845)(Story_58) The school of unlettered. (অশিক্ষিতের পাঠশালা।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman
845)(Story_58) The school of unlettered. (অশিক্ষিতের পাঠশালা।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman https://mywritingsjunayedmn1.blogspot.com/2019/12/about-me-junayed-ashrafur-rahman.html ✒
🌟 The video of how to translate my writings into your language.(আমার লেখাগুলো যেভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে পড়বেন,সেটার ভিডিও।) https://youtube.com/shorts/cB4L80u1IIc?si=jJV-G14OIP_qQeLA 🌟https://www.facebook.com/share/v/1GuWS35Joi/
অধ্যায় এক.
সন্ধ্যার আলাপ
তালতলি শহরের দেওয়ানি ভবনের সামনে সেই বিকেলে মানুষের ভিড় ছিল। একটি জমির মালিকানা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলতেছিল। দুই পক্ষের লোকজন পৃথকভাবে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতেছিল। কারও হাতে পুরোনো দলিল ছিল। কারও হাতে কর পরিশোধের কাগজ ছিল। কারও কাছে আবার শুধু এলাকার মানুষের সাক্ষ্য ছিল।
বাচুর চেম্বারে সেই মামলার ফাইলও ছিল।
বাচু দীর্ঘ সময় ধরে কাগজগুলো দেখল। তারপর ফাইল বন্ধ করল। তার মনে হলো, জমি নিয়ে মানুষের বিরোধ অনেক সময় জমির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। একটি ছোট সীমারেখা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বহু বছরের দূরত্ব তৈরি হয়। একজন বলে, জমি তার বাবার। আরেকজন বলে, কাগজ তার নামে। দুই পক্ষই নিজেদের কথা সত্য বলে মনে করে।
সোনাতলা নদীর ধারে সন্ধ্যা নামলে বাতাসে একটু ঠান্ডা এসে লাগে। নদীর ওপারে গাছের সারির ওপর দিয়ে সূর্য ডুবে যায়। তার শেষ আলোটা পানিতে লম্বা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আলোটা দেখে মনে হয়, কেউ আগুনের সরু একটা শিকল জলে ফেলে দিয়েছে।
তালতলি বাজারের ঠিক ধারে একতলা বিল্ডিংয়ের মধ্যে বাচুর চেম্বার। চেম্বারের সামনে একটা লোহার বেঞ্চ। বেঞ্চটায় সন্ধ্যায় প্রায়ই বসে চা খাইলো বাচু। এক হাতে কাপ ছিল। অন্য হাতে ছিল কোনো মামলার ফাইল।
সেদিনও সে বসে ছিল।
আজকের ফাইলটা ছিল একটা জমির মামলা। দুই পরিবারের বিবাদ। দুই পুরুষের শত্রুতা। মানুষ কেন এত ছোট জিনিস নিয়ে এত বড় শত্রুতা তৈরি করে, ভাবতেছিল বাচু।
সে ভাবছিল, এই মামলার দুই পক্ষ দুই পরিবার। একজনের বাবা মারা গেছে। আরেকজনের বাবা বেঁচে আছে। মৃত বাবার ছেলে বলছে, জমিটা তার বাবার। বেঁচে থাকা বাবার ছেলে বলছে, কাগজ তার নামে। দুইজনই কাঁদে। দুইজনই নিজেদের কথা সত্য বলে।
কাগজের পাশাপাশি সত্য নির্ধারণের জন্য আরও অনেক বিষয় দেখতে হবে। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল এক লোক।
বয়স ষাটের কাছাকাছি। মাথায় টাক। মুখে সাদা-কালো মেশানো দাড়ি। পরনে ময়লা লুঙ্গি আর ছেঁড়া গেঞ্জি। হাতে একটা লাঠি। কাঁধে ঝুলতেছিল একটা পুরোনো ছালার ব্যাগ। তাকে দেখে বোঝা যায় না, সে ভিক্ষুক, না মাঝি, না কুলি। শুধু বোঝা যায়, সে ক্লান্ত। খুব ক্লান্ত।
"বসবেন?" বাচু জিজ্ঞেস করল।
লোকটা বসল। বেঞ্চের এক মাথায়। শরীরটা একটু দূরে সরিয়ে রাখল। যেন জায়গা নেওয়ার অধিকার তার নেই। সেটা সে ভালো করেই জানে।
"চা খাবেন?" বাচু জিজ্ঞেস করল।
"থাক, বাবা।" লোকটার গলা ভাঙা। ভারী। "তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছি।"
ফাইলটা বাচু বন্ধ করে রাখল।
"বলুন।"
লোকটা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। নদীর দিকে তাকাল। তারপর বলল, "আমি দেখছি, তুমি রোজ সন্ধ্যায় এই স্থানে বসে থাকো। মানুষ তোমার কাছে আসে। কাঁদে। ঝগড়া করে। তুমি ওদের শোনো। কিন্তু ভালো-মন্দের কথা তুমি নিজে কখনো বলো না। আমি ভাবলাম, তুমি বোধহয় জানো না। তাই আমি এসেছি। আমি তোমাকে বলব, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা করা উচিত, কোনটা নয়।"
বাচু একটু হাসল। কাপটা টেবিলে রাখল।
"শুনো বাবা," লোকটা আবার বলল। "আমার বয়স ষাট বছর। এই ষাট বছরে আমি অনেক কিছু দেখেছি। আমি দেখেছি, যে বেশি কথা বলে, সে কম জানে। আমি দেখেছি, টাকা মানুষকে বদলায়। আমি দেখেছি, ভালো মানুষ সবসময় সুখী হয় না। এই কথাগুলো কোনো বইয়ে নাই। তাই তোমাকে শেখাতে এসেছি।"
বাচু ধীরে সোজা হয়ে বসল। তার গলাটা একটু ভারী হয়ে এলো।
"দাদা," সে বলল, "আপনার কথা শুনলাম। কিন্তু একটা কথা রাখুন। আমি অনার্স পাস করেছি। মাস্টার্স পাস করেছি। এলএলবি পাস করেছি। আমি বুঝি কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। এ বিষয়ে আমাকে জ্ঞান দিতে আসবেন না। এছাড়া সামাজিক অন্য বিষয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। যেগুলো আপনার প্র্যাকটিক্যাল লাইফে ঘটেছে।"
লোকটা থতমত খেয়ে গেল। তার মুখটা একটু নুয়ে পড়ল। লাঠিটার ওপর হাত রাখল সে। নদীর ওপর দিয়ে বাতাস এলো। তার দাড়ির সাদা চুলগুলো একটু নড়ে উঠল।
"তাই না কি," সে আস্তে বলল। "তুমি এত পড়েছ?"
"পড়েছি," বাচু বলল। "আর পড়ার সময় আমি শুধু বই পড়িনি। আমি মানুষের মামলাও দেখেছি। মানুষের কান্নাও দেখেছি। আমি যা জানি, তা কেবল কাগজের নয়। জীবনেরও।"
লোকটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আমার নাম কেশু। আমি অক্ষর চিনি না। আমি শুধু নদী চিনি। নৌকা চিনি। মানুষ চিনি। আমি ভাবতাম, এইটাই জ্ঞান। কিন্তু তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আমার অনেক কিছু জানা নেই।"
বাচু তার দিকে তাকাল। লোকটার চোখে তখন আর বড়াই ছিল না। ছিল একটা কৌতূহল। যেন একটা বন্ধ দরজা খুলতে চাইছে।
"বসুন," বাচু বলল। "আপনি চাইলে আজ থেকে আমি আপনাকে শেখাতে পারি। কিন্তু একটা শর্ত। আমাকে প্রশ্ন করবেন। আর আমার কথা মন দিয়ে শুনবেন।"
কেশু মাথা নাড়ল।
"আমি শুনব, বাবা। আমার ষাট বছরের অভ্যাস ভাঙব, যদি তুমি আমাকে শেখাও।"
সন্ধ্যার শেষ আলোটা তখন নিভে গেছে। ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা। ঢেউয়ে দুলতেছে। নদীর বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল দুটো মানুষের প্রথম কথা। একজনের ছিল শিক্ষা। আরেকজনের ছিল শেখার ইচ্ছা।
সেদিন বাচু বুঝতে পারেনি, এই সাক্ষাৎ তার নিজের জীবনেও পরিবর্তন আনবে।
অধ্যায় দুই.
প্রথম প্রশ্ন
পরদিন সন্ধ্যায় কেশু আবার এলো। এবার তার হাতে একটা ছোট কাগজ ছিল। সেই কাগজে কারও লেখা একটা লাইন।
"বাবা," সে বলল, "এই কাগজটা আমার গ্রামের এক ছেলে লিখে দিয়েছে। এতে লেখা আছে, জমিটা আমার। কিন্তু আমি জানি না, কাগজ থাকলে জমিটা সত্যিই আমার হয় কি না। তুমি বলো।"
বাচু কাগজটা হাতে নিল। লেখাটা দেখল। কোনো সিল নেই। কোনো তারিখ নেই। কোনো সাক্ষী নেই।
"কেশু দাদা," বাচু বলল, "একটা কথা মনে রাখবেন। কাগজ নিজে কিছু বলে না। কাগজকে গ্রহণযোগ্য করে তিনটে বিষয়। এক, সময়। দুই, সাক্ষী। তিন, ন্যায়। এই কাগজে তিনটের একটাও নেই। তাই এই কাগজ কোনো কাজে আসবে না।"
কেশু মাথা নিচু করল।
"তাহলে আমি কী করব?"
"আপনি জানেন, জমিটা আসলে কার?"
"জানি। আমার বাবার। কিন্তু আমার বাবার কোনো কাগজ নেই।"
"তাহলে সমস্যা কাগজের নয়," বাচু বলল। "সমস্যা মিথ্যার। যে বলছে জমিটা তার, সে মিথ্যা বলছে। আর মিথ্যার সঙ্গে লড়তে কাগজ লাগে না। সাক্ষী লাগে। আপনার গ্রামের লোকেরা জানেন, জমিটা আপনার বাবার। ওরাই আপনার সাক্ষী।"
কেশুর চোখ বড় হয়ে গেল।
"আমি এটা ভাবিনি। আমি ভেবেছিলাম, কাগজ না থাকলে আমি হারব।"
"কাগজ মানুষকে বাঁচায় না," বাচু বলল। "সত্য মানুষকে বাঁচায়। কাগজ শুধু সত্যকে লিখে রাখে।"
কেশু সেই রাতে অনেকক্ষণ বসে রইল। তার হাতে থাকা কাগজটা সে বারবার দেখল। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল।
"বাবা, আমি কাল আবার আসব। আমার আরও প্রশ্ন আছে।"
"আসবেন," বাচু বলল।
কেশু চলে গেল।
বাচু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, প্রথম প্রশ্নটা জমির ছিল। কিন্তু প্রশ্নের ভেতরে আরও বড় বিষয় ছিল। মানুষ যখন নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে না, তখন অন্যের কথার ওপর নির্ভর করে। শিক্ষা সেই নির্ভরতা কমাতে পারে।
অধ্যায় তিন.
ন্যায়ের পাঠ
সেই সপ্তাহে কেশু রোজ আসতে শুরু করল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে বেঞ্চে বসে। আর বাচু তাকে একটা একটা করে প্রশ্নের উত্তর দেয়।
একদিন কেশু জিজ্ঞেস করল, "বাবা, ন্যায় আর অন্যায়ের পার্থক্য কী?"
বাচু একটু ভাবল। তারপর বলল, "আপনি নদীতে নৌকা বাইতেন। ধরুন, দুই নৌকা একই ঘাটে পৌঁছাতে চায়। একজন আগে পৌঁছালে আরেকজন পিছিয়ে যায়। এটা অন্যায় না। এটা প্রতিযোগিতা।"
"তাহলে অন্যায় কী?"
"অন্যায় হলো, যখন কেউ নিজের নৌকা বাড়াতে গিয়ে আরেকজনের নৌকা ফুটো করে দেয়। তখন সে কেবল এগোয় না। সে অন্যের ক্ষতি করে। ন্যায় হলো, আপনি এগোবেন। কিন্তু কারও নৌকা ফুটো করবেন না।"
কেশু অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
"আমি সারা জীবন ভেবেছি, ন্যায় মানে জেতা। এখন মনে হচ্ছে, ন্যায় মানে জেতা নয়। ন্যায় মানে অন্যকে না হারানো।"
"ঠিক ধরেছেন," বাচু বলল। "আপনি আজ প্রথম পাঠ শিখে ফেললেন।"
কেশুর মুখে একটা হাসি এলো। ষাট বছরের বুড়ো মানুষ। আজ প্রথমবার নিজেকে ছাত্র মনে করল। আর সেটা তার কাছে লজ্জার নয়। গর্বের মনে হলো।
এরপর কেশু নিজের জীবনের একটা ঘটনা বলল।
"বাবা, নদীতে নৌকা চালানোর সময় অনেকবার দেখেছি, কেউ একটু বেশি দূর এগিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য নৌকার পথ আটকে দেয়। তখন ঝগড়া হয়। আমি তখন ভাবতাম, যে আগে ঘাটে পৌঁছাতে পারবে, সে-ই ঠিক। এখন বুঝতেছি, পথটা পরিষ্কার রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
বাচু মাথা নাড়ল।
"এই কথাটা মনে রাখবেন। ব্যক্তিগত সুবিধা আর সামাজিক ন্যায় এক জিনিস না।"
কেশু খাতায় কথাটা লিখে রাখার মতো করে মনে রাখল।
অধ্যায় চার.
ভালো-মন্দের পাঠ
একদিন কেশু এসে বলল, "বাবা, ভালো আর মন্দের পার্থক্য কী? আমি তো দেখি, কেউ ভালো হয়েও দুঃখ পায়। কেউ মন্দ হয়েও সুখে থাকে।"
বাচু বলল, "দাদা, ভালো-মন্দের হিসাব সুখ-দুঃখ দ্বারা হয় না। ভালো-মন্দের হিসাব হয় বিবেক দ্বারা।"
"বিবেক কী?"
"বিবেক হলো আপনার ভেতরের সেই গলা, যা রাতে ঘুমাতে দেয় না। আপনি একটা অন্যায় করলে দিনের বেলা হয়তো লুকাতে পারবেন। কিন্তু রাতে আপনার বিবেক আপনাকে ধরবে।"
কেশু মাথা নাড়ল।
"আমি বুঝলাম। আমার গ্রামে এক লোক ছিল, যে অনেক টাকা জোগাড় করল। কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারত না। আমরা ভাবতাম, সে অসুখে ভুগতেছে। মূলত সে নিজের কাজের ফল নিয়ে অস্থির ছিল।"
"আপনি ঠিক বলেছেন," বাচু বলল। "শরীরের অসুখ ডাক্তার সারায়। বিবেকের অসুখ সারায় শুধু সত্য আর ক্ষমা।"
কেশু সেই রাতে ফিরে যাওয়ার পথে ভাবল, ষাট বছর সে নদীতে কাটিয়েছে। কিন্তু আজ প্রথমবার নিজের বিবেকের দিকে তাকাল।
পরদিন সে আবার বাচুর কাছে এসে বলল, "বাবা, একটা কথা বুঝলাম। মানুষের বাইরে বিচার করার আগে নিজের কাজের দিকে তাকানো দরকার।"
বাচু বলল, "নিজেকে প্রশ্ন করার অভ্যাস থাকলে মানুষ নিজের ভুল দ্রুত ধরতে পারে।"
"তাহলে প্রশ্ন করাই কি শেখার শুরু?"
"হ্যাঁ। প্রশ্ন না থাকলে শেখার দরজাও বন্ধ থাকে।"
অধ্যায় পাঁচ.
সমাজের পাঠ
একদিন কেশু বলল, "বাবা, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আমাদের গ্রামে সকলেই বলে, যে বেশি পড়ে, সে বেশি বোকা হয়। তারা বলে, পড়ালেখা শুধু শহরের কাজে লাগে। তুমি বলো, এটা সত্যি?"
বাচু হাসল।
"দাদা, ধরুন আপনার হাতে একটা কুড়াল আছে। আপনি কুড়াল দ্বারা গাছ কাটেন। এখন যদি কেউ আপনাকে বলেন, কুড়াল ধারালো করলে গাছ কাটা সহজ হয়, আপনি কি ধারালো করবেন না?"
"করব," কেশু বলল।
"পড়ালেখা হলো সেই ধার। আপনি পড়ালেখা না করেও কাজ করতে পারেন। কিন্তু পড়ালেখা করলে কাজটা সহজ হয়। ভুল কম হয়। তাই পড়ালেখা বোকার কাজ না। পড়ালেখা বুদ্ধিমানের হাতিয়ার।"
কেশু অনেকক্ষণ ভাবল।
"তাহলে আমাদের গ্রামের লোকেরা ভুল বলছে?"
"ওরা ভুল বলছে না," বাচু বলল। "ওরা কেবল জানে না। আর না জানার জন্য কেউ অপরাধী হয় না। কিন্তু শিখতে না চাইলে সমস্যা তৈরি হয়। আপনি আজ শিখতে এসেছেন। তাই আপনি ওদের চেয়ে এগিয়ে গেলেন।"
কেশুর চোখে একটা নতুন আলো এলো। সে বুঝল, শেখা মানে শুধু বড় হওয়া না। শেখা মানে জ্ঞানের দরজা খুলে দেওয়া।
সেই দিন কেশু শহরের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিল। তার কাছে শহর মানে আগে ছিল কেবল বড় বিল্ডিং, অফিস আর মানুষের ভিড়। এখন তার কাছে শহর মানে তথ্যের সুযোগ, শেখার সুযোগ এবং নিজের অধিকার বোঝার সুযোগ।
"বাবা," সে বলল, "শহরের মানুষ কি সকলেই বেশি জানে?"
"না," বাচু বলল। "শহরে থাকা আর জ্ঞানী হওয়া এক জিনিস না। আবার গ্রামের মানুষ হওয়া আর অজ্ঞ থাকা এক জিনিস না। জ্ঞান মানুষের শেখার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।"
কেশু মাথা নাড়ল।
এই উত্তরটা তার ভালো লাগল।
অধ্যায় ছয়.
সত্যের পাঠ
একদিন বাচুর চেম্বারে একটা মামলা এলো। এক লোক এসে বলল, তার প্রতিবেশী তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছে। কিন্তু এখন অস্বীকার করতেছে। কেশু পাশে বসে সব শুনছিল।
লোকটা একটা পুরোনো খাতা বের করল। সেখানে কিছু হিসাব লেখা ছিল।
বাচু খাতাটা দেখল। তারপর অপর পক্ষের কথা শুনল।
মামলা শেষ হলে কেশু জিজ্ঞেস করল, "বাবা, তুমি তো জানো না টাকাটা সত্যিই ধার দেওয়া হয়েছিল কি না। তুমি কীভাবে ন্যায় করবে?"
বাচু বলল, "দাদা, আমি ন্যায় করি না। আমি সত্য খুঁজি। যদি সত্যি ধার দেওয়া হয়ে থাকে, সাক্ষী আর প্রমাণ আমার সামনে আসবে। যদি না হয়ে থাকে, তখন মিথ্যাটা ধরা পড়বে। আমার কাজ বিচার করা না। আমার কাজ সত্যকে বের করা।"
"কিন্তু যদি সত্য কোনোদিন না বেরোয়?"
"তখন আইন কাজ করে," বাচু বলল। "আইন সবসময় নিখুঁত নয়। কিন্তু আইন ছাড়া সমাজ থাকতে পারে না। যেমন নদী ছাড়া মাঝি থাকতে পারে না।"
কেশু মাথা নাড়ল।
"তাহলে সত্য খোঁজা আর ন্যায় করা দুইটা আলাদা জিনিস?"
"হ্যাঁ," বাচু বলল। "সত্য হলো একটা জিনিস। ন্যায় হলো তার ব্যবহার। সত্য না জানলে ন্যায় করা অন্ধের মতো হাঁটা।"
কেশু সেই রাতে অনেক ভাবল। তার মনে হলো, এই একটা কথার জন্য সে সারা জীবন অপেক্ষা করছিল।
পরদিন সে নিজের গ্রামের একটা পুরোনো বিরোধের কথা বলল। দুই পরিবারের মধ্যে একটি পুকুরের পানি ব্যবহার নিয়ে সমস্যা ছিল। দুই পক্ষের লোকজন নিজেদের কথা সত্য বলতেছিল।
"বাবা, এই বিরোধ কীভাবে শেষ হবে?"
"দুই পক্ষের কথা শুনতে হবে। পুরোনো নথি দেখতে হবে। যারা বিষয়টা জানেন, তাদের বক্তব্য শুনতে হবে। তারপর যে সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত, সেটাই গ্রহণ করতে হবে।"
"এক পক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত দিলে?"
"তাহলে সত্যের একটা অংশ বাদ পড়বে।"
কেশু বুঝল, শোনা নিজেও একটা শিক্ষা।
অধ্যায় সাত.
ক্ষমার পাঠ
একদিন কেশু রাগ করে এসে বসল।
"বাবা, আজ একটা লোক আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল। আমি তাকে শাস্তি দিতে চাই। তুমি বলো, আমি কী করব?"
বাচু বলল, "দাদা, শাস্তি দুই রকম। এক, যে শাস্তি আপনি নিজে দেবেন। দুই, যে শাস্তি আইন দেবে। আপনি নিজে শাস্তি দিলে সেটা প্রতিশোধ হয়। ন্যায় হয় না। আর আইন দিলে সেটা ন্যায় হয়। প্রতিশোধ হয় না।"
"তাহলে আমি আইনের কাছে যাব?"
"সেটা আপনার সিদ্ধান্ত," বাচু বলল। "কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন। ক্ষমা করা দুর্বলতার লক্ষণ না। ক্ষমা করা শক্তির লক্ষণ। যে ক্ষমা করতে পারে, সে নিজের রাগের ওপর প্রভুত্ব পায়।"
কেশু ভাবল।
"বাবা, আমি ক্ষমা করে দেব। কিন্তু সে যদি আবার খারাপ ব্যবহার করে?"
"তখন আপনি আবার ক্ষমা করবেন কি না, সেটা ভাববেন তখন," বাচু বলল। "কিন্তু আগে থেকে ভয় পেয়ে ক্ষমা না করা ঠিক না। ভয় থেকে করা কোনো কাজই ভালো হয় না।"
কেশু মাথা নাড়ল। সেদিন সে প্রথমবার ক্ষমার স্বাদ পেল। সেই স্বাদ ছিল রাগের চেয়ে অনেক হালকা।
কিন্তু বিষয়টা এখানেই শেষ হলো না।
পরদিন সেই লোক কেশুর কাছে এসে নিজের আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করল। কেশু মন দিয়ে তার কথা শুনল।
"আমি তোমার ওপর রাগ করেছিলাম," লোকটা বলল।
কেশু উত্তর দিল, "রাগের কারণে অন্যের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা ঠিক না। কিন্তু তোমার কথা আমি শুনলাম। ভবিষ্যতে তুমি এই ধরনের আচরণ করিওনা।"
লোকটা মাথা নাড়ল।
কেশু সন্ধ্যায় বাচুর কাছে এসে পুরো ঘটনা বলল।
বাচু বলল, "আপনি আজ শুধু ক্ষমা করেননি। আপনি নিজের সীমাটাও পরিষ্কার করেছেন। ক্ষমা মানে অন্যায়কে অনুমোদন করা না।"
কেশু কথাটা খাতায় লিখে রাখল।
অধ্যায় আট.
পরিশ্রমের পাঠ
কেশু একদিন বলল, "বাবা, আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। তুমি এত পড়লে কী করে? আমার বয়সে পড়া কি সহজ?"
বাচু হাসল।
"দাদা, পড়া সহজ নয়। কিন্তু অসম্ভবও নয়। আমি রোজ ভোর থেকে পড়তাম। রাত পর্যন্ত পড়তাম। আমার বাবা মাঝি ছিল। আমি তাকে দেখেছি, ভোরে নদীতে যেত। রাতে ফিরত। পরিশ্রম না করলে সে বাঁচত না। পড়ালেখাও একই।"
"আমার ষাট বছর বয়সে পড়া কি সম্ভব?"
"আপনি অক্ষর চিনতে চান?" বাচু জিজ্ঞেস করল।
কেশু একটু থামল। তারপর বলল, "চাই, বাবা। আমার ছোটবেলায় পড়ার সুযোগ হয়নি। আজ যদি তুমি শেখাও, আমি শিখব।"
"তাহলে কাল থেকে শুরু করি," বাচু বলল। "প্রথমে আপনার নাম। তারপর অ, আ, ক, খ।"
কেশুর চোখ ভিজে এলো। ষাট বছর বয়সে একটা বুড়ো মাঝি প্রথমবার অক্ষর শিখতে রাজি হলো।
পরদিন বাচু তার জন্য একটা খাতা এবং পেন্সিল তৈরি করে রাখল। কেশু সেই খাতার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
"বাবা, এই খাতাটা কি আমার?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে আজ থেকেই এটা আমার পাঠশালা।"
"ঠিক তাই," বাচু বলল।
কেশু প্রথম দিন শুধু নিজের নামের প্রথম অক্ষর লিখল। দ্বিতীয় দিন আরও দুইটা অক্ষর লিখল। তৃতীয় দিন ভুল করল।
"আমি পারতেছি না," কেশু বলল।
"আপনি পারছেন," বাচু বলল। "শুধু সময় লাগতেছে।"
"আমার হাত কাঁপে।"
"হাত কাঁপলে আবার লিখবেন।"
"আমি ভুল করলে?"
"আবার লিখবেন।"
কেশু হাসল।
"তুমি বোধহয় আমাকে সহজে ছাড়বা না।"
"না।"
অধ্যায় নয়.
অক্ষরের পাঠ
পরদিন থেকে কেশু আর শুধু প্রশ্ন করতে এলো না। সে পড়তে শিখতে এলো।
বাচু তার জন্য একটা মোটা খাতা এবং একটা পেন্সিল আনল। কেশুর হাত কাঁপত। কারণ ষাট বছরের হাত আর কলম ধরায় অভ্যস্ত নয়। প্রথমে সে আঁকিবুঁকি কাটল। তারপর ধীরে ধীরে অ, আ, ক, খ ফুটে উঠল।
বাচু ধৈর্য ধরে শেখাল। কেশু ভুল করলে বকা দিল না।
"আবার লিখুন। ভুল করলে লজ্জা নেই। ভুল না শুধরালে লজ্জা।"
কেশু রোজ আসত। তার হাত ধীরে ধীরে সোজা হলো। সে প্রথমে নিজের নাম লিখল। তারপর বাক্য লিখল। তারপর ছোট গল্প লিখল।
একদিন সে একটা বাক্য লিখল।
"নদী বয়ে চলে, আমি বয়ে চলি।"
বাচু বাক্যটা পড়ে হাসল।
"দাদা, আপনি আজ লেখক হয়ে গেলেন।"
কেশু সেই কাগজটা বুকে চেপে ধরল। যেন সেটা কোনো টাকা নয়। একটা সোনার টুকরো।
এরপর বাচু তাকে সংবাদপত্রের ছোট ছোট শিরোনাম পড়তে দিল। কেশু ধীরে ধীরে শব্দ চিনতে লাগল। শহরের বিভিন্ন অফিসে লেখা নির্দেশনা পড়তে শিখল। নিজের জমির কাগজে লেখা শব্দ বুঝতে শিখল।
একদিন একটা সরকারি নোটিশের মতো একটি কাগজ তার হাতে এলো।
"বাবা, এই কথাটা আমি পড়তে পারতেছি।"
বাচু বলল, "পড়ুন।"
কেশু ধীরে ধীরে পড়ল।
তারপর বলল, "আমি এখন অন্যের কাছে কাগজ পড়ে শোনানোর জন্য নির্ভর করতে হবে না।"
বাচু বলল, "এইটাই শিক্ষার একটা বড় সুবিধা। নিজের চোখ দ্বারা তথ্য বুঝতে পারা।"
কেশু সেদিন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর বলল, "আমি ষাট বছর পরে নিজের চোখ খুললাম।"
অধ্যায় দশ.
কেশুর ভুল
একদিন কেশু রাগ করে বাচুর কাছে এলো। তার গ্রামে কেউ তার একটা কথায় কটু মন্তব্য করেছিল।
"বাবা," কেশু বলল, "আমি তাকে কাগজে লিখে দেব। সে খারাপ মানুষ। তুমি আমাকে অক্ষর শিখিয়েছ। এখন আমি তাকে বদনাম করব।"
বাচু ধীরে মাথা নাড়ল।
"দাদা, থামুন। আমি আপনাকে অক্ষর শিখিয়েছি ভালো লিখতে। খারাপ লিখতে নয়।"
"কিন্তু সে তো খারাপ ব্যবহার করল।"
"সে খারাপ ব্যবহার করলে সেটা তার অন্যায়। আপনি খারাপ লিখলে সেটা আপনার অন্যায়। দুইটা অন্যায় মিলে কখনো ন্যায় হয় না।"
কেশু হাত থেকে পেন্সিল নামিয়ে রাখল। তার মুখটা নুয়ে পড়ল।
"আমি ভুল করেছি, বাবা।"
"ভুল করা মানুষের ধর্ম," বাচু বলল। "ভুল না শুধরানো অন্যায়ের ধর্ম। আপনি শুধরে ফেললেন। তাই আপনি এখন ভালো ছাত্র।"
সেই রাতে কেশু বুঝল, জ্ঞান শুধু জানার জন্য নয়। জ্ঞান নিজেকে সামলানোর জন্য।
পরদিন কেশু নিজের লেখা কাগজটা নিয়ে আবার বাচুর কাছে এলো।
"আমি এই কথাগুলো লিখেছিলাম। এখন বুঝতেছি, এগুলো লেখা ঠিক হয়নি।"
"কাগজটা ছিঁড়ে ফেলবেন?"
"না।"
"তাহলে?"
"আমি এর নিচে লিখব, আমি কেন এই কথাগুলো লিখেছিলাম এবং কেন এগুলো ঠিক হয়নি।"
বাচু কিছুক্ষণ কেশুর দিকে তাকিয়ে রইল।
"এটা আপনার নিজের শিক্ষা। এটা আপনি নিজেই লিখেছেন।"
কেশু লিখল।
তার হাত আর আগের মতো কাঁপল না।
অধ্যায় এগারো.
শিক্ষক ও ছাত্র
শীত এলো।
কেশু রোজ আসত। তার খাতা হাতে থাকত। বাচু রোজ শেখাত। ধৈর্য ধরে শেখাত। দুইজনের সম্পর্ক বদলে গেল।
একদিন যে কেশু বাচুকে জ্ঞান দিতে এসেছিল, আজ সে বাচুর ছাত্র। আর একদিন যে বাচু কেশুকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, আজ সে তার শিক্ষক।
একদিন কেশু বলল, "বাবা, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি ভাবতাম, বয়স হলে মানুষ সব জেনে যায়। এখন বুঝি, বয়স বাড়লে জানা বাড়ে না। অভিজ্ঞতা বাড়ে। জানা আসে শেখার থেকে। আর শেখার কোনো বয়স নেই।"
বাচু হাসল।
"দাদা, আজ আপনি আমাকে একটা নতুন কথা শেখালেন।"
"আমি তোমাকে শেখালাম?" কেশু অবাক হলো।
"হ্যাঁ। আপনি শিখলেন। তাই আমিও শিখলাম। শিক্ষক যে কেবল শেখায়, তা নয়। শিক্ষক ছাত্রের কাছ থেকেও শেখে। সেটাই সত্যিকারের পাঠশালা।"
কেশু মাথা নাড়ল। তার চোখে তখন এক ধরনের শান্তি। যেন সারা জীবন নদীতে ভেসে অবশেষে তীরে পৌঁছেছে।
এরপর কেশু বাচুকে আরও অনেক প্রশ্ন করতে শুরু করল।
"শিক্ষক কি কখনো ভুল করতে পারে?"
"অবশ্যই পারে।"
"তাহলে শিক্ষককে প্রশ্ন করা যাবে?"
"প্রশ্ন করা যাবে।"
"শিক্ষকের কথা ভুল মনে হলে?"
"কারণ জানতে হবে।"
"তাহলে ছাত্রের নিজের চিন্তাও দরকার?"
"অবশ্যই দরকার।"
কেশু হাসল।
"তাহলে আমি আজ সত্যিই ছাত্র।"
বাচু বলল, "আপনি ছাত্র ছিলেন প্রথম দিন থেকেই। শুধু তখন সেটা বুঝতেন না।"
অধ্যায় বারো.
শেষ পাঠ
বসন্ত এলো।
একদিন কেশু এলো না। বাচু অপেক্ষা করল। পরদিনও এলো না। বাচু তার খোঁজে গেল।
নেউলতলার ওপারে নদীর ধারে একটা ছোট বিল্ডিংয়ের এক কক্ষে কেশু শুয়ে ছিল। তার পাশে ছিল সেই খাতা। আর একটা পেন্সিল।
"বাবা," কেশু আস্তে বলল, "আজ আসতে পারিনি। শরীর আর সাড়া দেয় না।"
বাচু তার পাশে বসল। তার হাত ধরল।
"তোমার কাছ থেকে আমি অনেক শিখলাম," কেশু বলল। "অক্ষর শিখলাম। ন্যায় শিখলাম। সত্য শিখলাম। কিন্তু সবচেয়ে বড় জিনিসটা শিখলাম আজ।"
"কী?"
"শিখলাম, যে নিজেকে ছাত্র বলে মানে, সে কখনো বুড়ো হয় না। বয়স বাড়ে। কিন্তু মন তাজা থাকে। আমি আজ তোমার কাছে ছাত্র। কালও থাকব।"
বাচুর চোখ ভিজে এলো।
কেশু খাতাটা বাচুর হাতে দিলো।
"এই খাতায় আমার শেষ লেখা আছে। পড়ে শোনাও।"
বাচু খাতা খুলল। শেষ পাতায় কেশুর হাতের অক্ষরে লেখা:
"নদী বয়ে চলে, আমি বয়ে চলি, শেখার কোনো শেষ নেই।"
বাচু পড়ে শোনাল।
কেশু হাসল। তারপর সে চোখ বুজল। নদীর বাতাস তার কক্ষে এসে বসল।
বাচু অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না।
খাতাটা সে বুকের কাছে ধরে রাখল।
সেই দিন তার মনে হলো, একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে অক্ষর শিখিয়েছিল। কিন্তু সেই ছাত্র শিক্ষককে শেখাল, জ্ঞান শুধু বইয়ের মধ্যে থাকে না। মানুষের প্রশ্নের মধ্যেও থাকে।
অধ্যায় তেরো.
পাঠশালা
কেশু চলে যাওয়ার পর বাচু প্রতিদিন সন্ধ্যায় বেঞ্চে বসে।
কিন্তু এবার সে একা বসে না।
তার পাশে অন্য মানুষ বসে। কেউ প্রশ্ন করে। কেউ শিখতে চায়। কেউ শুধু শুনতে চায়। বাচু সকলকে বসায়। চা দেয়। শেখায়।
সে কেশুর কথা মনে করে।
সেই প্রথম সন্ধ্যা। কেশু তাকে জ্ঞান দিতে এসেছিল। আর সে বলেছিল, আমি অনার্স পাস করেছি। মাস্টার্স পাস করেছি। এলএলবি পাস করেছি।
আজ বাচু ভাবে, সেই কথাটা ঠিক ছিল। কিন্তু অসম্পূর্ণ।
জ্ঞান শুধু নিজের জন্য জমা রাখার জিনিস নয়। জ্ঞান বিলিয়ে দেওয়ার জিনিস।
একদিন একটা ছেলে এলো। বয়স বিশ। সে বলল, "আমি পড়ালেখা করি। আমি সব জানি। আপনি আমাকে কী শেখাবেন?"
বাচু হাসল। সে কেশুর শেখার ইচ্ছাটা মনে করল।
"আমি তোমাকে কিছু শেখাব না," বাচু বলল। "তুমি আমাকে শেখাও। বলো, তুমি কী জানো।"
ছেলেটা একটু অবাক হলো। তারপর সে বলতে শুরু করল।
আর বাচু শুনতে শুরু করল।
কারণ সে শিখেছিল, শিক্ষক হওয়ার আগে ছাত্র হতে হয়। আর ছাত্র হওয়ার আগে শুনতে হয়।
সেদিনের পর থেকে বাচুর চেম্বারের পাশের কক্ষটা সন্ধ্যার পাঠশালা হয়ে গেল।
কেশুর পুরোনো খাতাটা সেখানে রাখা হলো। কেউ খাতাটা নিতে পারত না। শুধু দেখতে পারত।
একদিন একজন স্টুডেন্টস এসে খাতাটা দেখল।
"এই লেখাটা কার?"
বাচু বলল, "একজন ছাত্রের।"
"তিনি এখন কোথায়?"
বাচু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
"তিনি আর এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তার লেখা আছে।"
স্টুডেন্টস খাতার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তিনি কি পড়ালেখা জানতেন?"
"শুরুতে জানতেন না। পরে শিখেছিলেন।"
"কত বয়সে?"
"ষাট বছর বয়সে।"
ছেলেটা বিস্মিত হলো।
"তাহলে শেখার জন্য বয়স বাধা না?"
"না।"
"তাহলে আমরা যারা কম বয়সে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছি, আমাদের কী করা উচিত?"
"শেখার সুযোগকে মূল্য দিতে হবে।"
সেই কথাটা শুনে ছেলেটা খাতা বন্ধ করল।
পরের দিন সে আবার এলো।
তারপর আরও কয়েকজন এলো।
কেউ হিসাব শিখল। কেউ চিঠি লেখা শিখল। কেউ কাগজ পড়া শিখল। কেউ নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা শিখল। কেউ অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা শিখল।
বাচু কাউকে নিজের মতো হতে বলল না।
সে শুধু বলল, "নিজের চিন্তা নিজে করো। প্রশ্ন করো। তথ্য যাচাই করো। ভুল হলে ঠিক করো।"
এক সন্ধ্যায় সেই প্রথম দিনের মতো নদীর ওপর আলো পড়ল।
বাচু বেঞ্চে বসে ছিল।
তার সামনে কেশুর খাতা।
একজন নতুন ছাত্র এসে বলল, "বাবা, আমি একটা প্রশ্ন করতে পারি?"
বাচু খাতা বন্ধ করল।
"অবশ্যই।"
"শিক্ষা কি শুধু বই পড়ার বিষয়?"
বাচু নদীর দিকে তাকাল।
"না। শিক্ষা হলো বোঝার বিষয়। বই তার একটা পথ। মানুষের অভিজ্ঞতা আরেকটা পথ। প্রশ্ন আরেকটা পথ। নিজের ভুল থেকে শেখাও একটা পথ।"
ছেলেটা বলল, "তাহলে আপনার পাঠশালার নাম কী?"
বাচু একটু হাসল।
"এটার নাম কেশুর পাঠশালা।"
"কেন?"
বাচু উত্তর দিল, "কারণ প্রথম ছাত্র আমাকে শিখিয়েছে, শেখার দরজা কারও জন্য বন্ধ থাকে না।"
নদীর ওপর দিয়ে বাতাস এলো।
সন্ধ্যার শেষ আলোটা পানিতে লম্বা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ঘাটে একটা নৌকা বাঁধা ছিল। ঢেউয়ে দুলতেছিল।
বাচু কেশুর খাতার শেষ পাতাটা আরেকবার খুলল।
সেখানে লেখা ছিল:
"নদী বয়ে চলে, আমি বয়ে চলি, শেখার কোনো শেষ নেই।"
বাচু খাতাটা বন্ধ করল।
তার সামনে তখন নতুন ছাত্ররা বসে ছিল।
কেউ প্রশ্ন করতেছিল। কেউ লিখতেছিল। কেউ শুনতেছিল।
বাচু বুঝল, কেশুর পাঠ শেষ হয়নি।
একজন মানুষ চলে গেলেও তার শেখার ইচ্ছা অন্য মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারে। একটি ছোট খাতা একটা বড় পাঠশালার সূচনা করতে পারে। আর একজন শিক্ষকও সারাজীবন ছাত্র হয়ে থাকতে পারে।
সেই সন্ধ্যায় বাচু নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, "কেশু দাদা, আপনার পাঠশালা চলতেছে।"
তারপর সে নতুন ছাত্রের দিকে তাকাল।
"আপনার প্রশ্নটা বলেন।"
ছাত্রটি প্রশ্ন করতে শুরু করল।
বাচু মন দিয়ে শুনতে শুরু করল।
নদী বয়ে চলল।
পাঠশালাও চলতে থাকল।
(সমাপ্ত) ©️All Right Reserved by Junayed Ashrafur Rahman
24°33'58.6"N 90°41'30
My home Location ✒ https://goo.gl/maps/RoKi3ekrhkm5PAHPA , But I don't live here. Rented out to other peo
Nandail Municipality, Mymensingh, Banglad
Junayedmn1@gmail
My Writings ✒ https://www.blogger.com/profile/1173462471832872
702) My success in writing. (লেখালেখিতে আমার সাফল্য।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2023/06/702-my-success-in-writing-written-by.
707)After the fantasy of ministry.(মন্ত্রিত্বের ফ্যান্টাসির পরে।)– Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://mytimemyexperiencesjunayedmn1.blogspot.com/2023/06/707after-fantasy-of-ministry-written-by.
636) About the intellectual property of my writing.(আমার লেখার মেধাস্বত্ব সম্পর্কে।)— Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://parg.co/
637)Win prizes.(পুরস্কার জিতুন।) - Written by Junayed Ashrafur ✒ https://literatureforalljunayedmn1.blogspot.com/2022/10/637win-prizes-written-by-junayed.
667)Case against AI ChatGPT. (এআই চ্যাট জিপিটির বিরুদ্ধে মামলা।) – Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒ https://lawforjusticejunayedmn1.blogspot.com/2023/02/667case-against-chat-gpt-written-by.html http://ow.ly/Zawy104
#Intellectualproperty #Literature #Law #Contract #Writing #Wisd omu7kOhtmlUdXGhtmlhtml3069.comesh.ple..4"E