1.blogspot.com/2019/12/about-me-junayed-ashrafur-rahman.html ✒
🌟 The video of how to translate my writings into your language.(আমার লেখাগুলো যেভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে পড়বেন,সেটার ভিডিও।) https://youtube.com/shorts/cB4L80u1IIc?si=jJV-G14OIP_qQeLA 🌟https://www.facebook.com/share/v/1GuWS35Joi/
অধ্যায় এক.
নীরবতার সমীকরণ
নগরটির নাম কেউ ঠিক করে বলতে পারত না। সরকারি নথিতে এক নাম, পুরোনো মানচিত্রে আরেক নাম, আর সাধারণ মানুষের মুখে অন্য একটি পরিচয়। উঁচু দালান, কাচের দেয়াল, ব্যস্ত সড়ক, সরকারি দপ্তর, বাণিজ্যিক ভবন আর অন্ধকার গলির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নগরটি বাইরে থেকে আধুনিক মনে হতো। কিন্তু ওই আধুনিকতার আড়ালে জমে ছিল ভয়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অদৃশ্য হিসাব।
নগরটির কেন্দ্রে একটি পুরোনো চায়ের দোকান ছিল। চারপাশে নতুন নতুন কফিশপ তৈরি হলেও দোকানটি টিকে ছিল আগের মতোই। টিনের চাল, কাঠের বেঞ্চ, কয়েকটি পুরোনো টেবিল এবং দেয়ালে ঝুলতে থাকা বিবর্ণ ক্যালেন্ডার। দোকানের মালিক ভাদ্র ভাই। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মানুষকে বেশি প্রশ্ন করতেন না। কেউ চা খেতে এলে চা দিতেন। কেউ কথা বলতে চাইলে শুনতেন। আর কেউ চুপ করে বসে থাকলে ওর নীরবতাকে সম্মান করতেন।
সেই দোকানে প্রায়ই আসত জারেক।
জারেককে দেখে প্রথমবার কেউ বুঝতে পারত না, ও কী কাজ করে। সাধারণ পোশাক পরত। দামি গাড়ি ব্যবহার করত না। পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলত না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জীবন নিয়ে প্রচারও করত না। ওর চলাফেরায় এমন একটি সতর্কতা ছিল, যা সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যেত। কিন্তু যারা ওকে একবার কাছ থেকে দেখেছে, তারা বুঝেছিল, জারেক অকারণে কারও দিকে তাকায় না। আর একবার কোনো ঘটনা লক্ষ করলে সেটি সহজে ভুলেও যায় না।
ওর জীবনের একটি কঠোর নিয়ম ছিল।
“কেউ নিজের বাক্স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে কথা বললে আমি ওর মুখে আঘাত করি না। কিন্তু কেউ অন্যের বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইলে আমি ওকে থামাতে পিছপা হই না। কেউ নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতা বজায় রাখলে আমি ওর হাত-পায়ে আঘাত করি না। কিন্তু কেউ অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভাঙতে এগিয়ে এলে আমি ওর বিরুদ্ধে দাঁড়াই।”
এই নিয়মের ব্যাখ্যা জারেক কাউকে দিতে চাইত না। ওর কাছে স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের স্লোগান ছিল না। স্বাধীনতা ছিল মানুষের নিজের কথা বলার, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অধিকার। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে জারেকের আচরণ বদলে যেত।
তবে ও নিজেকে বিচারক মনে করত না। নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার বিপদও ও বুঝত। তবু কিছু পরিস্থিতিতে ওর সংযম ভেঙে যেত। আর প্রতিবার সেই সীমা অতিক্রম করার পর ওকে নিজের সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হতো।
এক বিকেলে চায়ের দোকানের সামনের সড়কে যানজট তৈরি হয়েছিল। গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার, পথচারীদের তাড়াহুড়ো আর রাস্তার পাশের বিজ্ঞাপনী পর্দার আলো মিলে চারপাশে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। জারেক বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছিল।
ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশে ওর চোখ পড়ল এক তরুণীর দিকে।
তরুণীর নাম মাইলিন।
কয়েক দিন আগে নগরের কেন্দ্রীয় উদ্যানের পাশে ওর সঙ্গে জারেকের প্রথম দেখা হয়েছিল। মাইলিন একটি বেঞ্চে বসে ছবি আঁকছিল। কাগজে মানুষের অবয়ব ছিল, কিন্তু কারও মুখ ছিল না। কারও চোখ নেই, কারও ঠোঁট নেই, কারও পরিচয় বোঝার উপায় নেই। শুধু শরীরের রেখা, পোশাকের ভাঁজ এবং চারপাশের পরিবেশ দিয়ে সে মানুষের অবস্থান বোঝানোর চেষ্টা করছিল।
জারেক তখন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবিগুলো দেখেছিল।
“মানুষের মুখ আঁকেন না কেন?” জারেক জিজ্ঞেস করেছিল।
মাইলিন তুলির ডগা পরিষ্কার করতে করতে বলেছিল, “মুখ আঁকলেই মানুষকে চেনা যায় না। অনেক সময় মুখের আড়ালে মানুষ নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখে।”
“তাহলে মুখহীন মানুষ আঁকেন কেন?”
“কারণ, পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সবাইকে কখনো না কখনো ছুঁয়ে যায়। কেউ নিজের ইচ্ছায় পরিচয় লুকায়। কেউ বাধ্য হয়ে লুকায়। আবার কাউকে এমনভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া হয় যে ওর অস্তিত্বই অন্যদের চোখে অদৃশ্য হয়ে যায়।”
জারেক সেদিন আর কোনো প্রশ্ন করেনি।
আজ মাইলিনকে দেখে ওর মনে পড়ল সেই কথাগুলো। তরুণীটি একটি বড় ভবনের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে কয়েকটি কাগজ। কাগজগুলো বারবার গুছিয়ে নিচ্ছিল, কিন্তু ওর মন যেন অন্য কোথাও পড়ে ছিল।
জারেক উঠে রাস্তা পার হলো।
“আপনি এখানে?”
মাইলিন তাকাল। প্রথমে চিনতে পারেনি। পরে চিনে নিয়ে হালকা হাসল।
“আপনি সেই মানুষ, যিনি ছবি দেখে বেশি প্রশ্ন করেন না।”
“আজও বেশি প্রশ্ন করব না।”
“ভালো। আজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নেই।”
“কিছু ঘটেছে?”
মাইলিন একটু চুপ করে রইল।
“সব ঘটনা বলা যায় না। কিছু ঘটনা বললে অন্য মানুষের বিপদ বাড়ে।”
“আর না বললে?”
“নিজের ভেতরে জমে থাকে।”
জারেক ওর হাতে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকাল। সেগুলোতে নগরের কয়েকটি ভবনের ছবি ছিল। কয়েকটি ভবনের জানালায় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারও হাতে কাগজ, কারও হাতে ক্যামেরা, কারও মুখের সামনে কালো রেখা টানা।
“এগুলো নতুন ছবি?”
“হ্যাঁ।”
“কী বোঝাতে চেয়েছেন?”
“একই নগরে মানুষ বাস করে। কিন্তু সবাই একই স্বাধীনতা ভোগ করে না। কেউ নিজের মত প্রকাশ করলে সংবাদপত্রে জায়গা পায়। কেউ একই কথা বললে ওর কর্মস্থল হারায়। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে ওকে বিপজ্জনক বলা হয়। আর কেউ ক্ষমতাবান হলে নিজের অন্যায়কেও নিয়ম বলে চালিয়ে দেয়।”
জারেক ছবিগুলো আরও একবার দেখল।
“আপনি কি কাউকে লক্ষ্য করে ছবি আঁকছেন?”
“আমি ঘটনাগুলো লক্ষ্য করি। মানুষ নিজের মতো করে অর্থ খুঁজে নেয়।”
“সবাই কি সেই অর্থ বুঝতে পারবে?”
“সবাইকে বোঝানোর জন্য ছবি আঁকি না। অন্তত কেউ একজন বুঝলেও যথেষ্ট।”
কথাগুলো বলার সময় মাইলিনের চোখে ক্লান্তি ছিল। কিন্তু সেই ক্লান্তির নিচে এক ধরনের দৃঢ়তাও দেখা যাচ্ছিল।
জারেক বুঝতে পারল, মেয়েটি শুধু শিল্পী নয়। নগরের এমন কিছু ঘটনা ওর চোখে পড়েছে, যেগুলো সাধারণ মানুষ এড়িয়ে যায়। হয়তো সে এমন কিছু জানে, যা প্রকাশ করা সহজ নয়।
“সতর্ক থাকবেন,” জারেক বলল।
মাইলিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কেন?”
“সবাই ছবি পছন্দ করে না। বিশেষ করে যে ছবি তাদের নিজেদের দেখিয়ে দেয়।”
মাইলিন কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, “আপনিও কি নিজের মুখ এড়িয়ে চলেন?”
প্রশ্নটি শুনে জারেক থেমে গেল।
“কীভাবে?”
“আপনাকে দেখলে মনে হয়, আপনি অন্যদের বিচার করেন না। কিন্তু নিজেকে নিয়ে কোনো কথা বলেন না।”
“নিজেকে নিয়ে কথা বললে নিজের ভুলগুলোও সামনে আসে।”
“ভুলগুলো সামনে আসতে দেওয়া কি খারাপ?”
জারেক উত্তর দিল না।
ওরা কিছুক্ষণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের মানুষ দ্রুত চলছিল। বিজ্ঞাপনী পর্দায় নতুন রাজনৈতিক প্রচার শুরু হয়েছিল। বড় অক্ষরে লেখা ছিল—শৃঙ্খলাই উন্নয়নের ভিত্তি।
জারেক সেই কথাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
শৃঙ্খলা দরকার। কিন্তু শৃঙ্খলার নামে মানুষের কণ্ঠ বন্ধ করে দেওয়া হলে সেটি আর শৃঙ্খলা থাকে না। তখন সেটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের আরেকটি নাম।
সন্ধ্যার আলো নেমে এলে মাইলিন চলে গেল। জারেক আবার চায়ের দোকানে ফিরে এল।
ভাদ্র ভাই চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “মানুষকে দেখলে মনে হয়, সবাই কোথাও না কোথাও ছুটছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, সেটা কেউ জানে না।”
জারেক কাপ হাতে নিল।
“কেউ জানে। কিন্তু গন্তব্যের কথা বলতে চায় না।”
“আপনি জানেন?”
“আমি শুধু জানি, কিছু সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়।”
ভাদ্র ভাই আর প্রশ্ন করলেন না।
সেদিন রাতে জারেক বাড়ি ফিরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নগরের আলো দূর থেকে সুন্দর দেখাচ্ছিল। কিন্তু ওই আলো কত মানুষের অন্ধকার ঢেকে রেখেছে, তা জানার উপায় ছিল না।
জারেক নিজের নিয়মের কথা ভাবল।
অন্যের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে সে নিজেই কি কখনো অন্যের স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করেছে?
প্রশ্নটির উত্তর ওর জানা ছিল না। তবু প্রশ্নটি ওকে ছেড়ে গেল না।
অধ্যায় দুই.
শব্দের বিষাক্ত চাদর
পরদিন দুপুরে নগরের কেন্দ্রীয় চত্বরে একটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। চত্বরের চারপাশে ধাতব ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল। প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মীরা দাঁড়িয়ে ছিল। উঁচু মঞ্চের পেছনে বিশাল পর্দায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতীক ভেসে উঠছিল।
সমাবেশের প্রধান বক্তা ভ্রেমর।
নগরের মানুষ ওকে চিনত। ওর বক্তৃতা সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হতো। বড় ব্যবসায়ীরা ওর সঙ্গে ছবি তুলত। সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা ওর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। ওর বক্তব্যে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার কথা থাকত। কিন্তু সেই শব্দগুলোর আড়ালে কী পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল, তা নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস করত না।
জারেক সমাবেশের বাইরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছিল।
ভ্রেমর মাইক্রোফোনের সামনে এসে হাত তুলল। জনতার একাংশ হাততালি দিল। ক্যামেরাগুলো ওর দিকে ঘুরে গেল।
“আমাদের নগরকে নিরাপদ রাখতে হলে,” ভ্রেমর বলল, “প্রত্যেক নাগরিককে বুঝতে হবে যে ব্যক্তিগত মতামতের চেয়ে সামষ্টিক শৃঙ্খলা বড়। যে কথা সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়, তা প্রকাশের আগে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। যে সংবাদ মানুষের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তার উৎস পরীক্ষা করা দরকার। আর যে ব্যক্তি সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাকে বুঝতে হবে যে প্রশ্ন করারও একটি সীমা আছে।”
জনতার একাংশ হাততালি দিল।
ভ্রেমর থামল। তারপর আরও জোরে বলল, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে কেউ নিজের বক্তব্য দিয়ে নগরের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারবে না। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপত্তার প্রয়োজনে সংগ্রহ করা হলে তাতে আপত্তির কিছু নেই। যে মানুষ নির্দোষ, তার ভয় পাওয়ার কারণ নেই।”
জারেকের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
নির্দোষ মানুষের ভয় পাওয়ার কারণ নেই—ক্ষমতাবানরা প্রায়ই এই কথাটি বলে। কিন্তু নির্দোষ কে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা যদি একই কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে, যে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাহলে সেই আশ্বাসের মূল্য কতটুকু?
ভ্রেমর আবার বলল, “আমরা চাই না, কয়েকজন দায়িত্বহীন ব্যক্তি নিজেদের স্বাধীনতার নামে অন্যদের বিপদে ফেলুক। তাই প্রয়োজন হলে বক্তব্য প্রকাশের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে। প্রয়োজন হলে সন্দেহজনক সংবাদপ্রচার বন্ধ করা হবে। প্রয়োজন হলে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যারা জনমতকে ভুল পথে পরিচালিত করছে।”
একজন তরুণ সাংবাদিক জনতার ভিড়ের মধ্য থেকে প্রশ্ন করল, “কোন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে কোন বক্তব্য সন্দেহজনক? সরকারের সমালোচনা কি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে?”
কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকটির দিকে এগিয়ে গেল।
মঞ্চ থেকে ভ্রেমর হাসল।
“আপনার প্রশ্নের মধ্যে অযথা উত্তেজনা রয়েছে। আমরা কোনো নির্দোষ মানুষকে বিরক্ত করতে চাই না। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
“তাহলে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ থাকবে?” সাংবাদিকটি আবার প্রশ্ন করল। “অভিযোগের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে?”
এবার নিরাপত্তাকর্মীদের একজন সাংবাদিকের হাতে থাকা ফোনটি নামিয়ে দিতে বলল। সাংবাদিকটি আপত্তি জানাল। তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাকে ব্যারিকেডের পেছনে সরিয়ে নেওয়া হলো।
জারেক এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সে থামল। সাংবাদিকটির পাশে আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তারা ঘটনাটি রেকর্ড করছিল। নিরাপত্তাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত সাংবাদিককে ছেড়ে দিলেও তার ফোন পরীক্ষা করার দাবি জানাল।
জারেক বুঝল, ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিরোধ নয়। এটি একটি পদ্ধতি। প্রথমে প্রশ্নকে সন্দেহজনক বলা হয়। তারপর প্রশ্নকারীকে সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শেষে প্রশ্নের বদলে প্রশ্নকারীর চরিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
ভ্রেমর মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্য চালিয়ে যাচ্ছিল।
“আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কখনো বিশৃঙ্খলার নাম হতে পারে না। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে হবে।”
জারেক মনে মনে বলল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা দেওয়া যায়। কিন্তু সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ না করে দিলে নিরাপত্তার নামেই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সমাবেশ শেষ হওয়ার পর জনতা ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হতে লাগল। কেউ ভ্রেমরের বক্তব্যের প্রশংসা করছিল। কেউ আবার সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ফিসফিস করছিল।
জারেক চত্বরের এক পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
এক বৃদ্ধ লোক পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললেন, “এখন কথা বলার আগে দশবার ভাবতে হয়।”
আরেকজন উত্তর দিলেন, “চুপ থাকলেই তো নিরাপদ থাকা যায়।”
জারেক কথাগুলো শুনল। মানুষ যখন নিরাপত্তার জন্য নিজের কণ্ঠ ত্যাগ করতে শেখে, তখন ক্ষমতার অপব্যবহার সহজ হয়ে যায়।
সন্ধ্যায় জারেক আবার ভাদ্র ভাইয়ের দোকানে এল। টেলিভিশনে ভ্রেমরের বক্তৃতার নির্বাচিত অংশ দেখানো হচ্ছিল। সাংবাদিকের প্রশ্ন করার ঘটনাটি সেখানে ছিল না।
জারেক বলল, “ঘটনার অর্ধেক দেখিয়ে পুরো ঘটনার সিদ্ধান্ত তৈরি করা যায়।”
ভাদ্র ভাই চায়ের পাত্র নামিয়ে বললেন, “যে খবর দেখায়, সে যা দেখাতে চায়, মানুষ অনেক সময় সেটাই দেখে।”
“তাহলে সত্য কোথায় থাকে?”
“যে সত্য লুকানো হয়, তার খোঁজ করতে হয়। কিন্তু খোঁজ করতে গেলে ঝুঁকি থাকে।”
জারেক মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর মাইলিন দোকানে এল। ওর হাতে একটি ছোট নোটবুক ছিল।
“আপনি সমাবেশে ছিলেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ছিলাম।”
“সাংবাদিকটির ঘটনাটা দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
মাইলিন নোটবুক খুলল। সেখানে সময়, স্থান এবং কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীর পরিচিতির বিবরণ লেখা ছিল।
“আমি ঘটনাটা লিখে রেখেছি,” সে বলল। “শুধু নিজের জন্য নয়। পরে কেউ যদি বলে ঘটনাটি ঘটেনি, তখন অন্তত আমার কাছে বিবরণ থাকবে।”
জারেক ওর দিকে তাকাল।
“আপনি জানেন, এসব নথি রাখার কারণে আপনার বিপদ হতে পারে?”
“জানি।”
“তারপরও রাখছেন?”
“যে ঘটনা ঘটে, তার কোনো রেকর্ড না থাকলে ক্ষমতাবানরা পরে নিজেদের মতো করে ইতিহাস লিখতে পারে।”
জারেক নোটবুকটির দিকে তাকিয়ে রইল।
মাইলিনের কাজ শুধু ছবি আঁকা নয়। সে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে, সময় লিখে রাখছে, তথ্য সংরক্ষণ করছে। সে বুঝেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি অন্যায়ের প্রমাণও সংরক্ষণ করা দরকার।
“কেউ কি আপনাকে এই তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছে?” জারেক জিজ্ঞেস করল।
“না। কেউ বললে হয়তো করতাম না।”
“কেন?”
“কারণ, তখন কাজটা আমার নিজের সিদ্ধান্ত থাকত না।”
জারেক আর কিছু বলল না।
রাতে বাড়ি ফিরে সে ভ্রেমরের বক্তৃতার কথা ভাবল। একজন মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার কথা বলছে, অথচ একই সঙ্গে অন্যের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দাবি করছে। সে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করছে, কিন্তু অন্যদের বক্তব্য প্রকাশের অধিকার সীমিত করতে চাইছে।
জারেকের কাছে এটাই ছিল দ্বন্দ্বের মূল।
বাক্স্বাধীনতা মানে সব বক্তব্য সত্য বা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নয়। এর অর্থ হলো, কোনো বক্তব্য ভুল হলে তার জবাব দেওয়া যাবে, প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করা যাবে, প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কিন্তু শুধু ক্ষমতার বিরোধিতা করার কারণে মানুষের কণ্ঠ বন্ধ করে দেওয়া স্বাধীনতার পরিপন্থী।
জারেক জানত, ভ্রেমরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ হবে না। কারণ ভ্রেমর শুধু একজন বক্তা নয়। তার পেছনে অর্থ, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং অদৃশ্য কিছু শক্তি রয়েছে।
তবু জারেকের মনে একটি সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
কোনো মানুষকে নিজের মত প্রকাশের কারণে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা হলে, সে আর নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।
অধ্যায় তিন.
গলির ভেতরের হিসাব
সমাবেশের পরের দিন বিকেলে নগরের বাণিজ্যিক এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করে ভ্রেমর বেরিয়ে এল। ভবনটির প্রধান প্রবেশপথে সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল। তাই নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে পেছনের একটি সরু গলি দিয়ে বের করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
গলিটির দুই পাশে উঁচু দেয়াল। একদিকে পরিত্যক্ত গুদাম, অন্যদিকে একটি পুরোনো দপ্তরের পেছনের প্রবেশপথ। দিনের আলো থাকলেও সেখানে সূর্যের আলো খুব কম পৌঁছাত।
জারেক তখন গলির মুখের কাছেই ছিল।
সে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে আসা একটি বার্তা পড়ছিল। দূর থেকে কয়েকজনের পায়ের শব্দ শুনে মাথা তুলল। প্রথমে চারজন নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা গেল। তাদের পেছনে ভ্রেমর। আরও দুজন লোক গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
দলটি দ্রুত এগিয়ে আসছিল।
একজন নিরাপত্তারক্ষী জারেককে দেখে হাত তুলে বলল, “রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ান।”
জারেক পাশের দেয়ালের দিকে সরে গেল।
কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীটি ওর সামনে এসে দাঁড়াল।
“আপনার পরিচয় কী?”
“একজন পথচারী।”
“এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?”
“দাঁড়িয়ে থাকা কি অপরাধ?”
নিরাপত্তারক্ষীটি বিরক্ত হলো।
“অতিরিক্ত কথা বলবেন না। ফোনটি দিন।”
“কেন দেব?”
“নিরাপত্তার স্বার্থে।”
“আপনারা কি কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে ফোন পরীক্ষা করছেন, নাকি শুধু ক্ষমতা দেখাচ্ছেন?”
লোকটি জারেকের জামার কলার ধরে ফেলল।
“বেশি কথা বললে এখানেই শিখিয়ে দেব।”
জারেক প্রথমে তার হাত সরানোর চেষ্টা করল।
“আমাকে ছেড়ে দিন।”
নিরাপত্তারক্ষীটি আরও জোরে কলার চেপে ধরল। অন্য একজন এগিয়ে এসে জারেকের হাত পেছনে মুচড়ে ধরতে চাইল।
জারেক শরীর ঘুরিয়ে চাপ থেকে বেরিয়ে এল। প্রথম নিরাপত্তারক্ষী আবার হাত তুলতেই জারেক তার কনুইয়ের জয়েন্টে নিয়ন্ত্রিত আঘাত করল। লোকটি যন্ত্রণায় হাত সরিয়ে পিছিয়ে গেল।
দ্বিতীয়জন জারেককে ধাক্কা দিল। জারেক পাশ কাটিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া এড়াল। তারপর দুজনের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল।
ভ্রেমর থেমে গেল।
“কী হচ্ছে এখানে?”
একজন নিরাপত্তারক্ষী বলল, “লোকটি বাধা দিচ্ছে।”
জারেক ভ্রেমরের দিকে তাকাল।
“আপনার লোকেরা কোনো কারণ ছাড়াই আমার ফোন নিতে চাইছিল। আমি আপত্তি করেছি। এরপর একজন আমাকে ধরে ফেলেছে।”
ভ্রেমর ঠান্ডা চোখে ওকে দেখল।
“আপনি কি জানেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন?”
“আপনি কে, সেটা জানি। কিন্তু আপনার পরিচয় কাউকে বিনা কারণে আটক করার অধিকার দেয় না।”
ভ্রেমরের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আপনি নিরাপত্তাব্যবস্থার কাজে বাধা দিয়েছেন।”
“নিরাপত্তা আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা একে অপরের শত্রু নয়। আপনারা যদি কোনো অপরাধের প্রমাণ দেখাতে পারেন, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।”
ভ্রেমর এক পা এগিয়ে এল।
“আপনার মতো লোকেরা নিজেদের স্বাধীনতার নামে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। আপনাদের জন্যই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়।”
জারেক শান্ত থাকার চেষ্টা করল।
“আমি নিজের স্বাধীনতার কথা বলছি না। আমি জানতে চাইছি, আপনার লোকেরা কোন অধিকারে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তি কেড়ে নিতে চাইছে।”
ভ্রেমর হাত তুলে নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ দিল।
“ওকে সরিয়ে দাও।”
দুজন লোক একসঙ্গে জারেকের দিকে এগিয়ে এল। একজন তার কাঁধ ধরে টানল। অন্যজন পেছন থেকে হাত চেপে ধরল। জারেক নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। ধস্তাধস্তির মধ্যে একজনের হাত তার গলায় উঠে এল।
পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেল।
জারেকের সামনে তখন দুটি পথ ছিল। নীরবে আঘাত সহ্য করে সরে যাওয়া, অথবা নিজেকে রক্ষা করতে শক্তি প্রয়োগ করা। সে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিল।
একজনের কবজি সরিয়ে অন্যজনের ভারসাম্য নষ্ট করল। প্রথম লোকটি মাটিতে পড়ে গেল। দ্বিতীয়জন সামনে থেকে আঘাত করতে এলে জারেক তার আঘাত এড়িয়ে মুখে একটি ঘুষি মারল।
ঘুষিতে ভ্রেমরের চোয়ালে আঘাত লাগল। সে পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের পাশে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে হাত উঠে এল। দাঁত চেপে কথা বলার চেষ্টা করলেও ব্যথায় স্পষ্ট শব্দ বের হলো না।
নিরাপত্তারক্ষীরা কয়েক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল।
জারেক দাঁড়িয়ে রইল। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল। সে বুঝতে পারছিল, নিজের নিয়মের সীমা অতিক্রম করেছে। পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার অন্য উপায় থাকতে পারত। কিন্তু মুহূর্তের উত্তেজনা এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
একজন নিরাপত্তারক্ষী পকেট থেকে অস্ত্র বের করতে গিয়ে থেমে গেল। আশপাশের ভবনের জানালায় কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছিল।
ভ্রেমর দাঁত চেপে বলল, “তোমাকে এর মূল্য দিতে হবে।”
জারেক তার দিকে তাকাল।
“আপনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন। ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু আপনার লোকেরা যা করেছে, সেটারও জবাব দিতে হবে।”
“তুমি জানো না, আমি কী করতে পারি।”
“আপনি কী করতে পারেন, সেটা নয়। আপনি কী করার অধিকার রাখেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
ভ্রেমর আর উত্তর দিল না।
জারেক ধীরে ধীরে গলির মুখের দিকে এগিয়ে গেল। কেউ তাকে থামানোর সাহস করল না। তবে সে জানত, এখানেই ঘটনা শেষ হবে না।
পরদিন সকালেই ভিডিওটি নগরের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ শিরোনাম দিল—রাজনৈতিক নেতার ওপর হামলা। কেউ লিখল—নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে অজ্ঞাত ব্যক্তির সংঘর্ষ। অন্য একটি সংবাদমাধ্যম ভিডিওর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করল, যেখানে জারেকের ওপর প্রথমে হাত তোলা এবং ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু পুরো ঘটনাটি নিয়ে বিতর্ক থামল না।
ভ্রেমরের সমর্থকেরা বলল, জারেক বিপজ্জনক অপরাধী। অন্যরা বলল, নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণের তদন্ত হওয়া উচিত। কেউ কেউ আবার জারেকের সহিংসতার সমালোচনা করল।
জারেক কোনো বক্তব্য প্রকাশ করল না।
ভাদ্র ভাই দোকানে বসে সংবাদ দেখছিলেন। জারেক এলে তিনি টেলিভিশন বন্ধ করে দিলেন।
“আপনি যা করেছেন, তা নিয়ে সবাই কথা বলছে,” তিনি বললেন।
“জানি।”
“আপনি কি মনে করেন, সব ঠিক করেছেন?”
জারেক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“না।”
ভাদ্র ভাই অবাক হলেন।
“তাহলে?”
“আমি নিজের সুরক্ষার জন্য প্রতিরোধ করেছি। কিন্তু ভ্রেমরের মুখে আঘাত করার মুহূর্তে শুধু আত্মরক্ষাই কাজ করেনি। আমার রাগও কাজ করেছে। সেটা অস্বীকার করব না।”
“এ কথা প্রকাশ্যে বলবেন?”
“প্রয়োজন হলে বলব। কিন্তু আমার ভুল থাকলে তার মানে এই নয় যে অন্যদের অন্যায় মুছে যাবে।”
ভাদ্র ভাই মাথা নাড়লেন।
“দুই পক্ষের ভুল আলাদা করে দেখতে হয়। এক পক্ষের অন্যায় দিয়ে অন্য পক্ষের অন্যায়কে বৈধ করা যায় না।”
জারেক চায়ের কাপ হাতে নিল।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে পারে। ভ্রেমর রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তাকে বিপদে ফেলতে পারে। তবু জারেকের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ঘটনার সত্যতা যেন হারিয়ে না যায়।
সে জানত না, এই সংঘর্ষ তাকে এমন একটি অপরাধচক্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যার বিস্তার নগরের পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়েও গভীর।
অধ্যায় চার.
ছায়াবৃত্তের সতর্কবার্তা
পরদিন সকালে জারেক পুরোনো গ্রন্থাগারে গেল।
নগরের নতুন অংশে কাচের দেয়ালঘেরা আধুনিক পাঠাগার তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রবেশের জন্য সদস্যপদ লাগে। কিন্তু পুরোনো গ্রন্থাগারটি ছিল অন্য রকম। ভবনের বাইরের দেয়ালে ফাটল। কাঠের দরজায় বিবর্ণ রং। ভেতরে পুরোনো সংবাদপত্র, নথি, বই এবং সরকারি প্রকাশনার সংগ্রহ। অনেক দিন সংস্কার হয়নি। তবু কিছু মানুষ নিয়মিত সেখানে আসত।
জারেকের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় এই গ্রন্থাগারে কেটেছিল। তরুণ বয়সে এখানে এসেই সে প্রথম বুঝেছিল, ক্ষমতার ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের লেখা নথিতে থাকে না। অনেক সময় পুরোনো সংবাদপত্রের ছোট একটি প্রতিবেদন, কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের সংযুক্তি কিংবা অবহেলিত একটি চিঠি পুরো ঘটনার অর্থ বদলে দিতে পারে।
গ্রন্থাগারের পেছনের কক্ষে বসতেন সিলভা।
তিনি জারেকের সাবেক শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। একসময় সরকারি নথি বিশ্লেষণের কাজ করতেন। পরে গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব হওয়া, তদন্তে বাধা এবং কিছু সরকারি সিদ্ধান্তের অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। প্রকাশ্যে বড় কোনো অভিযোগ না করলেও তিনি নথি পড়া, তথ্য যাচাই করা এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা বোঝার কাজে দক্ষ ছিলেন।
জারেককে দেখে সিলভা চশমা খুললেন।
“তুমি আবার সমস্যার মধ্যে পড়েছ।”
জারেক চেয়ারে বসল।
“ভিডিও দেখেছেন?”
“দেখেছি। কয়েকটি সংস্করণও দেখেছি। কিছু ভিডিওতে ঘটনার শুরু নেই। কিছুতে মাঝের অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার একটি পূর্ণ ভিডিওতে তোমার ওপর প্রথমে হাত তোলার ঘটনা স্পষ্ট।”
“তাহলে সত্যটা অন্তত রেকর্ডে আছে।”
“ভিডিও থাকলেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। ভিডিওর উৎস, সময়, সম্পাদনা হয়েছে কি না, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণও যাচাই করতে হয়।”
জারেক মাথা নাড়ল।
সিলভা টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি ফাইল বের করলেন। ফাইলের ভেতরে সংবাদপত্রের কাটিং, সরকারি চিঠির অনুলিপি এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল।
“ভ্রেমরকে তুমি যতটা বড় ভাবছ, তার চেয়েও বড় সমস্যা রয়েছে,” সিলভা বললেন।
“ওরমাস?”
সিলভা একটু থামলেন।
“তুমি নামটি আগে শুনেছ?”
“কয়েকটি ব্যবসায়িক নথিতে দেখেছি। কিন্তু ওর সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি।”
“সেটাই স্বাভাবিক। ওরমাস নিজের নাম খুব কম সামনে আনে। ওর কাজ চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে। কোনো চুক্তির সুবিধাভোগী আবার তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অর্থের প্রবাহ এমনভাবে ভাগ করা হয় যে, একটি নথি দেখে পুরো সম্পর্ক বোঝা যায় না।”
“ভ্রেমর ওর হয়ে কাজ করে?”
“এত সহজ করে বললে ভুল হবে। ভ্রেমর রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে। ওরমাস অর্থ, যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের স্বার্থ যেখানে মিলে যায়, সেখানে তারা একসঙ্গে কাজ করে। কিন্তু প্রত্যেকের নিজস্ব উদ্দেশ্যও রয়েছে।”
জারেক ফাইলের পাতাগুলো দেখল।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার এসেছে। কিছু চুক্তিতে একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ভবন সংস্কারের প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল অস্বাভাবিক বেশি। আরেকটি নথিতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনার হিসাব ছিল, কিন্তু সরবরাহের প্রমাণ অসম্পূর্ণ।
“এগুলো কি অপরাধের প্রমাণ?” জারেক জিজ্ঞেস করল।
“না। এগুলো প্রশ্ন তোলার মতো অসংগতি। কোনো হিসাব অস্বাভাবিক হলেই অপরাধ প্রমাণিত হয় না। চুক্তি, অর্থপ্রদানের নথি, সরবরাহের প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা মিলিয়ে দেখতে হবে।”
জারেক ফাইল বন্ধ করল।
“আপনি এত দিন এসব নিয়ে কাজ করছেন?”
“অনেক দিন। কিন্তু সব তথ্য একসঙ্গে পাইনি। কিছু নথি হারিয়ে গেছে। কিছু সাক্ষী কথা বলতে রাজি হয়নি। আবার কিছু অভিযোগ যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে এগোয়নি।”
“এখন কেন আমাকে বলছেন?”
সিলভা সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকালেন।
“কারণ, তুমি এখন ওদের নজরে পড়েছ। তুমি যদি শুধু রাগের বশে এগিয়ে যাও, ওরা তোমাকে একজন সহিংস মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। তারপর তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সামনে এনে নিজেদের কাজ আড়াল করবে।”
জারেক চুপ করে রইল।
“তুমি যদি সত্যিই অন্যায় থামাতে চাও,” সিলভা বললেন, “তাহলে শুধু শক্তি দিয়ে হবে না। তথ্য, নথি, সাক্ষ্য এবং সঠিক প্রক্রিয়া দরকার। তোমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তুমি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করলে, তোমার সঙ্গে ওদের পার্থক্য কোথায় থাকবে?”
প্রশ্নটি জারেককে অস্বস্তিতে ফেলল।
“আমি ওদের মতো হতে চাই না।”
“তাহলে নিজের নিয়মকেও প্রশ্ন করতে শেখো।”
কক্ষের বাইরে কয়েকজন পাঠক বই ফেরত দিচ্ছিল। দূরে পুরোনো ঘড়ির কাঁটা চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
সিলভা আরও বললেন, “মাইলিনের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে?”
“হ্যাঁ।”
“ওর কাজের দিকে নজর রাখা হচ্ছে বলে শুনেছি।”
জারেকের মুখ বদলে গেল।
“কে নজর রাখছে?”
“নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না। তবে ওর কয়েকটি ছবি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একটি প্রদর্শনীর আয়োজকের কাছে ফোন করা হয়েছে। ওর আঁকা ছবিগুলোকে রাজনৈতিক উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করার কথাও উঠেছে।”
“ও কি কিছু জানে?”
“ও অনেক কিছু দেখে। কিন্তু সবকিছুর পূর্ণ ব্যাখ্যা হয়তো ওর কাছে নেই। ওর নোট, ছবি এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে কোনো তথ্য প্রকাশ করার আগে ওকে নিজের নিরাপত্তা এবং প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।”
জারেক উঠে দাঁড়াল।
“আমি ওর সঙ্গে কথা বলব।”
“কথা বলবে। কিন্তু ওর হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না। কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে ওর স্বাধীনতা কেড়ে নিও না।”
জারেক দরজার কাছে গিয়ে থামল।
সিলভার কথাটি ওর মনে গেঁথে গেল।
অন্যের স্বাধীনতা রক্ষা করা আর অন্যের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। মাইলিন বিপদের মধ্যে থাকলেও তার নিজের মতামত, সিদ্ধান্ত এবং কাজের অধিকার রয়েছে।
গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে জারেক সড়কের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিকে তাকাল। একটি কালো গাড়ি কিছুক্ষণ ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। জারেক তাকাতেই গাড়িটি ধীরে ধীরে চলে গেল।
সে নিশ্চিত হতে পারল না, গাড়িটি তাকে অনুসরণ করছিল কি না।
তবু সে সতর্ক হলো।
সেদিন সন্ধ্যায় মাইলিনকে ফোন করার আগে জারেক সিলভার দেওয়া ফাইলের কয়েকটি নথির ছবি তুলল না। বরং নথির তালিকা লিখে রাখল এবং কোন নথির সত্যতা কোথা থেকে যাচাই করা যেতে পারে, তার একটি পরিকল্পনা তৈরি করল।
সে বুঝতে পারছিল, এই সংঘাত এখন আর শুধু ভ্রেমরের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ নয়। এর পেছনে এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মানুষের বক্তব্য, তথ্য এবং প্রমাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
অধ্যায় পাঁচ.
ক্যানভাসে বাঁধা ডানা
মাইলিনের কর্মশালাটি ছিল একটি পুরোনো বাণিজ্যিক ভবনের তৃতীয় তলায়। ভবনের নিচতলায় ছোট দোকান। দ্বিতীয় তলায় একটি হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় তলায় কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে শিল্পী, আলোকচিত্রী ও নকশাকারীরা কাজ করত।
মাইলিনের কক্ষটি খুব বড় ছিল না। দেয়ালে অসমাপ্ত ছবি ঝুলছিল। মেঝের এক পাশে রঙের বাক্স, অন্য পাশে কাগজের গাদা। জানালার কাছে একটি পুরোনো টেবিল। টেবিলের ওপর নোটবুক, কয়েকটি স্মৃতিচিহ্ন এবং নগরের বিভিন্ন এলাকার ছবি রাখা ছিল।
জারেক পৌঁছানোর সময় মাইলিন একটি বড় ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
ছবিতে একটি বিশাল পাখি। পাখিটির ডানা দুদিকে বিস্তৃত। কিন্তু ডানার সঙ্গে মাটির কয়েকটি শক্ত দড়ি বাঁধা। দড়িগুলো ধরে আছে ছায়ার মতো কয়েকটি মানুষ। তাদের মুখ নেই। পাখিটির চোখ খোলা, কিন্তু সে উড়তে পারছে না।
জারেক অনেকক্ষণ ছবিটি দেখল।
“এটা কি নতুন কাজ?”
“হ্যাঁ।”
“পাখিটা উড়তে চায়?”
“ওর ডানা আছে। আকাশও আছে। কিন্তু ডানার সঙ্গে দড়ি বাঁধা।”
“দড়িগুলো কারা ধরে রেখেছে?”
মাইলিন ছায়ামূর্তিগুলোর দিকে তাকাল।
“কেউ সামনে থাকে। কেউ আড়ালে। কেউ নির্দেশ দেয়। কেউ নির্দেশ পালন করে। আবার কেউ জানেও না, ওর হাতে থাকা দড়ি দিয়ে অন্য কাউকে আটকে রাখা হচ্ছে।”
“তাহলে পাখিটা কী করবে?”
“প্রথমে বুঝতে হবে, দড়িগুলো কোথায় বাঁধা। তারপর বুঝতে হবে, কোন দড়ি কেটে ফেললে ডানা মুক্ত হবে, আর কোন দড়ি না বুঝে কাটলে পাখিটাই আহত হবে।”
জারেক ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
“আপনি কি ওরমাসকে নিয়ে কাজ করছেন?”
মাইলিন তুলি নামিয়ে রাখল।
“আপনি নামটা জানলেন কীভাবে?”
“কিছু নথিতে নামটি দেখেছি।”
“তাহলে আপনিও বুঝতে শুরু করেছেন, বিষয়টা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে নয়।”
মাইলিন একটি ফাইল খুলল। সেখানে কয়েকটি প্রদর্শনীর অনুমতিপত্র, ভবন সংস্কারের বিজ্ঞপ্তি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি এবং তারিখ লেখা ছিল।
“আমি প্রথমে শুধু নগরের পরিবর্তনগুলো আঁকছিলাম,” সে বলল। “কোনো ভবন হঠাৎ ভেঙে ফেলা হচ্ছে, কোনো দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোনো এলাকায় মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হচ্ছে। পরে বুঝলাম, কিছু ঘটনা একই সময়ে ঘটছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও বারবার আসছে।”
“তুমি কি নথিগুলো যাচাই করেছ?”
“যেগুলো প্রকাশ্য উৎস থেকে পাওয়া যায়, সেগুলো মিলিয়ে দেখেছি। কিন্তু সব তথ্যের ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। তাই আমি কোনো ছবির সঙ্গে কাউকে সরাসরি অপরাধী বলে ঘোষণা করছি না।”
জারেকের মনে হলো, মাইলিন নিজের কাজের সীমা সম্পর্কে সচেতন। সে সন্দেহকে সত্য বলে চালিয়ে দিতে চাইছে না।
“তাহলে এই ছবিগুলো প্রদর্শনীতে রাখবে?”
“রাখব। তবে যেসব তথ্য যাচাই করা হয়নি, সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখাব না।”
জারেক মাথা নাড়ল।
“সতর্ক থাকো।”
মাইলিন মৃদু হেসে বলল, “আপনি সব সময় এই কথাই বলেন।”
“কারণ, বিপদটা বাস্তব।”
“আমি জানি। কিন্তু বিপদের আশঙ্কায় যদি সব কাজ বন্ধ করে দিই, তাহলে ওরা কিছু না করেই জিতে যাবে।”
জারেক উত্তর দেওয়ার আগেই নিচের সিঁড়িতে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।
মাইলিন দরজার দিকে তাকাল।
চারজন লোক দ্রুত ওপরে উঠছিল। তাদের পোশাক সাধারণ হলেও চলাফেরায় প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীর মতো কঠোরতা ছিল। সামনে থাকা লোকটির নাম রুগার। সে ওরমাসের ঘনিষ্ঠ সহকারী এবং মাঠপর্যায়ে নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্বে ছিল।
রুগার দরজা ঠেলে কক্ষে ঢুকল।
“মাইলিন কে?”
মাইলিন সামনে এগিয়ে এল।
“আমি।”
রুগার চারপাশে তাকাল। ছবিগুলো দেখে তার মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
“এইসব ছবি দিয়ে কী বোঝাতে চাইছেন?”
“আমি শিল্পকর্ম তৈরি করি। ছবির ব্যাখ্যা দর্শক নিজের মতো করে করতে পারেন।”
“অতিরিক্ত বুদ্ধি দেখাবেন না। আপনার ছবি নিয়ে অনেক অভিযোগ এসেছে।”
“কোন ছবির বিরুদ্ধে অভিযোগ? কে অভিযোগ করেছে? অভিযোগের অনুলিপি দেখাতে পারবেন?”
রুগার হেসে উঠল।
“আপনি কি মনে করেন, কাগজ দেখালেই সব বুঝতে পারবেন?”
“কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা লিখিতভাবে জানাতে পারেন। আমি জবাব দেব।”
রুগার এক পা এগিয়ে এল।
“আপনার এই হাতগুলোই সমস্যা তৈরি করছে। এই হাত দিয়ে ছবি আঁকেন, নথি লেখেন, মানুষের মাথায় প্রশ্ন ঢোকান। নির্দেশ এসেছে, আপনার হাত যেন আর আগের মতো কাজ করতে না পারে।”
মাইলিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তবু সে পিছিয়ে গেল না।
জারেক সামনে এসে দাঁড়াল।
“কোনো অভিযোগের তদন্ত না করে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার আপনাদের নেই।”
রুগার জারেকের দিকে তাকাল।
“তুমি সেই লোক, যে ভ্রেমরের চোয়াল ভেঙেছে।”
“ঘটনার পূর্ণ বিবরণ রেকর্ডে আছে।”
“রেকর্ড দিয়ে সবকিছু রক্ষা করা যায় না।”
“রেকর্ড না থাকলে আপনারা যা খুশি বলতে পারেন। তাই রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ।”
রুগার হাতের ইশারায় তার সঙ্গে আসা লোকদের সামনে এগোতে বলল।
“ওকে সরিয়ে দাও। মেয়েটিকে নিয়ে যাও।”
দুজন লোক জারেকের দিকে এগিয়ে এল। তৃতীয়জন মাইলিনের হাত ধরতে গেল। মাইলিন হাত সরিয়ে নিয়ে পেছনে সরে দাঁড়াল।
“আমাকে স্পর্শ করবেন না!”
লোকটি আবার এগিয়ে এলে জারেক মাঝখানে দাঁড়াল।
“থামুন।”
“সরে দাঁড়া,” রুগার বলল।
জারেক সরে দাঁড়াল না।
প্রথম লোকটি জারেকের দিকে ঘুষি ছুড়ল। জারেক আঘাত এড়িয়ে তার হাঁটুতে আঘাত করল। লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। দ্বিতীয়জন পাশ থেকে জারেককে ধরতে গেলে সে তার হাত সরিয়ে কনুইয়ে আঘাত করল। লোকটি ব্যথায় পিছিয়ে গেল।
তৃতীয়জন লোহার দণ্ড তুলে মাইলিনের দিকে এগিয়ে এল।
জারেক সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। সে লোকটির আঘাতের পথ থেকে মাইলিনকে সরিয়ে দিল। তারপর তার হাঁটুতে আঘাত করে লোহার দণ্ডটি মেঝেতে ফেলে দিল।
চতুর্থজন পেছন থেকে জারেকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো। জারেক লোকটির হাত চেপে ধরে শরীর ঘুরিয়ে তাকে দেয়ালের দিকে ঠেলে দিল। লোকটি মেঝেতে পড়ে গেল।
রুগার এবার নিজেই এগিয়ে এল।
“তুমি নিজেকে কী মনে করো?”
জারেক বলল, “এই মুহূর্তে এমন একজন মানুষ, যে আপনাদের অন্যায়ভাবে একজন শিল্পীকে আঘাত করতে দেবে না।”
রুগার জারেককে ঘুষি মারতে গেল। জারেক আঘাত ঠেকিয়ে তার কনুইয়ে আঘাত করল। রুগার পিছিয়ে গেলেও আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। দ্বিতীয়বারের ধস্তাধস্তিতে জারেক তার অন্য হাতও আঘাত করে অকার্যকর করে দিল। রুগার যন্ত্রণায় চিৎকার করে মেঝেতে বসে পড়ল।
ঘটনাটি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়নি।
কিন্তু কক্ষের ভেতরে তখন সবকিছু এলোমেলো। একটি চেয়ার ভেঙে গেছে। রঙের বাক্স মেঝেতে পড়ে আছে। ক্যানভাসের এক কোণে দাগ লেগেছে। মাইলিন দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল।
জারেক শ্বাস নিতে নিতে চারদিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল, নিজের প্রতিরক্ষার মধ্যে থেকেও তার আঘাতগুলো গুরুতর হয়ে গেছে। লোকগুলোকে থামানোর পর আর আঘাত চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল না। রুগার পড়ে যাওয়ার পর সংঘর্ষ থামানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে জারেকের রাগ তার সিদ্ধান্তকে কঠোর করে তুলেছিল।
সে আর এগোল না।
“মাইলিন, আপনি ঠিক আছেন?”
মাইলিন উত্তর দিতে কিছুটা সময় নিল।
“আমি ঠিক আছি। কিন্তু আপনি ওদের এমনভাবে আঘাত করলেন কেন?”
প্রশ্নটি জারেককে থামিয়ে দিল।
“ওরা আপনাকে আঘাত করতে এসেছিল।”
“আমি সেটা জানি। আপনি আমাকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু রুগার যখন মেঝেতে পড়ে গেল, তখন কি আর আঘাত করার দরকার ছিল?”
জারেকের কাছে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর ছিল না।
“আমি জানি না,” সে শেষ পর্যন্ত বলল। “সেই মুহূর্তে আমার রাগ কাজ করেছে।”
মাইলিন ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি চাই না, কেউ আমাকে রক্ষা করার নামে নিজের সীমা ভুলে যাক।”
জারেক মাথা নিচু করল।
“আপনার কথা ঠিক।”
বাইরে থেকে মানুষের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল। পাশের কক্ষের একজন কর্মী ইতিমধ্যে জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করেছিল। জারেক মাইলিনকে বলল, “ঘটনাটা গোপন করবেন না। যা ঘটেছে, সব লিখে রাখুন। আঘাতের চিকিৎসা, ছবির ক্ষতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ—সব সংরক্ষণ করুন।”
মাইলিন বলল, “আপনার আঘাতের বিষয়টিও লিখব।”
“লিখবেন। আমি যা করেছি, সেটাও ঘটনার অংশ।”
সেদিনই ঘটনাটির খবর ছড়িয়ে পড়ল। ওরমাসের লোকেরা প্রচার করতে লাগল যে জারেক একটি কর্মশালায় হামলা করেছে। কিন্তু ভবনের নিরাপত্তা ক্যামেরায় লোকগুলোর প্রবেশ, হুমকি এবং সংঘর্ষের কিছু অংশ রেকর্ড হয়েছিল। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীও বিবৃতি দিতে রাজি হলো।
মাইলিন নিজের নোটবুকে ঘটনার সময় লিখে রাখল। ক্ষতিগ্রস্ত ছবির ছবি তুলল। চিকিৎসার কাগজ সংরক্ষণ করল। ক্যামেরার রেকর্ডের অনুলিপি নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করল।
জারেক বুঝল, সত্য প্রকাশের জন্য শুধু ঘটনাটি ঘটানো যথেষ্ট নয়। ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং সেগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
ক্যানভাসে বাঁধা পাখিটির দিকে তাকিয়ে মাইলিন ধীরে বলল, “দড়িগুলো আরও শক্ত হচ্ছে।”
জারেক উত্তর দিল, “তাহলে দড়িগুলো কোথায় বাঁধা, সেটা খুঁজে বের করতে হবে।”
অধ্যায় ছয়.
ক্ষমতার মুখোমুখি আঘাত
কর্মশালার ঘটনার পর নগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। ভ্রেমরের সমর্থকেরা জারেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলল। অন্যদিকে, মাইলিনের কর্মশালায় হামলার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকে প্রশ্ন তুলল, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত লোকেরা কীভাবে অভিযোগের নামে কাউকে শাস্তি দিতে পারে।
ওরমাস সরাসরি কোনো বক্তব্য দিল না। তার পরিবর্তে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে জারেককে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। কিছু প্রতিবেদনে কর্মশালায় প্রবেশ করা লোকদের পরিচয় গোপন রাখা হলো। আবার কিছু প্রতিবেদনে সংঘর্ষের আগে ঘটে যাওয়া হুমকির কথা বাদ দেওয়া হলো।
জারেক বুঝতে পারল, ওদের উদ্দেশ্য শুধু তাকে আটকানো নয়। ওর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করাও তাদের পরিকল্পনার অংশ।
সিলভা আবার তাকে গ্রন্থাগারে ডেকে পাঠালেন।
“তোমার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ প্রস্তুত করা হচ্ছে,” তিনি বললেন।
“কোন অভিযোগ?”
“অবৈধভাবে আঘাত করা, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা এবং একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কার্যক্রমে বাধা দেওয়া। প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার। কিছু অভিযোগে বাস্তব ঘটনার অংশ আছে, কিছুতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়েছে।”
জারেক চুপ করে রইল।
“তুমি যদি নিজের কাজের পক্ষে দাঁড়াতে চাও, তাহলে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিতে হবে। তোমার আঘাতের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। একই সঙ্গে যেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছ, সেটাও অস্বীকার করা যাবে না।”
“আমি অস্বীকার করব না।”
“তাহলে এবার আর গোপনে চলবে না। একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করো। অভিযোগের কপি সংগ্রহ করো। ভিডিওর মূল ফাইল সংরক্ষণ করো। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি স্বেচ্ছায় নেওয়া হোক। কাউকে চাপ দিয়ে বক্তব্য আদায় করার চেষ্টা করবে না।”
জারেক বলল, “আপনি কি মনে করেন, ন্যায্য তদন্ত হবে?”
“আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি না। কিন্তু ন্যায্য তদন্তের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।”
সিলভা তাকে আরও একটি তথ্য দিলেন। ওরমাসের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ লেনদেনের অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। কিছু সরকারি প্রকল্পে অনুমোদিত ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের পরিমাণের মিল নেই। নিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনার একটি চুক্তিতে একই সরবরাহকারীর নাম একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসেছে। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের সঙ্গে ভ্রেমরের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের সম্পর্ক রয়েছে।
“এসব কি ওরমাসের অপরাধ প্রমাণ করে?” জারেক জিজ্ঞেস করল।
“এখনো না। কিন্তু স্বাধীন তদন্তের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। নথিগুলো বৈধভাবে সংগ্রহ করতে হবে। মূল কপি কোথায় আছে, কারা অনুমোদন দিয়েছে, অর্থ কোথায় গেছে—সব যাচাই করতে হবে।”
জারেক বুঝল, সে যদি শুধু ওরমাসকে আঘাত করে, তাহলে অপরাধচক্রের কাঠামো অক্ষত থেকে যেতে পারে। একজন মানুষকে সরিয়ে দিলেই ক্ষমতার নেটওয়ার্ক ভেঙে যায় না।
তবু ওরমাসের লোকেরা থামছিল না।
এক রাতে মাইলিন কর্মশালা থেকে বেরিয়ে নিচের সিঁড়িতে পৌঁছাতেই দুজন লোক তার পথ আটকাল। তারা সরাসরি আক্রমণ করেনি। একজন বলল, “আপনার ছবি সরিয়ে নিন। তাহলেই সমস্যা শেষ।”
মাইলিন বলল, “কোন ছবির কথা বলছেন?”
“আপনি জানেন।”
“আপনাদের কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানান।”
লোকটি হেসে বলল, “আপনি এখনো বুঝতে পারছেন না, বিষয়টা কাগজের নয়।”
মাইলিন পেছনে সরে ভবনের ভেতরে ফিরে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে জারেককে ফোন করল।
জারেক পৌঁছানোর আগেই লোক দুটি চলে গিয়েছিল। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী তাদের একজনকে চিনতে পেরেছিল। সে বলল, লোকটি কয়েকবার আগে রুগারের সঙ্গে এসেছিল।
জারেকের মনে রাগ জমে উঠল। সে জানত, ওরমাসের লোকেরা মাইলিনকে ভয় দেখিয়ে তার কাজ বন্ধ করতে চাইছে।
পরদিন সে মাইলিনকে সঙ্গে নিয়ে একজন আইনজীবীর কাছে গেল। আইনজীবী ঘটনাগুলো শুনে জানালেন, হুমকির বিবরণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা দরকার। ভবনের ক্যামেরার রেকর্ড দ্রুত সংগ্রহ করতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর সম্মতি নিয়ে বক্তব্য লিখতে হবে। কোনো আক্রমণ বা হুমকি ঘটলে সময় নষ্ট না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
মাইলিন সব তথ্য নথিভুক্ত করল।
এরপরও ওরমাসের লোকেরা একবার শেষ চেষ্টা করল।
এক বিকেলে জারেক যখন কর্মশালার বাইরে অপেক্ষা করছিল, তখন একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে তিনজন লোক নামল। তাদের একজনের হাতে ধাতব দণ্ড ছিল।
“তোমাকে অনেকবার সতর্ক করা হয়েছে,” লোকটি বলল।
জারেক উত্তর দিল, “আপনারা আবারও ভুল জায়গায় এসেছেন।”
লোকটি মাইলিনের দিকে তাকাল।
“শেষবার বলছি। ছবি বন্ধ করুন।”
মাইলিন সামনে এগিয়ে এল।
“আমি নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করি। আপনাদের নির্দেশে নয়।”
লোকটি ধাতব দণ্ড তুলে তার দিকে এগিয়ে গেল।
জারেক মাঝখানে দাঁড়াল।
“ওর কাছে যাবেন না।”
লোকটি আঘাত করল। জারেক আঘাত এড়িয়ে তার হাঁটুতে আঘাত করল। লোকটি মাটিতে বসে পড়ল। দ্বিতীয়জন জারেকের কাঁধ ধরে টানল। জারেক নিজেকে ছাড়িয়ে তার কনুইয়ে আঘাত করল। তৃতীয়জন পিছন থেকে এগিয়ে এলে জারেক তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল।
সংঘর্ষের মধ্যে একজন মাইলিনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করল। জারেক দ্রুত তার পথ আটকাল। লোকটি আবার আঘাত করতে গেলে জারেক তার হাত সরিয়ে কনুইয়ে আঘাত করল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিনজনই আর আক্রমণ চালাতে পারছিল না।
জারেক দাঁড়িয়ে রইল। এবার সে আর কাউকে আঘাত করল না। আহতদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানেই থামুন। আর কোনো আক্রমণ করবেন না।”
দূর থেকে লোকজন এগিয়ে আসছিল। কেউ জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী নিজের ফোনে সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করেছিল।
মাইলিন জারেকের পাশে এসে দাঁড়াল।
“আপনি থেমেছেন,” সে বলল।
জারেক তার দিকে তাকাল।
“থামার সময় বুঝতে হয়।”
“আগে বুঝতেন?”
জারেক উত্তর দিতে পারল না।
মাইলিন বলল, “আপনি অন্যায় থামাতে চান। কিন্তু আপনি যদি প্রতিবার নিজের রাগকে সিদ্ধান্ত নিতে দেন, তাহলে আপনার নীতির অর্থ বদলে যাবে।”
জারেক ধীরে মাথা নাড়ল।
“আমি জানি।”
“শুধু জানা যথেষ্ট নয়।”
“সেটাও জানি।”
সেদিনের ঘটনা পুলিশকে জানানো হলো। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। ঘটনাস্থলের ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং আগের হুমকির নথি একত্রে সংরক্ষণ করা হলো।
জারেকের বিরুদ্ধেও তদন্তের প্রশ্ন উঠল। সে পালিয়ে গেল না। আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী নিজের বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। সে বলল, হামলা প্রতিহত করতে শক্তি প্রয়োগ করেছে, কিন্তু প্রতিটি আঘাতের পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। কারণ, নিজের কাজের সব দিক প্রকাশ্যে আনলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। তবু সে বুঝতে পেরেছিল, ন্যায়বিচার দাবি করার অর্থ নিজের ভুলের তদন্ত থেকে নিজেকে বাদ দেওয়া নয়।
ওদিকে ওরমাস বুঝতে পারল, মাইলিনকে ভয় দেখিয়ে আর জারেককে সহিংসতার অভিযোগে আটকে রেখে বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কারণ, ঘটনাগুলোর নথি জমা হচ্ছে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী কথা বলছে। আর্থিক নথি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ক্ষমতার যে জাল এত দিন অদৃশ্য ছিল, তার কয়েকটি গিঁট দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
অধ্যায় সাত.
অন্তিম সীমানা
ওরমাসের প্রাসাদসদৃশ বাড়িটি নগরের কেন্দ্র থেকে দূরে, একটি সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ছিল। উঁচু দেয়াল, নজরদারি ক্যামেরা, প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মী এবং আলাদা গাড়ি রাখার ব্যবস্থা। বাইরে থেকে ভবনটিকে ব্যক্তিগত বাসভবন মনে হলেও ভেতরে একাধিক দপ্তরের মতো কক্ষ ছিল।
জারেক বহু দিন ধরে বাড়িটির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল। তবে তার কাছে কোনো বৈধ অনুমতি ছিল না, আর সে জানত, অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করলে নিজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তৈরি হতে পারে।
তবু সে এক রাতে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
এ সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু রাগ ছিল না। মাইলিনের ওপর হুমকি, রুগারের হামলা এবং অর্থ লেনদেনের নথিতে দেখা অসংগতি তাকে ওরমাসের মুখোমুখি হতে বাধ্য করেছিল বলে সে মনে করছিল। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত যে বিপজ্জনক এবং আইনগতভাবে সমস্যাজনক, তা সে বুঝত।
সে মূল প্রবেশপথ দিয়ে ঢোকেনি। ভবনের পাশের একটি পুরোনো সেবা-প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। কয়েকটি নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে সে একটি করিডরে পৌঁছাল। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই সে বুঝল, তার প্রবেশের খবর হয়তো নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে পৌঁছে গেছে।
করিডরের শেষে ওরমাসের ব্যক্তিগত দপ্তর ছিল।
দরজা খুলতেই ওরমাসকে দেখা গেল। বয়স পঞ্চাশের বেশি। পরিপাটি পোশাক। টেবিলের ওপর কয়েকটি ফাইল, একটি বন্ধ ল্যাপটপ এবং কাচের গ্লাস। ওরমাস এমনভাবে বসে ছিল, যেন জারেকের আগমন তার কাছে অপ্রত্যাশিত নয়।
“অবশেষে এসেছ,” ওরমাস বলল।
জারেক দরজার কাছে দাঁড়াল।
“আপনার লোকেরা মাইলিনকে হুমকি দিচ্ছে।”
“অনেক মানুষ অনেক কিছু বলে। প্রত্যেকের কথার দায় কি আমার?”
“রুগার আপনার নির্দেশে কাজ করেছে।”
ওরমাস মৃদু হাসল।
“প্রমাণ আছে?”
“ওর লোকেরা কর্মশালায় ঢুকেছিল। ক্যামেরার রেকর্ড আছে। প্রত্যক্ষদর্শী আছে। পরবর্তী হুমকির বিবরণও নথিভুক্ত হয়েছে।”
“তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নাও। আমার কাছে কেন এসেছ?”
জারেক বুঝল, ওরমাস ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে উত্তেজিত করছে।
“আপনি জানেন, আপনার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথিতে অসংগতি রয়েছে। কিছু সরকারি চুক্তির হিসাব মিলছে না। আপনার সঙ্গে যুক্ত লোকেরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধীদের ভয় দেখাচ্ছে।”
ওরমাস এবার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
“অসংগতি অপরাধ নয়। অভিযোগ প্রমাণ নয়। তুমি কি এই কথাগুলো জানো না?”
“জানি। তাই নথি যাচাই করা হচ্ছে।”
“তাহলে তোমার এখানে আসার কারণ কী?”
জারেক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“আমি দেখতে চেয়েছিলাম, আপনি নিজের মুখে কী বলেন।”
ওরমাস হাসল।
“তুমি সত্য খুঁজতে এসেছ, নাকি আমাকে আঘাত করতে?”
প্রশ্নটি জারেককে থামিয়ে দিল।
ওরমাস এগিয়ে এসে বলল, “তুমি ভ্রেমরকে আঘাত করেছ। রুগারকে আঘাত করেছ। আমার লোকদের আঘাত করেছ। এখন আমার বাড়িতে অননুমোদিতভাবে ঢুকেছ। তুমি নিজেকে স্বাধীনতার রক্ষক বলে মনে করো, অথচ তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ তোমাকে আমার মতো ক্ষমতাবান মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।”
“আমি আপনার মতো হতে চাই না।”
“তাহলে আমার বাড়িতে এসেছ কেন? অভিযোগ জানাতে হলে আইনজীবী আছে, তদন্তকারী সংস্থা আছে, আদালত আছে। তুমি কি মনে করো, তোমার হাতে আঘাত করার ক্ষমতা থাকলেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়?”
জারেকের কাছে প্রশ্নটির সহজ উত্তর ছিল না।
ওরমাস টেবিলের দিকে ফিরে গেল।
“তুমি, সিলভা, মাইলিন—তোমরা সবাই নিজেদের আলাদা মনে করো। কিন্তু এই নগর চলে অর্থ, অনুমতি, যোগাযোগ আর ভয়ের ওপর। তোমাদের নীতির কথা শুনতে ভালো লাগে। বাস্তবে নীতি দিয়ে কোনো ব্যবস্থা চালানো যায় না।”
“ব্যবস্থা চালানোর নামে মানুষকে চুপ করানো যায় না,” জারেক বলল।
“মানুষকে চুপ করানো হয় না। মানুষকে বোঝানো হয়, কোন কথার কী মূল্য দিতে হবে।”
ওরমাসের কথায় জারেকের রাগ আবার বেড়ে গেল।
“আপনি মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছেন।”
“আর তুমি নিজের শরীরের শক্তি দিয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাও। পার্থক্যটা কোথায়?”
জারেক এক পা এগিয়ে এল।
“আমি কাউকে তার মত প্রকাশের জন্য শাস্তি দিতে চাই না।”
“কিন্তু তুমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছ, কে সীমা অতিক্রম করেছে এবং তাকে কী শাস্তি দেওয়া হবে। তুমি কি কখনো ভুল করতে পারো না?”
জারেক থেমে গেল।
এই প্রশ্ন সে নিজেকেও করেছে। কিন্তু ওরমাসের মুখে প্রশ্নটি শুনে তার ভেতরের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হলো।
ওরমাস টেবিলের ড্রয়ার খুলল। ভেতরে রাখা একটি রিভলভারের দিকে তার হাত এগিয়ে গেল।
জারেক সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হলো।
“হাত সরিয়ে নিন।”
ওরমাস অস্ত্রটি ধরতে চেষ্টা করল।
পরবর্তী মুহূর্তে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো। জারেক ওরমাসের কবজিতে আঘাত করল। অস্ত্রটি মেঝেতে পড়ে গেল। ওরমাস পিছিয়ে গিয়ে আবার এগোতে চাইলে জারেক তার কনুইয়ে আঘাত করল। ওরমাস ভারসাম্য হারিয়ে টেবিলের পাশে পড়ে গেল।
সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে জারেক তার হাঁটুতে আঘাত করল। ওরমাস মেঝেতে পড়ে গেল এবং যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল।
জারেক তার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
“এটাই কি আপনার ক্ষমতা?” সে বলল। “মানুষকে ভয় দেখিয়ে, অস্ত্রের সাহায্যে নিজের কথা মানাতে চান?”
ওরমাস ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। তবু বলল, “তুমি ভাবছ, আমাকে থামাতে পেরেছ?”
জারেক উত্তর দিল, “আমি আপনাকে থামাতে চাই। কিন্তু আপনাকে আঘাত করলেই আপনার ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না—এটা এখন বুঝতে পারছি।”
সে এক পা পিছিয়ে গেল।
ওরমাসের টেবিলে কয়েকটি ফাইল ছিল। জারেক সেগুলো নেওয়ার চেষ্টা করল না। অনুমতি ছাড়া নথি নিয়ে গেলে সেগুলোর উৎস ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সে শুধু ঘরের ভেতরের অবস্থান মনে রাখল এবং বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে লাগল।
ঠিক তখনই বাইরে নিরাপত্তাকর্মীদের পায়ের শব্দ শোনা গেল।
জারেক অস্ত্রটির দিকে তাকাল। সেটি মেঝেতে পড়ে ছিল। সে সেটি স্পর্শ করল না।
দরজার কাছে পৌঁছানোর আগে সে পিছনে ফিরে বলল, “আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে, সেগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত। আর আমি যা করেছি, তারও তদন্ত হওয়া উচিত। আমি নিজের জন্য আলাদা আইন দাবি করছি না।”
ওরমাস কোনো উত্তর দিল না।
জারেক বাড়িটি থেকে বেরিয়ে এল। সে জানত, তার প্রবেশের বিষয়টি গোপন রাখা সম্ভব হবে না। ওরমাসের আঘাত, নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার অভিযোগ এবং অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
সে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল না। পরদিন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাটি জানাল। নিজের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযোগের বিষয়েও পরামর্শ নিল। সে স্বীকার করল, ওরমাসের বাড়িতে প্রবেশ করা তার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অস্ত্রের মুখে আত্মরক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হলেও, সেখানে যাওয়ার আগে আইনগত পথ অনুসরণ করা উচিত ছিল।
একই সময়ে সিলভা ও মাইলিনের সংরক্ষিত নথি, প্রকাশ্য সরকারি তথ্য, চুক্তির অনুলিপি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীদের কাছে পৌঁছাতে শুরু করল।
কয়েকটি অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠল। আর্থিক লেনদেন যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব চাওয়া হলো। নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ নিয়ে পৃথক অভিযোগ নথিভুক্ত হলো। মাইলিনের কর্মশালায় হামলার ঘটনাও তদন্তের আওতায় এলো।
জারেক বুঝল, সত্য প্রতিষ্ঠার পথ তার কল্পনার চেয়ে দীর্ঘ। একজন ক্ষমতাবান মানুষকে আঘাত করা সহজ হতে পারে। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্কের প্রতিটি সংযোগ, অর্থের উৎস এবং সিদ্ধান্তের দায় নির্ধারণ করা কঠিন।
তবু এবার কাজটি একা জারেকের হাতে ছিল না।
নথি ছিল। সাক্ষ্য ছিল। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা ছিল। আর ছিল এমন কিছু মানুষ, যারা ভয় থাকা সত্ত্বেও নিজেদের দেখা সত্য বলতে প্রস্তুত হয়েছিল।
অধ্যায় আট.
সীমানার ওপারে
কয়েক সপ্তাহ পর নগরের চেহারায় সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল।
প্রথমে একটি সরকারি দপ্তর থেকে ঘোষণা করা হলো, ওরমাসের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি পর্যালোচনা করা হবে। এরপর আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই করতে তদন্তকারী দল গঠন করা হলো। কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিছু নথির অনুলিপি আদালতের নির্দেশে সংগ্রহ করা হলো।
তদন্তের শুরুতেই সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কিছু হিসাবের ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিছু নথিতে অসংগতি রয়ে গেল। কয়েকটি চুক্তির অনুমোদনপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া হলো। কোনো অভিযোগে যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়া গেলে সেটিকে আলাদা করে রাখা হলো। আর যেসব অভিযোগে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেল, সেগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এগিয়ে চলল।
ওরমাসের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। আদালতের অনুমোদনে তার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথি জব্দ করা হলো। তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে আটক করা হলো। পরে নতুন প্রমাণ সামনে আসার পর ওরমাসকেও গ্রেপ্তার করা হলো।
গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নগরের সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের শিরোনাম দেখা গেল।
কেউ লিখল, ক্ষমতাশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের পতন। কেউ লিখল, রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে চলা আর্থিক লেনদেনের তদন্ত। আবার কেউ জারেককে পুরো ঘটনার নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করল।
কিন্তু জারেক জানত, এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব একা তার নয়।
মাইলিনের নথি, সিলভার দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সরকারি নথির অনুলিপি এবং তদন্তকারীদের কাজ—সব মিলেই বিষয়টি সামনে এসেছে। তার নিজের সহিংস আচরণও তদন্তের বাইরে থাকেনি।
ওরমাসের গ্রেপ্তারের পর তার আঘাতের বিষয়টি সংবাদে প্রকাশিত হয়। কিন্তু সে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হয়নি। জারেকও এ বিষয়ে কোনো দাবি করল না। সে জানত, একজনের শারীরিক ক্ষতিকে ন্যায়বিচারের সাফল্য হিসেবে দেখানো ভুল।
ভ্রেমরের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করল। সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য, সাংবাদিককে বাধা দেওয়ার ঘটনা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ নিয়ে তদন্তের দাবি উঠল। ভ্রেমর প্রথমে সব অভিযোগ অস্বীকার করল। পরে বলল, নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে ভুল করেছে। কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব না দেওয়া এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের প্রস্তাব নিয়ে জনমতের চাপ কমল না।
মাইলিনের কর্মশালার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা হলো। সে আবার ছবি আঁকতে শুরু করল। তবে এবার কাজের পাশাপাশি নথি সংরক্ষণের নিয়মও তৈরি করল। প্রতিটি ছবির তারিখ লিখে রাখত। কোনো বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হলে প্রাসঙ্গিক প্রকাশ্য নথির তালিকা সংরক্ষণ করত। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকলে ছবির ব্যাখ্যায় তাকে অপরাধী বলে ঘোষণা করত না।
তার নতুন প্রদর্শনীর নাম ছিল “অদৃশ্য দড়ি”।
প্রদর্শনীর কেন্দ্রে ছিল আগের সেই বিশাল পাখি। কিন্তু এবার পাখিটির ডানার সঙ্গে কোনো দড়ি বাঁধা ছিল না। পাখিটি উড়ে যাচ্ছে। নিচে নগরের ভবন, সড়ক এবং জানালার সারি। কিছু জানালায় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারও হাতে বই, কারও হাতে নথি, কারও হাতে তুলি। কেউ কারও মুখ বন্ধ করে রাখছে না।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনের দিন জারেক সেখানে গেল।
মাইলিন ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে হাসল।
“আপনি এসেছেন।”
“ছবিটা দেখতে চেয়েছিলাম।”
“এবার পাখিটা উড়ছে।”
“দড়িগুলো কোথায় গেল?”
“সব দড়ি এক দিনে ছিঁড়ে যায়নি। কিছু দড়ি মানুষ নিজেরাই খুলেছে। কিছু দড়ি কেটে ফেলা হয়েছে। আর কিছু দড়ি এখনো আছে—ছবির বাইরে।”
জারেক ছবিটির দিকে তাকাল।
“তাহলে এটা কি শেষ?”
“না। এটা শুধু একটা পর্যায়ের শেষ।”
“আপনি কি মনে করেন, নগর বদলেছে?”
মাইলিন কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “কিছু মানুষ এখন প্রশ্ন করছে। কিছু নথি সামনে এসেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জবাব দিতে হচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে, এমন কথা বলব না। পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটা বুঝতে সময় লাগবে।”
জারেক মাথা নাড়ল।
“আপনি ঠিক বলেছেন।”
মাইলিন তার দিকে তাকাল।
“আপনার বিরুদ্ধে তদন্তের কী হলো?”
“কয়েকটি ঘটনার বিবরণ নেওয়া হয়েছে। আমার আইনজীবী প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিয়েছেন। আত্মরক্ষার পরিস্থিতি, আমার ব্যবহৃত শক্তির মাত্রা এবং কোথায় সংঘর্ষ থামানো সম্ভব ছিল—এসব আলাদাভাবে যাচাই করা হচ্ছে।”
“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
মাইলিন অবাক হয়ে বলল, “আপনি ভয় পান?”
“ভয় না পেলে মানুষ নিজের সীমা ভুলে যেতে পারে। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তার পরিণতি নিয়ে ভাবা দরকার।”
মাইলিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“আপনি কি এখনো আগের নিয়মে বিশ্বাস করেন?”
জারেক ছবিটির দিকে তাকাল।
“আমি বিশ্বাস করি, মানুষকে নিজের কথা বলার অধিকার দিতে হবে। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া অন্যায়। কিন্তু আমি এটাও বুঝেছি, সেই অন্যায়ের জবাব দিতে গিয়ে নিজের হাতে সব বিচার তুলে নেওয়া যায় না।”
“তাহলে আপনার নিয়ম বদলেছে?”
“নিয়মের অর্থ আরও স্পষ্ট হয়েছে। অন্যায় থামানোর চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু সেই চেষ্টারও সীমা থাকতে হবে। আত্মরক্ষা আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। প্রমাণ আর অভিযোগ এক জিনিস নয়। ক্ষমতা আর অধিকারও এক জিনিস নয়।”
মাইলিন মৃদু হাসল।
“এই কথাগুলো ছবিতে আঁকা কঠিন।”
“তাই হয়তো আপনি ছবি আঁকেন।”
ওরা দুজনেই ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর জারেক চায়ের দোকানে গেল। ভাদ্র ভাই তাকে দেখে আগের মতোই চা বানালেন। টেলিভিশনে ওরমাসের গ্রেপ্তার এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে খবর চলছিল।
ভাদ্র ভাই বললেন, “নগরের বড় বড় লোকদের নাম এখন সংবাদে আসছে।”
জারেক চায়ের কাপ হাতে নিল।
“নাম সংবাদে আসা আর দায় প্রমাণ হওয়া এক কথা নয়।”
“আপনি আগের চেয়ে সাবধানে কথা বলেন।”
“আগে ভাবতাম, অন্যায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে থামাতে হবে। এখন বুঝি, থামানোর উপায়টাও গুরুত্বপূর্ণ।”
ভাদ্র ভাই হাসলেন।
“মানুষ ভুল করে শিখে। তবে ভুল স্বীকার করতে সবাই পারে না।”
জারেক জানালার বাইরে তাকাল।
নগর আগের মতোই ব্যস্ত। গাড়ি চলছে। দোকান খুলছে। মানুষ কর্মস্থলে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনী পর্দায় নতুন প্রচার শুরু হয়েছে। উঁচু ভবনের জানালায় আলো জ্বলছে। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল, কিছুই বদলায়নি।
কিন্তু কিছু পরিবর্তন হয়েছিল।
মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছিল, অভিযোগের প্রমাণ কোথায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নথি চাওয়া হচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমের কিছু কর্মী নিজেদের প্রতিবেদন সংশোধন করছিল। কয়েকজন কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হচ্ছিলেন। সব সমস্যা সমাধান হয়নি, কিন্তু নীরবতাকে আর একমাত্র নিরাপদ পথ বলে মেনে নেওয়া হচ্ছিল না।
চা শেষ করে জারেক উঠে দাঁড়াল।
“আবার আসবেন,” ভাদ্র ভাই বললেন।
“আসব।”
জারেক দোকান থেকে বেরিয়ে জনতার মধ্যে মিশে গেল। কেউ তাকে চিনল না। কেউ চিনেও ডাকল না। সে কোনো ছবি তুলল না, কোনো ঘোষণা দিল না। নিজের নামকে প্রতীকে পরিণত করার চেষ্টাও করল না।
নগরের মানুষ তাকে কেউ নিষ্ঠুর বলত, কেউ বিপজ্জনক, কেউ আবার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো একজন মানুষ হিসেবে দেখত। জারেক জানত, এসব পরিচয়ের কোনোটিই তার পুরো পরিচয় নয়।
সে ভুল করেছে। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কখনো আত্মরক্ষায় শক্তি প্রয়োগ করেছে, কখনো রাগের বশে নিজের সীমা অতিক্রম করেছে। সেই কাজগুলোর দায় তার নিজের। অন্যের অন্যায় তার ভুলকে মুছে দিতে পারে না। আবার তার ভুলের কারণে অন্যদের অপরাধও অদৃশ্য হয়ে যায় না।
এই দুই সত্যের মাঝখানেই তার পথ।
রাত বাড়তে থাকল। সড়কের আলো একে একে জ্বলে উঠল। দূরের ভবনগুলোর কাচে নগরের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল। মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ জানত না, জারেক কোথায় যাচ্ছে।
হয়তো সে আবার কোনো অন্যায়ের মুখোমুখি হবে। হয়তো এবার সে প্রথমেই প্রমাণ সংগ্রহের পথ খুঁজবে। হয়তো কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের সীমা মনে রাখার চেষ্টা করবে।
কিন্তু একটি বিষয় সে বুঝেছে—স্বাধীনতার সীমানা রক্ষা করতে হলে শুধু অন্যের সীমা চেনা যথেষ্ট নয়। নিজের ক্ষমতার সীমাও চিনতে হয়।
কারণ, যে মানুষ অন্যের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতাকে সীমাহীন মনে করে, সে একসময় সেই স্বাধীনতারই বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
নগরের ভিড়ের মধ্যে জারেক অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনে রয়ে গেল চায়ের দোকান, পুরোনো গ্রন্থাগার, মাইলিনের ক্যানভাস এবং এমন কিছু নথি, যেগুলো আর সহজে মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না।
অন্তর্বৃত্তের সীমানা আর আগের মতো অদৃশ্য ছিল না। অন্তত কিছু মানুষ এখন জানে, সেই সীমানা কোথায় খুঁজতে হয়। (সমাপ্ত)©️All Right Reserved by Junayed Ashrafur Rahman
24°33'58.6"N 90°41'30.4"E
My home Location ✒ https://goo.gl/maps/RoKi3ekrhkm5PAHPA , But I don't live here. Rented out to other people.
Nandail Municipality, Mymensingh, Bangladesh.
Junayedmn1@gmail.com
My Writings ✒ https://www.blogger.com/profile/11734624718328723069
702) My success in writing. (লেখালেখিতে আমার সাফল্য।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2023/06/702-my-success-in-writing-written-by.html
707)After the fantasy of ministry.(মন্ত্রিত্বের ফ্যান্টাসির পরে।)– Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://mytimemyexperiencesjunayedmn1.blogspot.com/2023/06/707after-fantasy-of-ministry-written-by.html
637)Win prizes.(পুরস্কার জিতুন।) - Written by Junayed Ashrafur ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2022/10/637win-prizes-written-by-junayed.html
667)Case against AI ChatGPT. (এআই চ্যাট জিপিটির বিরুদ্ধে মামলা।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://lawforjusticejunayedmn1.blogspot.com/2023/02/667case-against-chat-gpt-written-by.html http://ow.ly/Zawy104u7kO
#Intellectualproperty #Literature #Law #Contract #Writing #Wisdom
