848)(Story_61) The Rotten Apple of Politics. (রাজনীতির পচা আপেল।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman
848)(Story_61) The Rotten Apple of Politics. (রাজনীতির পচা আপেল।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman https://mywritingsjunayedmn1.blogspot.com/2019/12/about-me-junayed-ashrafur-rahman.html ✒
"লোকটা নিজের দোষে রাজনীতির পচা আপেল হলো।"
🌟 The video of how to translate my writings into your language.(আমার লেখাগুলো যেভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে পড়বেন,সেটার ভিডিও।) https://youtube.com/shorts/cB4L80u1IIc?si=jJV-G14OIP_qQeLA 🌟https://www.facebook.com/share/v/1GuWS35Joi/
**অধ্যায় ওয়ান.**
স্বাধীনতার ভোর আর কুশপুত্তলিকা
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৩।
খালকলা নগরের আকাশ তখনো অন্ধকার। শীতের শেষ দিকের কুয়াশা শহরের পুরোনো বাজার, প্রশাসনিক ভবনের সামনের রাস্তা এবং আবাসিক এলাকার সরু গলিগুলো ঢেকে রেখেছে। দূরের কয়েকটি ভবনের জানালায় আলো জ্বলছে। কোথাও রাতের পাহারাদার হেঁটে বেড়াচ্ছে, কোথাও সংবাদপত্রের গাড়ি এসে থামছে। নগরের প্রধান সড়কে যানবাহনের চলাচল এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু বাজারের পেছনের একটি গলিতে চারজন যুবক নীরবে জড়ো হয়েছে।
ফজরের আজান তখনো শোনা যায়নি।
চারজনের মুখে মাস্ক। পরনে শীতের সাধারণ পোশাক। তাদের একজনের হাতে খড়ের আঁটি, অন্যজনের হাতে পাটের দড়ি। তৃতীয়জন একটি ছোট ব্যাগ থেকে আঠা, কাগজ এবং কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস বের করছিল। চতুর্থ যুবকটি বারবার গলির দুই প্রান্তে তাকাচ্ছিল। কেউ তাদের দেখে ফেলেছে কি না, সেটাই যেন তার প্রধান চিন্তা।
তাদের মধ্যে লম্বা যুবকটির নাম রাকিব। সে নিচু গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি কর রাকিব।” কথাটা বলেই সে নিজেই বুঝতে পারল, নিজের নাম ধরে অন্যকে ডাকাটা ভুল হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো যুবকটিকে বলল, “তাড়াতাড়ি কর। সকাল হয়ে গেলে লোকজন বের হবে।”
পাশের যুবকটি বিরক্ত হয়ে তাকালেও কিছু বলল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দিনের আলো ফোটার আগেই কাজ শেষ করা।
খড়গুলো মাটিতে বিছিয়ে প্রথমে মানুষের শরীরের কাঠামো তৈরি করা হলো। পাটের দড়ি দিয়ে খড় শক্ত করে বাঁধা হলো। তারপর হাত, পা এবং মাথার অবয়ব তৈরি করা হলো। একজন যুবক দূরে দাঁড়িয়ে কাজ দেখছিল। সে মাঝেমধ্যে এগিয়ে এসে কাঠামোটা ঠিক করে দিচ্ছিল।
কাজের মধ্যে তাদের কথাবার্তা খুব কম ছিল। কিন্তু প্রত্যেকেই জানত, তারা কী তৈরি করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে পাঁচ ফুটের কাছাকাছি লম্বা একটি কুশপুত্তলিকা দাঁড়িয়ে গেল। সেটার মাথায় পরানো হলো সাদা টুপি। গায়ে জড়ানো হলো সাদা পাঞ্জাবির মতো দেখতে একটি কাপড়। দূর থেকে দেখলে সাধারণ পোশাক পরা কোনো মানুষের অবয়ব বলেই মনে হতো।
এবার রাকিব ব্যাগ থেকে একটি এ ফোর আকারের কাগজ বের করল। কাগজে একজন মানুষের মুখের ছবি ছাপানো ছিল। প্রিন্টারের কালি ঠিকমতো বসেনি। চোখের জায়গায় কালো দাগ, নাকের অংশে কালি ছড়িয়ে যাওয়া এবং মুখের চারপাশে অস্পষ্ট রেখা ছবিটাকে প্রায় বিকৃত করে দিয়েছিল।
রাকিব ছবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর কুশপুত্তলিকার বুকে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিল।
ছবিটা স্পষ্ট না হলেও পোশাক, টুপির ধরন এবং মুখের মোটামুটি গড়ন দেখে খালকলা নগরের মানুষ একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার কথা মনে করতে পারত। সেই নেতার নাম টবন।
টবন পাঁচ বছর ধরে এলাকায় রাজনীতি করছেন। ওর রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওর নামের সঙ্গে নানা ধরনের গল্প জুড়ে গেছে। কেউ ওকে প্রভাবশালী বলত, কেউ বলত ভয়ংকর মানুষ। কেউ আবার দাবি করত, ওর পেছনে এমন শক্তি আছে, যার সঙ্গে বিরোধে জড়ানো উচিত নয়।
কিন্তু এসব দাবির পক্ষে কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল, তা নিয়ে কেউ খুব একটা মাথা ঘামাত না।
লম্বা যুবকটি কুশপুত্তলিকার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “দেখতে কেমন লাগছে?”
রাকিব কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে অবয়বটা দেখল।
“ছবিটা ঝাপসা। তবে এলাকার মানুষ দেখলে টবন স্যারের কথাই ভাববে।”
চতুর্থ যুবকটি এবার এগিয়ে এল। ওর মুখে অস্বস্তি স্পষ্ট।
“একটা কথা বলি? ছবিটা যদি অন্য কারও হয়? শুধু টুপি আর পাঞ্জাবি দেখে কাউকে চেনা যায় নাকি?”
লম্বা যুবকটি বিরক্ত হয়ে বলল, “এখন এসব প্রশ্নের সময় না।”
“কিন্তু পরে যদি মানুষ অন্য কাউকে দোষ দেয়?”
“আমরা তো কারও নাম লিখে দিইনি। মানুষ যা বুঝবে, বুঝবে।”
চতুর্থ যুবকটি আর কিছু বলল না। তবু ওর মনে সন্দেহ রয়ে গেল। কাজটি যে শুধু প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেটা সে বুঝতে পারছিল। এখানে এমন কিছু ঘটানো হচ্ছে, যার অর্থ নির্ভর করবে অন্য মানুষের ধারণার ওপর।
রাকিব পকেট থেকে দেশলাই বের করল। প্রথম কাঠিটা জ্বালিয়ে আগুন ধরাতে গিয়ে বাতাসে নিভিয়ে ফেলল। দ্বিতীয় কাঠিটি জ্বলে উঠতেই সে কুশপুত্তলিকার নিচের অংশে আগুন ধরিয়ে দিল।
শুকনো খড় প্রথমে ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ল সারা কাঠামোয়। পাঞ্জাবির কাপড়ে আগুন লাগল। বুকের ওপর সাঁটানো কাগজটি কুঁচকে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছবির মুখ আরও অস্পষ্ট হয়ে গেল।
চারজন যুবকের কেউ স্লোগান দিল না। কেউ মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও করল না। তারা শুধু দাঁড়িয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আগুনের আলোয় তাদের মুখের মাস্কগুলোও কয়েক মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারপর আবার কুয়াশা আর অন্ধকার তাদের আড়াল করে দিল।
কয়েক মিনিটের মধ্যে খড়ের অবয়বটি ভেঙে পড়ল। পুড়ে যাওয়া কাঠামো মাটিতে ছড়িয়ে গেল। আগুন নিভে আসার পর পড়ে রইল ছাই, কালো হয়ে যাওয়া কাপড় এবং কাগজের কয়েকটি পোড়া টুকরো।
লম্বা যুবকটি চারপাশ দেখে বলল, “চলো, আর দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই।”
চারজন আলাদা পথে চলে গেল।
তাদের কাছে কাজটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খালকলা নগরের জন্য ঘটনাটির শুরু তখনো হয়নি।
সেদিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীনতার ইতিহাস স্মরণ করার দিন। নগরের বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। এমন দিনে রাজনৈতিক নেতার মতো দেখতে একটি কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর ঘটনা মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হারিয়ে গেল। কুশপুত্তলিকাটি আসলে কাকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল, আর সেই উদ্দেশ্যের পক্ষে কী প্রমাণ ছিল?
যুবকেরা কোনো লিখিত বার্তা রেখে যায়নি। ছবিটাও ছিল অস্পষ্ট। প্রত্যক্ষদর্শীর নির্ভরযোগ্য বক্তব্য তখনো সামনে আসেনি।
তবু সেই আগুনের ধোঁয়া শহরের মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
**অধ্যায় টু.**
**বাজারের গুঞ্জন**
সকাল নয়টা।
খালকলা নগরের কেন্দ্রীয় বাজারে তখন স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে। মাছের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়, সবজির বাজারে দরদাম, কাপড়ের দোকানের সামনে নতুন পণ্যের প্রদর্শনী এবং রাস্তার পাশে চায়ের দোকানগুলোতে রাজনৈতিক আলোচনা চলছিল।
বাজারের পুরোনো চায়ের দোকানটির নাম ছিল জনতা চা-ঘর। দোকানটির সামনে কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ রাখা। ভেতরে দুটি ছোট টেবিল। দেয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার, একটি ঘড়ি এবং স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কয়েকটি ছবি ঝুলছিল।
সেখানেই প্রথম কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর খবর নিয়ে আলোচনা শুরু হলো।
একজন রিকশাচালক চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, “শুনেছেন, কাল রাতে বাজারের পেছনে একটা কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে?”
দোকানদার কেটলি নামিয়ে বললেন, “কার কুশপুত্তলিকা?”
রিকশাচালক উত্তর দিলেন, “সেটাই তো ঠিক বুঝিনি। তবে টবন সাহেবের মতো দেখতে ছিল নাকি।”
বেঞ্চে বসা একজন মধ্যবয়স্ক লোক সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, “আপনি নিজে দেখেছেন?”
“না, আমি অন্যের মুখে শুনেছি।”
“যিনি দেখেছেন, তিনি কি আপনাকে ছবি দেখিয়েছেন?”
“না।”
লোকটি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “তাহলে আপনি নিজে দেখেননি, যিনি দেখেছেন বলে শুনেছেন, তাঁর কথাও যাচাই করেননি। অথচ এখন বলছেন, সেটা টবন সাহেবের কুশপুত্তলিকা।”
রিকশাচালক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “আমি তো শুধু খবরটা বললাম।”
“খবর বলা আর যাচাই না করা কথা ছড়ানো এক বিষয় নয়।”
কথাটা শুনে দোকানের কয়েকজন চুপ করে গেল। কিন্তু আলোচনা থামল না।
একজন বলল, “মাথায় নাকি সাদা টুপি ছিল।”
আরেকজন বলল, “গায়ে সাদা পাঞ্জাবিও ছিল।”
তৃতীয়জন বলল, “টবন সাহেব তো এমন পোশাক পরেন।”
পাশ থেকে একজন তরুণ উত্তর দিল, “এমন পোশাক অনেকেই পরেন। শুধু টুপি আর পাঞ্জাবি দেখে কারও পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না।”
কেউ তার কথায় সম্মতি জানাল। কিন্তু আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “তবু ঘটনাটা সন্দেহজনক।”
সন্দেহ থাকা অস্বাভাবিক ছিল না। সমস্যা ছিল, সন্দেহের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্তও নিতে শুরু করেছিল।
কেউ বলল, টবনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে অপমান করার জন্য কাজটি করেছে। কেউ বলল, টবন নিজেই লোক লাগিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, যাতে স্বাধীনতা দিবসের আলোচনার মধ্যে তাঁর নাম উঠে আসে। আরেকজন দাবি করল, এলাকার মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল ঘটনাটি।
কিন্তু এসব বক্তব্যের পক্ষে তখন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না।
দুপুরের আগেই খবরটি বাজার ছাড়িয়ে শহরের অন্য এলাকায় পৌঁছে গেল। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কক্ষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলো। কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যে কথা বলল। অফিসে যাওয়ার পথে কয়েকজন সরকারি কর্মচারীও ঘটনাটি নিয়ে মন্তব্য করলেন।
একজন শিক্ষক বললেন, “কেউ যদি সত্যিই প্রতিবাদ জানাতে চায়, তাহলে নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পারে। অস্পষ্ট ছবি দিয়ে কাউকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
আরেকজন বললেন, “কিন্তু রাজনৈতিক পরিবেশে মানুষ সব সময় তথ্য যাচাই করে না। পরিচিত কোনো নাম শুনলেই অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করে।”
প্রথম শিক্ষক উত্তর দিলেন, “সেই কারণেই যাচাই করা আরও জরুরি। কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে প্রমাণ দরকার। মানুষের মুখে মুখে কথা ছড়ানো কোনো প্রমাণ নয়।”
এই আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই টবনের বাড়িতে খবর পৌঁছে গেল।
টবন তখন নিজের ড্রইংরুমে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন। সামনে চায়ের কাপ। টেবিলের ওপর কয়েকটি সংবাদপত্র। দেয়ালে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবি। ঘরের এক পাশে তাঁর কয়েকজন অনুসারীর সঙ্গে তোলা একটি বড় ছবি রাখা ছিল।
বগলু দ্রুত ঘরে ঢুকল।
“নেতা, একটা খবর আছে।”
টবন টেলিভিশনের শব্দ কমিয়ে বললেন, “কী হয়েছে?”
“বাজারের পেছনে গত রাতে একটা কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে।”
“তাতে আমার কী?”
বগলু একটু থেমে বলল, “লোকজন বলছে, ওটা আপনার মতো দেখতে ছিল।”
টবন এবার পুরোপুরি টেলিভিশনের দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
“আমার মতো দেখতে?”
“জি। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। বুকে একটা ছবিও ছিল নাকি।”
টবন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন।
“ছবিটা পরিষ্কার ছিল?”
“না। শুনেছি, মুখ ঝাপসা ছিল।”
“কেউ কি নিশ্চিত করে বলতে পেরেছে যে সেটা আমার ছবি?”
“না, নেতা। তবে সবাই আপনার নাম বলছে।”
টবন চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তাহলে একটা অস্পষ্ট ছবি থেকে মানুষ আমার নাম ধরে নিয়েছে। অথচ কেউ নিশ্চিত নয়।”
বগলু বলল, “কিন্তু আপনার নামে আলোচনা হচ্ছে। এটা কি খারাপ না?”
টবন হেসে বললেন, “সব আলোচনা খারাপ নয়। তবে মানুষ কেন আলোচনা করছে, সেটাও বুঝতে হয়।”
বগলু এবার কিছুটা স্বস্তি পেল।
কিন্তু টবনের চিন্তা ছিল অন্য রকম। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ঘটনাটির মাধ্যমে তাঁর নাম আরও বেশি মানুষের মুখে উঠেছে। কে কুশপুত্তলিকা তৈরি করেছে, কেন করেছে, ছবিটি কার ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর তখনো অজানা। কিন্তু তিনি ঘটনাটিকে নিজের পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন।
বগলু জিজ্ঞেস করল, “নেতা, আপনি কি কোনো বিবৃতি দেবেন?”
টবন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “এখনই কাউকে দোষ দেওয়ার দরকার নেই। কেউ প্রশ্ন করলে বলবে, আমরা ঘটনাটি সম্পর্কে কিছু জানি না। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা ঠিক হবে না।”
বগলু বলল, “আর যদি মানুষ আপনাকেই দোষ দেয়?”
টবন উত্তর দিলেন, “তাহলে আগে জানতে হবে, তারা কীসের ভিত্তিতে দোষ দিচ্ছে।”
কথাগুলো শুনতে যুক্তিসংগত ছিল। কিন্তু টবনের মনে অন্য একটি হিসাবও চলছিল। তিনি ভাবছিলেন, ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা যত বাড়বে, তাঁর নাম তত বেশি পরিচিত হবে।
তিনি তখনো বুঝতে পারেননি, কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে কৌতূহল তৈরি হওয়া আর সেই ব্যক্তির ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হওয়া এক বিষয় নয়।
**অধ্যায় থ্রি.**
**টবনের থিওরি**
টবনের বয়স আটচল্লিশ। পাঁচ বছর আগে ঢাকা থেকে খালকলা নগরে এসেছিলেন। নিজের অতীত নিয়ে তিনি খুব একটা কথা বলতেন না। কেউ পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রসঙ্গ বদলে দিতেন। কেউ জানতে চাইলে কীভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হলেন, তিনি বলতেন, মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থেকেই রাজনীতিতে এসেছেন।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পুরোনো নথি খুঁজলে বড় কোনো অর্জনের তালিকা পাওয়া যেত না। কোনো উল্লেখযোগ্য সামাজিক প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত ছিল না। কোনো বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, কোনো হসপিটালের সেবার মান বৃদ্ধি কিংবা কোনো এলাকার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানে তাঁর বড় ভূমিকার প্রমাণও সামনে ছিল না।
তবু পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।
এই পরিচিতি তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন সভায় উপস্থিতি, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি তোলা, স্থানীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়া এবং তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত নানা কথার মাধ্যমে। কেউ বলত, ঢাকায় তাঁর বড় যোগাযোগ আছে। কেউ বলত, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তাঁর পরিচিত লোক রয়েছে। কেউ দাবি করত, তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ালে বিপদ হতে পারে।
কিন্তু এসব কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য তিনি নিজে কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, এসব কথা শুনে অনেকে তাঁর সামনে সাবধানে কথা বলে। কেউ প্রকাশ্যে প্রশ্ন করতে চায় না। কেউ কোনো সভায় তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গেলে অন্যরা তাকে থামিয়ে দেয়।
টবন এই আচরণকে সম্মান বলে মনে করতে শুরু করেছিলেন।
একবার একটি রাজনৈতিক সভায় একজন প্রবীণ কর্মী তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, গত তিন বছরে তিনি এলাকার জন্য কী করেছেন। টবন নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। সভা শেষে কয়েকজন কর্মীও তাঁর কাজের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সেদিন তিনি অপমানিত বোধ করেছিলেন।
এরপর থেকে তিনি ভাবতে শুরু করলেন, মানুষের সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করাই ভালো। নিজের কাজের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার চেয়ে এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করা ভালো, যার সামনে অন্যরা প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবে।
কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা এবং প্রশ্ন করার পরিবেশ বন্ধ করে দেওয়া নেতৃত্বের যোগ্যতার প্রমাণ নয়।
কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর ঘটনার পর বিকেলে বগলু আবার তাঁর কাছে এল।
“নেতা, বাজারে এখনো আপনার নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।”
টবন বললেন, “বলতে দাও।”
“কেউ বলছে, আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।”
“তারা কি কোনো প্রমাণ দেখিয়েছে?”
“না।”
“তাহলে এখনই ষড়যন্ত্রের কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই।”
বগলু মাথা নাড়ল।
টবন এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, “বগলু, রাজনীতিতে মানুষের মনে একটা ধারণা তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
বগলু জানতে চাইল, “কী ধরনের ধারণা?”
টবন বললেন, “ধরো, একজন মানুষকে সবাই সৎ বলে জানে। তার কথা সবাই শোনে। আরেকজনকে সবাই ভয় পায়। তার নাম শুনলেই মানুষ সাবধান হয়ে যায়। এখন বলো, কার প্রভাব বেশি?”
বগলু একটু ভেবে বলল, “যাকে মানুষ ভয় পায়, তার।”
টবন সন্তুষ্ট হলেন।
“ঠিক তাই। কিন্তু আসল বিষয়টা হলো, মানুষ কেন ভয় পায়, সেটা সব সময় যাচাই করে না। তারা শুধু শোনে, তারপর নিজের মতো করে একটা ধারণা তৈরি করে।”
বগলু বলল, “তাহলে আপনার নামে যেসব কথা ছড়াচ্ছে, সেগুলো কি আপনার উপকারে আসবে?”
টবন এবার নিজের রাজনৈতিক চিন্তাটা খুলে বললেন।
“বগলু, এটাই রাজনীতি। ডাইরেক্ট প্রচারে কাজ হয় না। ইনডাইরেক্ট দুর্নামে কাজ হয়।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, “মানুষ মনে করুক আমি যুদ্ধাপরাধী ছিলাম। তাহলে ভাববে আমি সাহসী। মানুষ মনে করুক আমি গডফাদার। তাহলে ভাববে আমার পাওয়ার আছে। আর যারা এগুলো বলছে, আমি চাইলেই থামাতে পারি। কিন্তু থামাব না। কারণ তারা যত বলবে, আমার ফ্রি প্রচার তত হবে।”
বগলু বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
“নেতা, আপনি তো জিনিয়াস!”
টবন হাসলেন। তাঁর মনে হলো, তিনি এমন একটি কৌশল আবিষ্কার করেছেন, যা অন্যরা বুঝতে পারে না। কাজের হিসাব না থাকলেও পরিচিতি দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করা সম্ভব। মানুষের আস্থা না থাকলেও তাদের মনে ভয় তৈরি করে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানো সম্ভব।
কিন্তু এই ভাবনার মধ্যে একটি বড় সমস্যা ছিল। টবন অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য বুঝতেন, অথচ নিজের সুবিধার সময় সেই পার্থক্যকে গুরুত্ব দিতেন না। তিনি জানতেন, তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো প্রতিটি কথাই সত্য নয়। কিন্তু তিনি এটাও চাইতেন না যে মানুষ এসব কথা ভুলে যাক। কারণ গুজবের কারণে তৈরি হওয়া রহস্য তাঁকে নিজের চোখে বড় করে তুলেছিল।
তিনি একবারও ভাবেননি, কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ালে শুধু সেই ব্যক্তির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এলাকার মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। রাজনৈতিক আলোচনা যুক্তির পরিবর্তে সন্দেহের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। প্রকৃত অন্যায়ের অভিযোগও তখন গুজবের ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।
বগলু বলল, “নেতা, তাহলে আপনার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে আমরা চুপ থাকব?”
টবন উত্তর দিলেন, “সব কথার জবাব দিতে হয় না।”
কথাটা আংশিক সত্য। কিন্তু তিনি নিজের সুবিধামতো কথাটির অর্থ বদলে ফেললেন। যে অভিযোগের উত্তর দেওয়া তাঁর জন্য জরুরি ছিল, সেটিও তিনি এড়িয়ে যেতে শুরু করলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর কয়েকজন কর্মী এসে কুশপুত্তলিকার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করল। কেউ জানতে চাইল, তিনি কি কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি করবেন। কেউ বলল, তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
টবন তাদের বললেন, “কেউ কোনো প্রমাণ ছাড়া কারও নাম বলবে না। আমরা বিষয়টা দেখছি।”
কিন্তু সভা শেষে তিনি বগলুকে আলাদা করে বললেন, “মানুষকে এখনই সবকিছু পরিষ্কার করে দেওয়ার দরকার নেই। একটু রহস্য থাকুক।”
বগলু মাথা নাড়ল।
টবনের কাছে রহস্য তখন রাজনৈতিক সম্পদ। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শূন্যতা একদিন প্রকাশ পেলে তাঁর পরিচিতির ভিতও নড়ে যাবে।
**অধ্যায় ফোর.**
**প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয়**
খালকলা নগরের রাজনৈতিক পরিবেশ তখন ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দলের স্থানীয় কার্যালয়ে বৈঠক হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের সমর্থন যাচাই করছেন। কেউ জনসভা করছেন, কেউ উন্নয়নমূলক কাজের হিসাব প্রকাশ করছেন, কেউ আবার দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে মনোনয়নের জন্য তিনজনের নাম বেশি আলোচিত ছিল।
প্রথমজন সাবেক সচিব দ্রুবেশ সাহেব। দীর্ঘ বিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি এলাকায় ফিরে এসেছিলেন। শিক্ষা, সড়ক যোগাযোগ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে তিনি বিভিন্ন সময় কাজ করেছেন। পাঁচটি বিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে তাঁর ভূমিকার নথি ছিল। তিনটি সেতুর প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যও ছিল। তাঁর সব উদ্যোগ সফল হয়নি, কিন্তু তিনি কোন কাজ করেছেন, কোনটি করতে পারেননি এবং কেন পারেননি, তা ব্যাখ্যা করতে পারতেন।
দ্বিতীয়জন ব্যবসায়ী কাদের সাহেব। বড় ব্যবসা ছিল তাঁর। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অনুদান দিতেন। দলীয় কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা করতেন। দলের অনেক নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তবে তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও ছিল। ব্যবসায়িক সাফল্য আর জনসেবার মধ্যে কতটা সম্পর্ক, তা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আলোচনা চলত।
তৃতীয়জন টবন। পাঁচ বছরের রাজনৈতিক পরিচিতি ছিল তাঁর। বিভিন্ন সভায় উপস্থিতি এবং নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তাঁকে অনেকেই চিনতেন। কিন্তু এলাকার উন্নয়নে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকা খুব ছোট ছিল। তাঁর নামে প্রচলিত গুজব ছিল অনেক, কিন্তু যাচাইযোগ্য অর্জন ছিল কম।
টবন অবশ্য মনে করতেন, অন্য দুই প্রার্থীর চেয়ে তাঁর প্রভাব বেশি।
একদিন বিকেলে কাদের সাহেবের কার্যালয়ে দ্রুবেশ সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। দুজনের মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা চলছিল।
কাদের সাহেব বললেন, “দ্রুবেশ ভাই, আমাদের সবারই তো একটা লক্ষ্য আছে। দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই মনোনয়ন দেবে।”
দ্রুবেশ সাহেব উত্তর দিলেন, “সেটাই হওয়া উচিত। তবে যোগ্যতা বিচার করতে হলে কাজ, জনসমর্থন এবং প্রার্থীর আচরণ দেখতে হবে। শুধু পরিচিতি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।”
কাদের সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন।
“সেটা ঠিক। তবে একটা কথা বলি, টবনের সঙ্গে ঝামেলা কইরেন না। লোকটা সুবিধার না।”
দ্রুবেশ সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন? তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আছে?”
কাদের সাহেব সরাসরি উত্তর দিলেন না।
“অভিযোগের কথা আলাদা। কিন্তু এলাকায় তাঁর একটা প্রভাব আছে।”
“প্রভাব বলতে কী বোঝাচ্ছেন?”
“মানুষ তাঁকে সমীহ করে।”
দ্রুবেশ সাহেব বললেন, “সমীহ আর ভয় এক জিনিস নয়। আর ভয় থাকলেই যে নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকে, তা-ও নয়।”
কাদের সাহেব কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।
কিন্তু কথোপকথনটি দ্রুবেশ সাহেবের মনে থেকে গেল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে তিনি লক্ষ্য করলেন, স্থানীয় কিছু নেতা টবনের সামনে অন্যদের তুলনায় বেশি সতর্ক আচরণ করছেন। কেউ তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করতে চাইছেন না। কেউ ব্যক্তিগত আলোচনায় টবনকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না।
দ্রুবেশ সাহেব একদিন নিজের ঘনিষ্ঠ কর্মীকে জিজ্ঞেস করলেন, “মানুষ যদি টবনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, তাহলে প্রকাশ্যে বলতে ভয় পায় কেন?”
কর্মীটি বলল, “স্যার, অনেকে মনে করে তাঁর পেছনে শক্তিশালী লোক আছে।”
“কারা আছে?”
“সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।”
“তাহলে মানুষ কিসের ভিত্তিতে বিশ্বাস করছে?”
কর্মীটি কোনো উত্তর দিতে পারল না।
দ্রুবেশ সাহেব বুঝলেন, একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার ভিত্তি পরিষ্কার নয়। সেই ধারণা ভাঙতে হলে শুধু বক্তব্য দিলেই হবে না। তথ্য প্রকাশ করতে হবে, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু টবনের পদ্ধতি ছিল আলাদা।
কোনো সভায় গেলে তিনি এমনভাবে বসতেন, যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর হাতেই। কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে অপেক্ষা করাতেন। কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলতেন, “সময় হলে সব জানতে পারবেন।”
কেউ তাঁর কাজের হিসাব চাইলে তিনি বলতেন, “সব কাজ কি কাগজে দেখানো যায়?”
কেউ তাঁর কথিত প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি হাসতেন। সেই হাসির অর্থ মানুষ নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করত।
টবন এই আচরণগুলোকে নিজের রাজনৈতিক সাফল্য বলে ধরে নিয়েছিলেন।
একদিন বগলু তাঁকে বলল, “নেতা, দ্রুবেশ সাহেব এখন আপনাকে এড়িয়ে চলেন।”
টবন বললেন, “ভয় পায়।”
“কাদের সাহেবও আপনার ব্যাপারে সাবধানে কথা বলেন।”
“সেটাও ভয়ের লক্ষণ।”
বগলু হেসে বলল, “তাহলে মনোনয়ন আপনারই হওয়া উচিত।”
টবন উত্তর দিলেন, “মনোনয়ন কে পাবে, সেটা শুধু কাজের ওপর নির্ভর করে না। মানুষ কাকে শক্তিশালী মনে করে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।”
কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা ছিল না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভাবমূর্তি, সংগঠন, জনসমর্থন ও প্রভাবের ভূমিকা থাকে। কিন্তু টবন বাস্তবতার একটিমাত্র দিককে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের মনে ভয় তৈরি করতে পারলেই অন্য সব ঘাটতি ঢেকে দেওয়া যাবে।
তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, রাজনৈতিক দলেরও নিজস্ব হিসাব থাকে। যে প্রার্থীকে মানুষ বিশ্বাস করে না, যার কাজের হিসাব নেই এবং যার সম্পর্কে নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়ায়, তাকে মনোনয়ন দিলে দলকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
ভয়ের ওপর দাঁড়ানো ভাবমূর্তি তাই যত দ্রুত তৈরি হয়, তত দ্রুত ভেঙেও যেতে পারে।
**অধ্যায় ফাইভ.**
**তিন বছরের গুজব**
২০২৪ সাল।
নতুন বছরের শুরুতে খালকলা নগরের রাজনৈতিক আলোচনা অন্যদিকে মোড় নিলেও টবনকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল কমল না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নামের সঙ্গে নতুন নতুন গল্প জুড়ে যেতে লাগল।
প্রথম গুজবটি ছড়াল জমি নিয়ে।
একদিন বাজারে শোনা গেল, টবন নাকি একজন বৃদ্ধের জমি দখল করেছেন। কেউ বলল, জমির কাগজপত্র তাঁর লোকজন নিয়ে গেছে। কেউ বলল, জমির মালিককে এলাকাছাড়া করা হয়েছে। কিন্তু কথাগুলোর পক্ষে কোনো দলিল, লিখিত অভিযোগ কিংবা যাচাই করা বিবরণ সামনে এল না।
একজন তরুণ শিক্ষক চায়ের দোকানে বললেন, “যদি সত্যিই জমি দখলের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে জমির কাগজপত্র, মালিকের বক্তব্য এবং অভিযোগের নথি সামনে আসুক। শুধু নাম জুড়ে দিলে তো সত্য প্রমাণ হয় না।”
কেউ তাঁর সঙ্গে একমত হলো। কেউ আবার বলল, “সব কাগজ কি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়?”
শিক্ষকটি বললেন, “সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও অভিযোগ যাচাই করার আইনগত পথ আছে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা ঠিক নয়। আবার অভিযোগ উঠেছে বলে সেটাকে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।”
কথাটা যুক্তিসংগত ছিল। কিন্তু বাজারের অধিকাংশ মানুষ তখনো ঘটনাটার সত্যতা জানত না।
টবনের কাছে বিষয়টা পৌঁছালেও তিনি কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দিলেন না।
বগলু জিজ্ঞেস করল, “নেতা, জমি দখলের কথাটা নিয়ে কিছু বলবেন না?”
টবন বললেন, “কেন বলব?”
“মানুষ তো আপনার নামে বলছে।”
“মানুষ বলুক। আমি উত্তর দিতে গেলে তারা ভাববে কথাটা আমাকে আঘাত করেছে।”
বগলু বলল, “কিন্তু কেউ যদি সত্যি বিশ্বাস করে?”
টবন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “গুজবের একটা সুবিধা আছে। মানুষ যখন জানে না সত্যি কী, তখন তারা নিজেরাই গল্প তৈরি করে। আমি কিছু না বললে সেই গল্প চলতে থাকবে।”
বগলু এবারও নেতার কথায় মাথা নাড়ল। কিন্তু তার ভেতরে সামান্য অস্বস্তি তৈরি হলো।
কারণ সে জানত, সব গুজব একই ধরনের নয়। কিছু গুজব কারও ব্যক্তিগত সুনাম নষ্ট করতে পারে। কিছু আবার প্রকৃত ক্ষতির কথা সামনে আনার চেষ্টা করতে পারে। কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই না করে নীরব থাকলে মানুষের বিভ্রান্তি বাড়তে পারে।
টবন সেই পার্থক্যটি করতে চাইতেন না।
২০২৫ সাল।
এবার ছড়াল পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে নতুন কথা।
বাজারে বলা হতে লাগল, টবন নাকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। কেউ বলল, তাঁর কথায় মামলা হয়। কেউ বলল, তাঁর কথায় মামলা থেমে যায়। আবার কেউ দাবি করল, থানার অনেক সিদ্ধান্ত তাঁর অনুমতি ছাড়া নেওয়া হয় না।
কোনো নির্দিষ্ট নথি বা যাচাই করা তথ্য ছাড়াই এসব কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগল।
টবনের একজন পরিচিত কর্মী একদিন তাঁকে বলল, “নেতা, লোকজন এখন আপনাকে থানার বস বলে।”
টবন হেসে বললেন, “তাতে ক্ষতি কী?”
“মানুষ ভয় পায়।”
“ভয় পেলে আমার সঙ্গে অন্যায় করতে আসবে না।”
কর্মীটি বলল, “কিন্তু সাধারণ মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে আপনার কাছে আসতেও ভয় পেতে পারে।”
টবন কথাটা শুনে বিরক্ত হলেন।
“তুমি রাজনীতি বোঝো না। সবাইকে খুশি রাখা যায় না।”
এই যুক্তির আড়ালে তিনি নিজের ভুল ঢেকে রাখলেন।
একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। জনসাধারণের প্রতিনিধি প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে কথা বলতে পারেন, আইনগত সহায়তা চাইতে পারেন এবং সরকারি সেবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু প্রশাসনকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার দাবি কোনো সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিচয় নয়।
টবন এসব পার্থক্য নিয়ে ভাবলেন না।
২০২৬ সালের শুরুতে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি গুজব।
এবার বলা হলো, তাঁর নাকি পঞ্চাশজন গুন্ডা আছে।
একজন বলল, “টবনের লোকজনের সঙ্গে ঝামেলা করলে বিপদ।”
আরেকজন বলল, “আমি নিজে কাউকে দেখিনি। তবে সবাই যখন বলে, কিছু তো আছে।”
তৃতীয়জন বলল, “সবাই বলছে বলে সত্যি হয়ে যায় না।”
কিন্তু শেষের কথাটা বেশিক্ষণ আলোচনায় থাকল না।
টবন অবশ্য পঞ্চাশজন লোকের কোনো তালিকা দেখাতে পারতেন না। তাঁর এমন কোনো সংগঠিত বাহিনী ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো যাচাই করা তথ্যও ছিল না। কিন্তু গুজবটা তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে যাওয়ায় তিনি প্রতিবাদ করলেন না।
বরং তিনি নিজের সভায় বললেন, “আমি জনগণের সেবক। আমার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু আমি মানুষের পাশে আছি।”
বক্তব্যটি শুনে কিছু মানুষ হাততালি দিল। অন্যরা ভাবল, তিনি হয়তো অভিযোগগুলোর জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তথ্য দিলেন না। কোন অভিযোগের উত্তর কী, কোনটি মিথ্যা, কোনটির তদন্ত হওয়া উচিত, সে সম্পর্কেও কিছু বললেন না।
ফলে মানুষ আগের মতোই বিভ্রান্ত রইল।
তিন বছরে টবনের নামের সঙ্গে অন্তত দশটি বড় গুজব যুক্ত হলো। কিছু ছিল ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে, কিছু জমি নিয়ে, কিছু প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে, আর কিছু ছিল তাঁর রাজনৈতিক অতীত নিয়ে।
এসবের মধ্যে কোনটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, কোনটি আংশিক সত্য এবং কোনটির কোনো ভিত্তিই নেই, তা যাচাই করার জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য অনুসন্ধান সামনে আসেনি।
টবন অবশ্য প্রতিটি গুজবকে নিজের প্রচারের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
তাঁর ধারণা ছিল, যত বেশি মানুষ তাঁকে নিয়ে কথা বলবে, তত বেশি মানুষ তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববে। তিনি বুঝতে পারেননি, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ শোনা গেলে মানুষ একসময় তাঁর নামের সঙ্গে সন্দেহকেও স্থায়ীভাবে যুক্ত করতে পারে।
তাঁর সম্পর্কে মানুষের মনে তখন দুটি অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।
ভয় এবং কৌতূহল।
কিন্তু বিশ্বাস তৈরি হয়নি।
আর রাজনীতিতে এই পার্থক্যটা বোঝার মতো ধৈর্য টবনের ছিল না।
**অধ্যায় সিক্স.**
**দলীয় অফিসের দিন**
২০২৬ সালের অক্টোবর।
জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যস্ততা বেড়েছে। খালকলা নগরেও প্রার্থীদের কর্মসূচি, সভা এবং দলীয় যোগাযোগ জোরদার হয়েছে। মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রত্যেক প্রার্থী নিজের যোগ্যতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
দ্রুবেশ সাহেব তাঁর বিশ বছরের কাজের হিসাব গুছিয়ে নিলেন। কোন বিদ্যালয়ে কী উন্নয়ন হয়েছে, কোন সড়ক সংস্কার করা হয়েছে, কতজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে, কোথায় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করা হয়েছে, সব তথ্য নথিভুক্ত করলেন।
তিনি জানতেন, নিজের কাজের কথা বললেই হবে না। কাজের প্রমাণও দেখাতে হবে।
কাদের সাহেবও দলীয় কার্যালয়ে আর্থিক সহায়তার কাগজপত্র জমা দিলেন। তিনি মনে করতেন, দলের কঠিন সময়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়া তাঁর বড় অবদান। তবে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত যে শুধু অর্থের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত নয়, সেটাও তিনি জানতেন।
টবনের প্রস্তুতি ছিল অন্য রকম।
তিনি নিজের পাঁচ বছরের রাজনৈতিক জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তৈরি করলেন। সেখানে কয়েকটি সভায় অংশগ্রহণ, কিছু সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তোলা ছবির উল্লেখ ছিল। কিন্তু উল্লেখযোগ্য জনসেবামূলক কাজের তালিকা ছিল না।
বগলু একদিন ফাইলটা দেখে বলল, “নেতা, এখানে তো কাজের হিসাব খুব কম।”
টবন বললেন, “কাজের হিসাব দিয়ে সব সময় মনোনয়ন হয় না।”
“কিন্তু দল যদি জানতে চায়, আপনি কী করেছেন?”
“তখন বলব, এলাকায় আমার প্রভাব আছে।”
বগলু বলল, “প্রভাবের প্রমাণ কী দেবেন?”
টবন বিরক্ত হয়ে ফাইলটা বন্ধ করলেন।
“তুমি এত প্রশ্ন করছ কেন? রাজনীতি কি শুধু কাগজে চলে?”
বগলু আর কথা বাড়াল না।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গেল।
রাজনীতি শুধু কাগজে চলে না। মানুষের আস্থা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা এবং জনসম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই করতে হলে তাঁর কাজের হিসাব, আচরণ, জনসমর্থন এবং অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছতা দেখতে হয়।
শুধু গুজব বা ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে এসব যাচাই করা সম্ভব নয়।
কয়েক দিন পর ঢাকায় দলীয় প্রধানের কার্যালয়ে মনোনয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসে।
বড় টেবিলের ওপর তিনটি ফাইল রাখা ছিল।
প্রথম ফাইলটি দ্রুবেশ সাহেবের। সেখানে বিশ বছরের কাজের বিবরণ, পাঁচটি বিদ্যালয়ের উন্নয়নসংক্রান্ত তথ্য, তিনটি সেতুর কাজের নথি এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক উদ্যোগের বিস্তারিত হিসাব ছিল।
দ্বিতীয় ফাইলটি কাদের সাহেবের। সেখানে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেওয়া আর্থিক সহায়তার হিসাব ও রসিদ ছিল। তাঁর ব্যবসায়িক পরিচয়, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং সামাজিক কার্যক্রমের বিবরণও যুক্ত ছিল।
তৃতীয় ফাইলটি টবনের।
সেটা মাত্র দুই পাতার। পাঁচ বছরের রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাজের কোনো বিস্তারিত হিসাব সেখানে ছিল না।
দলীয় প্রধান প্রথমে দ্রুবেশ সাহেবের ফাইল দেখলেন। তারপর কাদের সাহেবের ফাইল খুললেন। সবশেষে টবনের ফাইল হাতে নিলেন।
দুই পাতা পড়ে তিনি ফাইলটি বন্ধ করলেন।
“টবনকে চিনি না। মনোনয়ন কীভাবে দেব?”
ঘরে বসা কয়েকজন নেতা একে অন্যের দিকে তাকালেন।
সিনিয়র একজন নেতা চেয়ার একটু এগিয়ে এনে নিচু গলায় বললেন, “স্যার, ফাইলে সব লেখা থাকে না। টবন ওর এলাকার গডফাদার। ওর কথায় সব চলে। সচিব-ব্যবসায়ী ওর সামনে কথা বলে না। আর শুনেছি যুদ্ধের সময় ও বড় নেতা ছিল।”
দলীয় প্রধান তাঁর দিকে তাকালেন।
“যুদ্ধের সময় বড় নেতা ছিল? কোন যুদ্ধের কথা বলছেন?”
সিনিয়র নেতা একটু থমকে গেলেন।
“স্যার, এ রকম কথাই শোনা যায়।”
“কথা শোনা যায় মানে? কোনো নথি আছে?”
“সেটা আমার কাছে নেই।”
“কোনো যাচাই করা তথ্য?”
“না, স্যার।”
দলীয় প্রধান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক অতীত নিয়ে এমন দাবি করা হচ্ছে, অথচ কোনো প্রমাণ নেই। তাঁর বিরুদ্ধে গডফাদার হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটারও কোনো যাচাই করা নথি নেই। তাহলে আমরা কীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব?”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
তিনি আবার টবনের ফাইল খুললেন।
“এই ফাইলে তাঁর পাঁচ বছরের রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখ আছে। কিন্তু কাজের হিসাব নেই। এলাকার মানুষ তাঁকে কেন সমর্থন করবে, তার কোনো পরিষ্কার বিবরণ নেই। তিনি কী উন্নয়ন করেছেন, কী সমস্যার সমাধান করেছেন, কীভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, সেসব তথ্যও নেই।”
একজন নেতা বললেন, “স্যার, এলাকায় তাঁর একটা প্রভাব আছে।”
দলীয় প্রধান প্রশ্ন করলেন, “প্রভাবের প্রমাণ কী?”
কেউ উত্তর দিলেন না।
তিনি এবার গম্ভীর গলায় বললেন, “এত দেখি রাজনীতির পচা আপেল। একে মনোনয়ন দিলে আমার পুরা বাক্স পচে যাবে। বাদ দাও। মনোনয়ন যাবে দ্রুবেশ সাহেবের কাছে।”
সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো।
তবে দলীয় প্রধান স্পষ্ট করে দিলেন, টবনের বিরুদ্ধে প্রচলিত প্রতিটি অভিযোগকে সত্য ধরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং তাঁর যোগ্যতার পক্ষে যথেষ্ট যাচাইযোগ্য তথ্য না থাকা, কাজের হিসাবের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক ভাবমূর্তি সম্পর্কে অস্পষ্টতা সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
তিনি আরও বললেন, “কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী বলা যাবে না। কিন্তু মনোনয়নের জন্য প্রার্থীর যোগ্যতা ও কাজের হিসাবও দেখতে হবে। দুটো বিষয় আলাদা।”
বৈঠক শেষ হলো।
দ্রুবেশ সাহেবের মনোনয়ন চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি শুরু হলো।
টবনের ফাইলটা টেবিলের এক পাশে পড়ে রইল।
দুই পাতার সেই ফাইলের ভেতরে তাঁর পাঁচ বছরের রাজনৈতিক জীবনের সারাংশ ছিল। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল, তা হলো মানুষের জন্য করা কাজের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
টবন হয়তো মনে করেছিলেন, তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত গুজবগুলোই তাঁকে বড় করে তুলবে। কিন্তু মনোনয়নের টেবিলে গুজবের কোনো নির্ভরযোগ্য নথি ছিল না। ছিল না তাঁর কথিত প্রভাবের যাচাইযোগ্য হিসাব।
ছিল শুধু অসম্পূর্ণ একটি ফাইল।
**অধ্যায় সেভেন.**
**ভাঙন**
রাত দশটা।
খালকলা নগরে টবনের বাড়ির সামনে কয়েকজন কর্মী বসে ছিল। কেউ মনোনয়নের খবর জানার অপেক্ষায় ছিল, কেউ আবার পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছিল।
হঠাৎ একজন পরিচিত কর্মী দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
“নেতা, খবর আছে।”
টবন তখন নিজের ঘরে বসে ফোন দেখছিলেন।
“কী হয়েছে?”
“মনোনয়ন দ্রুবেশ সাহেব পেয়েছেন।”
টবন প্রথমে কিছু বললেন না।
তিনি ফোনটা টেবিলে রাখলেন। তারপর কর্মীটির দিকে তাকালেন।
“নিশ্চিত?”
“জি নেতা। দলীয় কার্যালয় থেকে খবর এসেছে।”
টবন আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমার নাম বিবেচনায় ছিল না?”
“ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দ্রুবেশ সাহেবের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
টবন চেয়ারে বসে রইলেন। তাঁর মাথার ভেতর একের পর এক ঘটনা ফিরে আসতে লাগল। কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর খবর, বাজারের গুঞ্জন, মানুষের চোখে তাঁর প্রতি সতর্কতা, কাদের সাহেবের কথাবার্তা, দ্রুবেশ সাহেবের দূরত্ব, আর দলীয় কার্যালয়ে তাঁর ফাইল বন্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
তিনি এত দিন ভেবেছিলেন, মানুষ তাঁকে ভয় পায় বলেই তাঁর প্রভাব আছে।
কিন্তু আজ সেই ভয়ের কোনো মূল্য দেখা গেল না।
কেউ তাঁর কথিত ক্ষমতার হিসাব জানতে চেয়েছে, কিন্তু তিনি তা দিতে পারেননি। কেউ তাঁর নামে ছড়ানো গুজবকে যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেনি। বরং তাঁর কাজের হিসাব জানতে চাওয়া হয়েছিল। আর সেই হিসাব তিনি দিতে পারেননি।
রাত বাড়তে লাগল।
কর্মীরা একে একে চলে গেল। বাড়ির লোকজনও নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। টবন কাউকে ডাকলেন না। কারও সঙ্গে কথা বললেন না।
তিনি তিন ঘণ্টা ছাদের ঘরে বসে রইলেন।
রাতের আকাশে মেঘ জমেছিল। দূরে কয়েকটি বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছিল। নিচের রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে মোটরসাইকেল চলে যাচ্ছিল। টবন চুপচাপ বসে ভাবছিলেন, পাঁচ বছর আগে খালকলা নগরে আসার সময় তাঁর কী ছিল।
তখন তাঁর কোনো বড় পরিচয় ছিল না। কেউ তাঁকে ভয় পেত না। কেউ তাঁর নাম শুনে সাবধান হতো না। কিন্তু সেই সময় অন্তত তিনি নিজের অযোগ্যতাকে ঢাকতে এত চেষ্টা করেননি।
পরে যখন দেখলেন, মানুষ তাঁর সম্পর্কে নানা কথা বলছে, তখন তিনি সেই কথাগুলোকে নিজের সম্পদ মনে করলেন।
তিনি ভাবলেন, সত্য জানার চেয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত রাখা সহজ। নিজের কাজের হিসাব দেওয়ার চেয়ে নিজের সম্পর্কে রহস্য তৈরি করা সহজ। মানুষের আস্থা অর্জনের চেয়ে মানুষের মনে ভয় তৈরি করা সহজ।
কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়ার পর তিনি বুঝতে শুরু করলেন, সহজ পথ সব সময় গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না।
রাত দুইটার দিকে তিনি বগলুকে ডাকলেন।
বগলু ঘরে ঢুকে বলল, “নেতা, ডাকছিলেন?”
টবন ধীরে ধীরে বললেন, “বগলু, আমি ভুল করেছি।”
বগলু অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
“কী ভুল নেতা?”
টবন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, “জীবনে যুদ্ধ করিনি। তবু যুদ্ধাপরাধী সেজেছি। জীবনে গডফাদার হইনি। তবু গডফাদার সেজেছি। ভেবেছিলাম নেগেটিভ দিয়ে বড় হব। কিন্তু ভুলে গেছি, দল সম্মান চায়, ভয় না।”
বগলু কোনো কথা বলল না।
টবন আবার বললেন, “মানুষ যখন আমার নামে খারাপ কথা বলত, তখন আমি ভাবতাম, তারা আমাকে নিয়ে আলোচনা করছে। তাই আমি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি একবারও ভাবিনি, তারা আমাকে বিশ্বাস করে কি না।”
তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
“আমি নিজের ক্ষতি নিজেই করলাম।”
টবনের চোখে পানি এসে গেল।
বগলু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে বহুবার নেতাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে। বহুবার অন্যদের সামনে নেতার প্রভাব নিয়ে গর্ব করেছে। কিন্তু আজ প্রথমবার সে টবনকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেখল।
কিছুক্ষণ পর বগলু বলল, “নেতা, এখন কী করবেন?”
টবন মাথা নিচু করে বললেন, “আগে বুঝতে হবে, আমি আসলে কী করেছি। শুধু মনোনয়ন না পাওয়ার জন্য অনুতাপ করলে কোনো লাভ হবে না। আমি যদি আবার মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই বদলাই, তাহলে সেটা সত্যিকারের পরিবর্তন হবে না।”
বগলু বলল, “তাহলে?”
“তাহলে কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু এবার মানুষের চোখে বড় হওয়ার জন্য নয়। মানুষের সমস্যার সমাধানের জন্য।”
বগলু ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
টবন জানতেন, শুধু কয়েকটি ভালো কাজ করলেই অতীতের সব ভুল মুছে যাবে না। যারা তাঁর কথায় বিভ্রান্ত হয়েছে, তাদের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে। যাদের মনে তাঁর সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আর নিজের নামে ছড়ানো অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজন হলে তথ্য যাচাইয়ের পথও খোলা রাখতে হবে।
তিনি এটাও বুঝতে পারলেন, পরিবর্তন ঘোষণা করা সহজ। কিন্তু সেই পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা কঠিন।
সেই রাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পরদিন থেকে তিনি নিজের আচরণ বদলানোর চেষ্টা করবেন।
তবে তিনি জানতেন না, মানুষ তাঁকে কতটা বিশ্বাস করবে। তিনি জানতেন না, তাঁর অতীতের ভুলগুলো কত দিন মানুষের মনে থাকবে।
কিন্তু প্রথমবারের মতো তিনি এই প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে গেলেন না।
**অধ্যায় এইট.**
**নতুন শুরু**
পরদিন সকালে টবন ঘুম থেকে উঠে আগের দিনের মতো টেলিভিশনের সামনে বসলেন না। তিনি নিজের ঘরে বসে পুরোনো কাগজপত্র বের করলেন। গত পাঁচ বছরে কোন কোন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, কোথায় কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কোন কাজ শুরু করার কথা বলেছিলেন, সবকিছু লিখে রাখার চেষ্টা করলেন।
তালিকাটা তৈরি করতে গিয়ে তিনি অস্বস্তিতে পড়লেন।
যে কাজগুলোকে তিনি নিজের রাজনৈতিক সাফল্য বলে মনে করতেন, সেগুলোর অনেকগুলোই ছিল সভায় বক্তব্য দেওয়া, কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা কিংবা অন্য নেতার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা।
কাজের ফলাফল কোথায়?
কোন বিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধান হয়েছে?
কোন রাস্তা সংস্কার হয়েছে?
কোন পরিবারের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে তিনি সাহায্য করেছেন?
কোন সরকারি সেবা পেতে মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল, আর তিনি সেই সমস্যা সমাধানে কী ভূমিকা রেখেছিলেন?
প্রশ্নগুলো লিখতে লিখতে তিনি বুঝলেন, তাঁর কাছে এসবের পরিষ্কার উত্তর নেই।
সেদিন দুপুরে তিনি বগলুকে নিয়ে খালকলা নগরের একটি বিদ্যালয়ে গেলেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইলেন, শিক্ষার্থীদের কী কী সমস্যা রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক তাঁকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন।
“আপনি কী কাজে এসেছেন?”
টবন বললেন, “বিদ্যালয়ের সমস্যা জানতে চাই। যদি আমার পক্ষে কোনো কাজে সহযোগিতা করা সম্ভব হয়, সেটা করতে চাই।”
প্রধান শিক্ষক বললেন, “আমাদের কিছু সমস্যার কথা আগে থেকেই বলা আছে। কিন্তু আপনি কি সেগুলো সমাধান করার জন্য এসেছেন, নাকি অন্য কোনো কর্মসূচি আছে?”
প্রশ্নটা শুনে টবন থমকে গেলেন।
আগে কেউ তাঁকে এমন প্রশ্ন করলে তিনি হয়তো বিরক্ত হতেন। কিন্তু এবার তিনি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আপনার সন্দেহ করার কারণ আছে। আমি আগে অনেক কথা বলেছি, কিন্তু কাজের হিসাব দিতে পারিনি। তাই এবার আগে সমস্যাগুলো শুনতে চাই।”
প্রধান শিক্ষক কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর বিদ্যালয়ের কয়েকটি সমস্যা তুলে ধরলেন। কিছু শিক্ষার্থীর খাতা-কলমের অভাব ছিল। কয়েকটি শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের সংকট ছিল। পাঠাগারের বইও কম ছিল।
টবন সব কথা লিখে নিলেন।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দিলেন না। কত টাকা লাগবে, কোন কাজটি আগে করা সম্ভব, কোন কাজের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা সরকারি দপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন, তা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
দুই দিন পর তিনি বিদ্যালয়ের দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য খাতা-কলমের ব্যবস্থা করলেন। তবে তিনি শিক্ষকদের বললেন, শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা যাচাই করে যাদের প্রয়োজন বেশি, তাদের আগে দিতে।
কয়েকজন কর্মী ছবি তোলার প্রস্তাব দিল।
টবন বললেন, “ছবি তোলার দরকার নেই। তবে খরচের হিসাব রাখবে। কতজনকে দেওয়া হয়েছে, কী কেনা হয়েছে, সব লিখে রাখবে।”
বগলু অবাক হয়ে বলল, “নেতা, প্রচার না করলে মানুষ জানবে কীভাবে?”
টবন উত্তর দিলেন, “মানুষ জানবে কাজের মাধ্যমে। তবে কাজের হিসাব প্রকাশ করতে সমস্যা নেই। প্রচার আর কাজের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমি এত দিন প্রচারকে কাজ ভেবেছি।”
পরের সপ্তাহে তিনি নগরের একটি রাস্তা দেখতে গেলেন। রাস্তার কয়েকটি বড় গর্তের কারণে মানুষ চলাচলে সমস্যায় পড়ছিল। বর্ষার সময় সেখানে পানি জমত। রিকশা ও মোটরসাইকেল চালকদের চলাচলে অসুবিধা হতো।
টবন প্রথমে ভাবলেন, নিজের টাকায় গর্তগুলো ভরাট করিয়ে দিলেই কাজ শেষ। কিন্তু একজন স্থানীয় প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝলেন, সাময়িকভাবে গর্ত ভরাট করা আর রাস্তার স্থায়ী সংস্কার এক বিষয় নয়।
তিনি নিজের অর্থে জরুরি মেরামতের ব্যবস্থা করলেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রাস্তার স্থায়ী সংস্কারের জন্য লিখিত আবেদন করলেন। আবেদনের অনুলিপি নিজের কাছে রাখলেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের হিসাবও লিখে রাখলেন।
কাজ শেষ হওয়ার পর একজন বৃদ্ধ বললেন, “বাবা, এই রাস্তার কথা তো অনেক দিন ধরে বলা হচ্ছিল। আগে কেউ এমন করে এগিয়ে আসেনি।”
টবন বললেন, “আমি আগে কেন করিনি, সেটাও আমার নিজের কাছে প্রশ্ন।”
বৃদ্ধটি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ভালো কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, একবার গর্ত ভরাট করলেই মানুষের সব সমস্যা শেষ হয় না। রাস্তার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।”
টবন মাথা নাড়লেন।
তিনি এবার প্রশংসা শুনে নিজের সাফল্য ঘোষণা করলেন না। বরং বুঝলেন, জনসেবার কাজ শেষ হয়েছে কি না, সেটা নির্ধারণ করতে হয় সমস্যার বাস্তব সমাধান দেখে।
ঈদের আগে তিনি এলাকার একশটি পরিবারের জন্য চাল-ডালের ব্যবস্থা করলেন। এবারও তিনি কর্মীদের বললেন, সাহায্য দেওয়ার আগে পরিবারগুলোর প্রয়োজন যাচাই করতে হবে। তালিকা তৈরি করতে হবে। খরচের হিসাব রাখতে হবে। কাউকে রাজনৈতিক সমর্থনের শর্তে সাহায্য দেওয়া যাবে না।
একজন কর্মী বলল, “নেতা, যারা আমাদের সমর্থন করে না, তাদেরও দেব?”
টবন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, “মানুষের প্রয়োজন রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করে না। সাহায্য যদি করি, তাহলে সেটা মানুষের প্রয়োজন দেখে করতে হবে।”
এই কথাটা বলার সময় তিনি বুঝতে পারলেন, একসময় যেসব বিষয়কে তিনি গুরুত্বহীন ভাবতেন, সেগুলোই প্রকৃত নেতৃত্বের ভিত্তি।
তবে পরিবর্তনের শুরুতেই সবাই তাঁকে বিশ্বাস করতে শুরু করেনি।
কেউ বলল, মনোনয়ন না পেয়ে তিনি নতুন নাটক শুরু করেছেন। কেউ বলল, পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ বলল, কয়েক মাস পর সব আগের মতো হয়ে যাবে।
টবন এসব কথা শুনে বিরক্ত হতেন না, এমন নয়। মাঝে মাঝে তাঁর মনে হতো, এত কিছু করার পরও মানুষ কেন তাঁকে সন্দেহ করছে?
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজের পুরোনো আচরণের কথা মনে করতেন।
তিনি নিজেই তো বছরের পর বছর মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করেছেন। নিজেই তো গুজবকে নিজের প্রচারের অংশ হতে দিয়েছেন। এখন মানুষ তাঁকে দ্রুত বিশ্বাস করবে, এমন আশা করার অধিকার তাঁর নেই।
একদিন বগলু বলল, “নেতা, লোকজন এখনো বলছে আপনি নাটক করছেন।”
টবন উত্তর দিলেন, “তারা যা দেখেছে, তার ভিত্তিতে বলছে। আমার কাজ যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটা চালিয়ে যেতে হবে। শুধু মানুষ কী বলছে, তার ওপর নির্ভর করলে আবার আগের ভুলে ফিরে যাব।”
বগলু এবার বুঝতে পারল, নেতার পরিবর্তন শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। অন্তত তিনি নিজের ভুল নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন।
ছয় মাস পর খালকলা নগরের মানুষ টবনকে আগের চেয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করল। কেউ তাঁর কাজের প্রশংসা করল। কেউ এখনো সন্দেহ করল। কেউ বলল, তিনি সত্যিই বদলেছেন, আবার কেউ বলল, সময়ই প্রমাণ করবে।
একদিন একজন বৃদ্ধ টবনকে বললেন, “বাবা, ভয় দেখিয়ে বড় হওয়া যায়। কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে বড় হতে হয়।”
টবন মাথা নিচু করে বললেন, “চাচা, বুঝতে দেরি হয়ে গেল।”
সেদিন বাড়ি ফিরে তিনি নিজের পুরোনো ফাইলের পাশে একটি নতুন খাতা রাখলেন। খাতার প্রথম পাতায় লিখলেন, খালকলা নগরের জনসেবার কাজের হিসাব।
তিনি জানতেন, এই খাতা তাঁর অতীতের সব ভুল মুছে দেবে না। কিন্তু অন্তত এবার তিনি এমন একটি পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে নিজের সাফল্য প্রমাণ করার জন্য গুজবের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
টবন আর মনোনয়নের জন্য আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করলেন না। তিনি এলাকার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। কোনো কাজ শেষ হলে তার হিসাব রাখতেন। কোনো কাজ আটকে গেলে কারণ লিখে রাখতেন। মানুষের অভিযোগ শুনতেন এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।
তিনি বুঝতে শিখলেন, রাজনীতি শুধু পরিচিতি অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়। এটি মানুষের আস্থা ও দায়িত্বের বিষয়।
একসময় তিনি মনে করতেন, নেতিবাচক প্রচারও সাফল্যের পথ হতে পারে। এখন তিনি বুঝেছেন, গুজব দিয়ে মানুষের কৌতূহল তৈরি করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস তৈরি করা যায় না। ভয় দিয়ে মানুষকে নীরব রাখা যায়, কিন্তু সম্মান অর্জন করা যায় না।
একদিন সন্ধ্যায় বগলু তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “নেতা, আপনি কি আর কখনো মনোনয়ন চাইবেন না?”
টবন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা এখন বলতে পারব না। তবে এবার কোনো পদ পাওয়ার জন্য মানুষের কাছে যাব না। মানুষের সমস্যার কথা শুনতে যাব। কোনো কাজ করলে তার হিসাব রাখব। আর আমার নামে কেউ কিছু বললে, সত্যতা যাচাই না করে সেটাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করব না।”
বগলু বলল, “তাহলে আপনার প্রভাব কমে যাবে না?”
টবন হাসলেন।
“যদি মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয়, তাহলে আমার ব্যক্তিগত প্রভাব কমলেও সমস্যা নেই। মানুষের কাজ হওয়াটাই আসল।”
সেই কথার পর বগলু আর কিছু বলল না।
টবন নিজের টেবিলে ফিরে গেলেন। সামনে খোলা খাতায় অনেকগুলো অসমাপ্ত কাজের তালিকা। তিনি একটি কাজের পাশে লিখলেন, অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে। আরেকটির পাশে লিখলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে লিখিত উত্তর নিতে হবে।
শেষ পাতায় তিনি লিখলেন, রাজনীতিতে শর্টকাট নেই। পচা আপেল দিয়ে ভালো ফল হয় না।
তারপর বাক্যটির নিচে আরও একটি লাইন যোগ করলেন।
মানুষের বিশ্বাস দাবি করে পাওয়া যায় না। কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
খাতা বন্ধ করার আগে তিনি একবার পুরো তালিকাটা দেখলেন। সামনে এখনো অনেক কাজ। সব কাজ তিনি নিজে করতে পারবেন না। সব সমস্যার সমাধানও তাঁর হাতে নেই। কিন্তু কোথায় তাঁর দায়িত্ব, কোথায় অন্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, আর কোথায় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন, তা বোঝার চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাবেন।
একসময় তিনি ভেবেছিলেন, মানুষের মুখে নিজের নাম ছড়িয়ে পড়াই ছিল তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য।
এখন তিনি জানেন, নামের সঙ্গে কী জুড়ে আছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারও মুখে যদি তাঁর নাম আসে, তিনি চান সেই নামের সঙ্গে যুক্ত থাকুক কাজের হিসাব, দায়িত্বশীল আচরণ, সত্য যাচাই করার মানসিকতা এবং মানুষের প্রতি সম্মান।
আর যদি কেউ তাঁকে নিয়ে গুজব ছড়ায়, তাহলে তিনি আর সেই গুজবকে নিজের প্রচারের অস্ত্র বানাতে চান না।
কারণ তিনি শিখেছেন, সত্যকে এড়িয়ে তৈরি করা পরিচিতি যত বড়ই হোক, বাস্তবতার সামনে তার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
টবনের রাজনৈতিক জীবনের সেই অধ্যায় শেষ হয়েছিল মনোনয়ন না পাওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু নিজের ভুল বুঝতে শেখার অধ্যায় তখনো শেষ হয়নি।
তিনি জানতেন, ভবিষ্যতে তাঁকে আবার পরীক্ষা দিতে হবে। মানুষের সন্দেহ, নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে আবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সেই সিদ্ধান্তগুলোই একদিন প্রমাণ করবে, তাঁর পরিবর্তন সত্যিই স্থায়ী হয়েছে কি না।
খালকলা নগরের রাত নেমে এল। বাজারের পেছনের সেই পুরোনো গলিটা আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। সেখানে একসময় খড়ের কুশপুত্তলিকা পুড়েছিল। ধোঁয়া উঠেছিল। ছাই পড়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা প্রশ্ন।
সময়ের সঙ্গে ছাই মাটিতে মিশে গেছে। কিন্তু ঘটনাটি টবনকে যে শিক্ষা দিয়েছিল, তা তিনি এবার নিজের কাজের মধ্যে ধরে রাখতে চাইলেন।
তিনি আর ভয়ের পরিচয়ে বড় হতে চান না।
তিনি চান, মানুষ তাঁকে তাঁর কাজ দিয়ে বিচার করুক।
কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির আসল পরীক্ষা হলো না কে কত বেশি আলোচনায় থাকতে পারল, কে কত বেশি গুজব ছড়াতে পারল কিংবা কে কত বেশি মানুষকে ভয় দেখাতে পারল।
আসল পরীক্ষা হলো, কে মানুষের সমস্যার পাশে দাঁড়াল, কে নিজের কাজের হিসাব দিল, কে ভুল স্বীকার করে সংশোধনের চেষ্টা করল এবং কে ক্ষমতা পাওয়ার আগেও মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করল।
টবন সেই পরীক্ষায় একসময় ভুল করেছিলেন।
এখন তিনি চেষ্টা করছেন, আরেকবার সেই ভুল না করতে। (সমাপ্ত)
©️All Right Reserved by Junayed Ashrafur Rahman
24°33'58.6"N 90°41'30.4"E
My home Location ✒ https://goo.gl/maps/RoKi3ekrhkm5PAHPA , But I don't live here. Rented out to other people.
Nandail Municipality, Mymensingh, Bangladesh.
Junayedmn1@gmail.com
My Writings ✒ https://www.blogger.com/profile/11734624718328723069
702) My success in writing. (লেখালেখিতে আমার সাফল্য।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2023/06/702-my-success-in-writing-written-by.html
707)After the fantasy of ministry.(মন্ত্রিত্বের ফ্যান্টাসির পরে।)– Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://mytimemyexperiencesjunayedmn1.blogspot.com/2023/06/707after-fantasy-of-ministry-written-by.html
637)Win prizes.(পুরস্কার জিতুন।) - Written by Junayed Ashrafur ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2022/10/637win-prizes-written-by-junayed.html
667)Case against AI ChatGPT. (এআই চ্যাট জিপিটির বিরুদ্ধে মামলা।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://lawforjusticejunayedmn1.blogspot.com/2023/02/667case-against-chat-gpt-written-by.html http://ow.ly/Zawy104u7kO
#Intellectualproperty #Literature #Law #Contract #Writing #Wisdom Junayed Ashrafur Rahman
