315) (Story_13) New Year's Feast. (নববর্ষের খাওয়া।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman


315) (Story_13) New Year's Feast. (নববর্ষের খাওয়া।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman https://mywritingsjunayedmn1.blogspot.com/2019/12/about-me-junayed-ashrafur-rahman.html ✒ 

🌟 The video of how to translate my writings into your language.(আমার লেখাগুলো যেভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে পড়বেন,সেটার ভিডিও।) https://youtube.com/shorts/cB4L80u1IIc?si=jJV-G14OIP_qQeLA 🌟https://www.facebook.com/share/v/1GuWS35Joi/ 

পর্ব ১

ভোরের আলো তালতলি বাজারের মাটির রাস্তাকে ধূসর করে দিয়েছিল। বাজারের উত্তর পাশে পুরনো বটগাছ ছিল। সেই বটগাছের বয়স কেউ জানে না। দাদার দাদার আমল থেকেই গাছটা আছে। শিকড়গুলো মাটি ফুঁড়ে উপরে উঠে এসেছিল। গাছের নিচে টিনের ছাউনির ঘর ছিল। ঘরের সামনে দুইটা কাঠের বেঞ্চ ছিল। বেঞ্চের একটাতে কিশু বসেছিল। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। মাথার চুলে পাক ধরেছে। এলাকার মানুষ কিশুকে নেতা বলে মানত। কিশু নিজে কখনো নির্বাচন করেনি। তবুও বিচার-সালিশ, মেলা, খাওয়া-দাওয়া সব কিশুর কথায় হত।

তালতলি বাজারের আশেপাশে ৫টা গ্রাম ছিল। পূর্বে নদীর পাড়ের গ্রাম। পশ্চিমে মাঠের গ্রাম। উত্তরে জঙ্গলের গ্রাম। দক্ষিণে হাটের গ্রাম। আর মাঝখানে তালতলি বাজার। সপ্তাহে দুইদিন হাট বসত। মঙ্গলবার আর শুক্রবার। হাটের দিন দূর দূর থেকে মানুষ আসত। চাল, ডাল, তরকারি, কাপড় বিক্রি হত। কিশুর ঘরটা বাজারের সবচেয়ে পুরনো ঘর।

আজ পহেলা বৈশাখ। ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালি দিয়ে তারিখটা চিহ্নিত ছিল। অন্যান্য বছরে এই দিনে ঘরের সামনের খোলা জায়গায় চাটাই বিছানো হত। ১০টা ডেগে ভাত রান্না হত। মুরগির মাংস, আলুর দম, ডাল। তরকারির গন্ধ বাতাসে ভাসত। গরিব-দুঃখী সবাইকে ডেকে পেট ভরে খাওয়ানো হত। কেউ ফিরে যেত না। ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরে আসত। বুড়োরা পান চিবাতে চিবাতে গল্প করত। কিশুর এই নিয়ম ১২ বছর ধরে ছিল।

কিন্তু আজ সবকিছু চুপচাপ ছিল। চাটাই নেই। ডেগ নেই। উনুনে আগুন নেই। শুধু বটগাছের পাতা নড়ার শব্দ হচ্ছিল। কাক ডাকছিল। দূরে কোথাও ঢোলের শব্দ ভেসে আসছিল। অন্য মহল্লায় মেলা বসেছিল।

বাচু রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসেছিল। বাচুর বয়স ২৮। গায়ে পুরনো পাঞ্জাবি। পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল। বাচু কিশুর ছায়ার মতো ছিল। ছোটবেলা থেকে কিশুর সাথে বাচু ঘুরত। কিশু বাচুকে নিজের ছেলের মতো দেখত। বাচুর বাপ মারা গিয়েছিল বাচু যখন ১০ বছরের। তারপর থেকে কিশুর ঘরেই বাচু থাকত। বাচু এসে বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিশুর মুখের দিকে বাচু তাকিয়েছিল। কিশু চোখ বন্ধ করে বসে ছিল।

বাচু বলল, "নেতা, এই নববর্ষের প্রথম দিনে তো খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন না।"

কিশু চোখ খুলল। দূরের মাঠের দিকে তাকাল। মাঠে কেউ ছিল না। কিশু জবাব দিল, "সামনে নির্বাচন। তাই খাওয়ার ব্যবস্থা করিনি।"

বাচু অবাক হয়েছিল। বাচু এক পা সামনে এগিয়েছিল। বাচু বলল, "নির্বাচন আছে, তাই আরও বেশি করে খাওয়াবেন। মানুষজন তো আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে।"

হাওয়ায় কিশুর সাদা পাঞ্জাবি নড়ছিল। কিশু মাথা নাড়ল। কিশু বলল, "আমি তো নির্বাচন করব না।"

বাচু বুঝতে পারেনি। বাচু কপাল কুঁচকাল। বাচু বলল, "তাতে কী হয়েছে? আপনার টাকা আছে, আপনি খাওয়াবেন। মানুষজন খুশি হবে।"

কিশু বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। ঘরের পেছনের পুকুরের দিকে কিশু হাঁটল। পুকুরের পানি স্থির ছিল। পানিতে আকাশের ছায়া পড়েছিল। পুকুরের পাড়ে কয়েকটা কচুরিপানা ভাসছিল। কিশু পানির দিকে তাকিয়ে বলল, "এই বছর নির্বাচনের কারণে খাওয়াব না।"

বাচু পিছু পিছু গিয়েছিল। বাচু পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়েছিল। বাচুর মনে খটকা লেগেছিল। বাচু বলল, "নেতা, বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলেন।"

কিশু লম্বা নিশ্বাস নিল। কিশু বলল, "এই বছর সামনে নির্বাচন আছে। তাই সকল প্রার্থীরাই ভোটের জন্য ব্যস্ত। টাকা ছড়াচ্ছে। ভাতের হোটেল খুলছে। আমি নির্বাচন করব না। কিন্তু যদি প্রতি বছরের মতো এবারও নবর্ষের খাবার খাওয়াই, তাহলে অন্যরা মনে করবে আমি এবার নির্বাচন করব। তাই ওরা আমাকে ওদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করবে। এভাবে নির্বাচন না করেও অন্যদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে হবে। তাই এই বছর নববর্ষের খাওয়া হবে না।"

কথা শেষ করে কিশু চুপ হয়ে গেল। বটগাছের ছায়া কিশুর মুখের অর্ধেক ঢেকে দিয়েছিল। পুকুরের পানিতে কিশুর ছায়া কাঁপছিল।

বাচু কিছুক্ষণ কোনো কথা বলেনি। বাচু মাটির দিকে তাকিয়েছিল। তারপর বাচু মাথা ঝাঁকিয়েছিল। বাচুর চোখে শ্রদ্ধা ফুটে উঠেছিল। বাচু বলল, "বুঝলাম। এই জন্যই তো আপনাকে অন্যদের চেয়ে বড় নেতা মনে করি।"

বাজারের দিক থেকে ঢোলের শব্দ ভেসে আসছিল। অন্য মহল্লায় নববর্ষের মেলা বসেছিল। কিন্তু কিশুর ঘরের সামনে নীরবতা ছিল।

বাচু আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে আজ কী করবেন নেতা?"

কিশু পুকুরের পাড়ের ঘাস ছিঁড়ছিল। কিশু বলল, "আজ ঘরে বসে থাকব। কেউ এলে বুঝিয়ে বলব।"

বাচু মাথা নাড়ল। বাচু বলল, "মানুষজন হয়তো রাগ করবে।"

কিশু হাসল না। কিশু বলল, "রাগ করলে করুক। সত্যের খাতিরে রাগ সহ্য করা লাগে।"

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছিল। রোদের তাপ বাড়ছিল। বটগাছের নিচেও গরম লাগছিল। দূর থেকে দুইটা ছেলে দৌড়ে এসেছিল। ছেলেদের হাতে রঙিন কাগজের পতাকা ছিল। ছেলে দুইটার বয়স ১০-১২ হবে। গায়ে নতুন জামা।

ছেলে দুইটা এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল। ওরা চারপাশে খাবারের আয়োজন খুঁজছিল। না পেয়ে ওরা কিশুর দিকে তাকিয়েছিল।

একটা ছেলে সাহস করে জিজ্ঞেস করল, "কাকা, খাওয়া কখন?"

কিশু ছেলেটার মাথায় হাত রাখল। কিশু বলল, "আজ খাওয়া নেই রে বাপ। সামনের বছর হবে।"

ছেলে দুইটার মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। ওরা কিছু না বলে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় ওরা ফিসফিস করে বলছিল, "এবার খাওয়া নাই।"

বিকেলের দিকে আরও ৩-৪ জন মানুষ এসেছিল। ওরা সবাই খালি হাতে ফিরে গিয়েছিল। কেউ কেউ বিড়বিড় করে কথা বলছিল। কেউ কেউ কিশুর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল।

সন্ধ্যা নামছিল। বটগাছের নিচে ল্যাম্প জ্বালানো হলো না। অন্ধকারে কিশু একা বসে ছিল। বাচু পাশে বসে ছিল।

বাচু ফিসফিস করে বলল, "নেতা, আপনি ঠিক করছেন তো?"

কিশু আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে তারা উঠেছিল। কিশু বলল, "সময়ই বলে দেবে ঠিক না ভুল।"

রাত বাড়ছিল। তালতলি বাজারের সব দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু কিশুর ঘরের সামনে নীরবতা আর বটগাছের পাতার শব্দ ছিল।

পর্ব ২ 

পরদিন সকালে বাজারের চায়ের দোকানে মানুষজন জড়ো হয়েছিল। বেঞ্চগুলো ভরে গিয়েছিল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ওরা কিশুর কথা বলছিল। দোকানদার হারু কাপ ধুচ্ছিল আর কান পেতে শুনছিল। চুলার আগুনে চায়ের পাতিল ফুটছিল।

ছতি নামের একজন বলল, "কিশু নেতা এবার খাওয়াল না কেন? ১২ বছর ধরে তো খাওয়ায়।"

আরেকজন জবাব দিল, "নির্বাচনের ভয় পেয়েছে।"

ছতি মাথা নাড়ল। ছতি বলল, "বছরের পর বছর খাওয়াইছে। এবার বন্ধ করল। আমাদের ছেলেপুলেরা সকাল থেকে বসে ছিল।"

দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা বুড়ো কেশু কাশি দিল। কেশুর দাঁতে পান। কেশু বলল, "রাজনীতি বোঝা কঠিন। ওরা যা করে সব হিসাব করে।"

চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে বাচু যাচ্ছিল। কথা কানে যাওয়ার পর বাচু থামল। বাচু বলল, "নেতা খাওয়াননি কারণ উনার নিজের হিসাব আছে।"

ছতি বাচুর দিকে তাকাল। ছতি বলল, "কিসের হিসাব?"

বাচু জবাব দিল, "সামনে নির্বাচন। কিশু নেতা নির্বাচন করবেন না। কিন্তু খাওয়ালে সবাই ভাববে উনি করবেন। তাই অন্য প্রার্থীরা ওকে শত্রু ভাববে।"

কেশু দাঁত দিয়ে পান চিবাচ্ছিল। কেশু বলল, "তাহলে ভালোই করছে। ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নাই।"

বাচু আর কথা না বাড়িয়ে হেঁটে চলে গিয়েছিল। বাচুর পেছনে ফিসফিসানি রয়ে গিয়েছিল। হারু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "নেতার মাথা আছে।"

তিনদিন পর চরপাড়া থেকে কয়েকজন লোক এসেছিল। তাদের হাতে মিষ্টির প্যাকেট ছিল। ওরা কিশুর ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিল। রোদে ওদের কপাল ঘামছিল।

একজন সামনে এসে বলল, "নেতা, নববর্ষের মিষ্টি নিয়ে আসছি।"

কিশু ঘর থেকে বের হয়েছিল। কিশু মিষ্টির প্যাকেটের দিকে তাকাল। কিশু বলল, "ফেরত নিয়ে যাও।"

লোকটা অবাক হয়েছিল। লোকটা বলল, "কেন নেতা? রাগ করছেন?"

কিশু দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়েছিল। কিশু বলল, "এবার কোনো অনুষ্ঠান হবে না।"

লোকগুলো মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিল। ওরা মিষ্টি নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় ওরা বলাবলি করছিল, "নেতার মেজাজ খারাপ।"

সপ্তাহ ঘুরল। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলো। তালতলি বাজারসহ আশেপাশের ৫টা গ্রামে পোস্টার পড়ল। দেয়ালে দেয়ালে নতুন মুখ, পুরনো মুখ। মাইকে সকাল-সন্ধ্যা গান বাজত। সবাই মাঠে নামল।

কিশু কোনো পোস্টারে ছিল না। কিশু কোনো মিছিলে ছিল না। কিশু প্রতিদিন সকালে বটগাছের নিচে বসত। বিকেলে পুকুরপাড়ে যেত। মাছ ধরত না। শুধু পানির দিকে তাকিয়ে থাকত।

বাচু প্রতিদিন খবর নিয়ে আসত। বাচু বলত, "অমুক প্রার্থী টাকা ছড়াচ্ছে। তমুক প্রার্থী ভাত খাওয়াচ্ছে।"

কিশু শুনত। কিশু মাথা নাড়ত। কিশু কিছু বলত না।

নির্বাচনের এক মাস আগে রাতের বেলা কিশুর ঘরে ঢিল পড়ল। দুইটা ঢিল। জানালার কাঁচ ভাঙল না। শব্দ হলো।

বাচু পরদিন সকালে এসে বলল, "নেতা, কারা করল?"

কিশু ভাঙা ঢিল হাতে নিল। কিশু বলল, "যারা ভাবছে আমি প্রতিদ্বন্দ্বী।"

বাচু রাগল। বাচু বলল, "আমরা পাল্টা কিছু করব?"

কিশু ঢিলটা পুকুরে ফেলল। কিশু বলল, "কিছু করতে হবে না। চুপ করে থাকো।"

নির্বাচনের দিন সকাল থেকে বৃষ্টি নামল। রাস্তা কাদা হলো। তবুও মানুষ লাইনে দাঁড়াল। ছাতা মাথায় ভোট দিল।

রাত ১০টায় রেজাল্ট এলো। নতুন প্রার্থী ধনু জিতল। ৩২০০ ভোটের ব্যবধানে। পুরনো প্রার্থী হারল।

খবরটা বাচু দৌড়ে এসে দিল। বাচু হাঁপাচ্ছিল। বাচু বলল, "ধনু জিতেছে নেতা।"

কিশু চোখ বন্ধ করল। কিশু বলল, "হোক।"

পর্ব ৩

জিতে যাওয়ার পরদিন ধনুর সমর্থকরা মিছিল করল। ঢোল বাজল। মিষ্টি বিতরণ হলো। লাল-নীল পতাকা উড়ল। মিছিল কিশুর ঘরের সামনে দিয়ে গেল। কেউ কিশুর দিকে তাকাল না। কেউ স্লোগান দিল না।

ধনু একদিন কিশুর সাথে দেখা করতে এলো। ধনুর সাথে ৪ জন লোক ছিল। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। হাতে ঘড়ি।

ধনু হাসতে হাসতে বলল, "কিশু ভাই, আপনি তো কিছুই করলেন না। সরে দাঁড়ানোর জন্য ধন্যবাদ।"

কিশু চেয়ার এগিয়ে দিল। কিশু বলল, "বসেন।"

ধনু বসল। ধনু বলল, "আপনি সরে না দাঁড়ালে আমার কষ্ট হতো। আপনি এলাকার বড় মানুষ।"

কিশু চুপ ছিল। কিশু এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। কিশু বলল, "পানি খান।"

ধনু পানি খেয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় ধনু বলল, "দরকার লাগলে ডাকব। এলাকার উন্নয়ন করতে হবে তো।"

ধনু চলে যাওয়ার পর বাচু দরজা বন্ধ করল। বাচু বলল, "নেতা, উনি আপনাকে ব্যবহার করল।"

কিশু বলল, "ব্যবহার করতে দাও।"

মাস ঘুরল। নতুন সরকারের কাজ শুরু হলো। রাস্তা হলো না। স্কুলের টিন বদলাল না। হাসপাতালে ডাক্তার এলো না। শুধু মিটিং হলো। ছবি তোলা হলো।

মানুষজন আবার কিশুর কাছে আসা শুরু করল। ওরা বলত, "আগে তো আপনি খাওয়াতেন। এখন কেউ খাওয়ায় না। ধনু মিয়াকে পাওয়া যায় না।"

কিশু সবাইকে চা খাওয়াত। কিশু বলত, "সরকারের কাছে চাও।"

কিন্তু সরকারের লোক এলো না।

*পর্ব ৪*

বর্ষা এলো। পুকুরের পানি বাড়ল। তালতলি বাজারের রাস্তা কাদা হলো। ছেলেরা কাদায় ফুটবল খেলত। বুড়োরা গালি দিত।

একদিন রাতে বাচু জ্বর নিয়ে এলো। বাচুর গা গরম ছিল। কাঁপছিল। কিশু সারাত বাচুর মাথায় পানি দিল। ভেজা গামছা দিয়ে গা মুছাল।

ভোরের দিকে জ্বর কমল। বাচু চোখ খুলল। বাচু বলল, "নেতা, আপনি আমাকে বাঁচালেন।"

কিশু বাচুর কপালে হাত রাখল। কিশু বলল, "ঘুমাও।"

বাচু ঘুমিয়ে পড়ল। কিশু বাইরে এসে বসল। আকাশ পরিষ্কার ছিল। পাখি ডাকছিল।

আরও ৬ মাস কেটে গেল। মানুষজন কিশুকে ভুলতে বসল। ধনু মাঝে মাঝে এলো। ছবি তুলল। প্রতিশ্রুতি দিল। তারপর চলে গেল।

একদিন ধনু এসে বলল, "কিশু ভাই, আগামী বছর নবর্ষে আপনি আয়োজন করেন। আমি খরচ দেব। ২ লাখ টাকা দেব।"

কিশু ধনুর দিকে তাকাল। কিশু বলল, "আমি আয়োজন করব না।"

ধনু হাসি থামাল। ধনু বলল, "কেন?"

কিশু বলল, "আমার নিয়ম আমার কাছে।"

ধনু রেগে চলে গেল। তারপর থেকে ধনু আর এলো না।

*পর্ব ৫*

বছর ঘুরে আবার পহেলা বৈশাখ এলো। এবারও কিশুর ঘরের সামনে চাটাই পাতা হলো না। ডেগ বসানো হলো না। উনুনে আগুন জ্বলল না।

কিন্তু সকাল ১০টায় ২০ জন মানুষ নিজে থেকে এলো। তাদের হাতে চাল, ডাল, তেল, মসলা ছিল। বউ-ঝিরাও এলো।

একজন সামনে এসে বলল, "নেতা, আমরা সবাই মিলে রান্না করব। আপনি শুধু বসে থাকেন।"

কিশু অবাক হলো। কিশুর গলা ধরে এলো। কিশু বলল, "কারা বলল তোমাদের?"

লোকটা বলল, "কেউ বলেনি। আমরা নিজেরা এসেছি। গত বছর খাই নাই। এবার নিজেরা খাব।"

দুপুরের মধ্যে রান্না শেষ হলো। বটগাছের নিচে সবাই একসাথে বসল। কলাপাতায় ভাত, ডাল, তরকারি দেওয়া হলো। খাওয়া হলো। হাসি-গল্প হলো।

খাওয়া শেষে বাচু কিশুর কানে কানে বলল, "দেখলেন নেতা? মানুষ নিজে থেকে করে।"

কিশু মাথা নাড়ল। কিশুর চোখ ভিজে গেল। কিশু কিছু বলল না।

সন্ধ্যায় সবাই চলে গেল। ঘরের সামনে শুধু কিশু আর বাচু বসে ছিল। থালা-বাসন ধোয়া হলো।

বাচু বলল, "নেতা, এবার বুঝলেন?"

কিশু আকাশের দিকে তাকাল। তারা উঠেছে। কিশু বলল, "বুঝলাম। জোর করে কিছু হয় না। মানুষ নিজে বুঝলে সব হয়।"

রাত গভীর হলো। তালতলি বাজারের বাতি নিভে গেল। শুধু বটগাছের নিচে একটা ল্যাম্প জ্বলছিল।

কিশু সেই ল্যাম্পের আলোয় বসে ছিল। বাচু পাশে বসে ছিল।

পর্ব ৬

বহু বছর পরেও মানুষ এই গল্প বলে। বলে, সেবার নবর্ষে খাওয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু মানুষের মন জোড়া লেগেছিল।

কিশু আর কোনোদিন বড় আয়োজন করেনি। ছোট ছোট করে মানুষ নিজেরা করত। কিশু শুধু পাশে থাকত। পরামর্শ দিত।

ধনু ৫ বছর পর আবার নির্বাচন করল। এবারও জিতল। কিন্তু মানুষ আগের মতো ভিড় করল না। ধনুর মিছিলে লোক কম হলো।

কিশু বুড়ো হলো। হাঁটতে কষ্ট হতো। লাঠি লাগত। বাচু লাঠি দিয়ে কিশুকে ধরে নিয়ে যেত।

এক শীতের সকালে কিশু আর উঠল না। ঘুমের মধ্যেই চলে গেল। বটগাছের নিচের বেঞ্চ খালি পড়ে রইল।

খবরটা সারা তালতলি বাজারে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষজন কাঁদতে কাঁদতে এলো। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল।

বাচু কিশুর পাশে বসে ছিল। বাচু কারো সাথে কথা বলল না। শুধু মাঝে মাঝে কিশুর হাত ধরছিল।

কিশুকে দাফন করার পর ৩ দিন পর্যন্ত মানুষ ঘরে খাবার রান্না করেনি। শোক পালন করল।

চতুর্থ দিন সকালে আবার বটগাছের নিচে চাটাই পাতা হলো। মানুষ নিজেরা রান্না করল। বাচু সবার মাঝে বসে খাইলো। কারো চোখে পানি ছিল। কারো মুখে হাসি ছিল।

সেই থেকে নিয়ম হলো। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে মানুষ নিজেরা আয়োজন করে। কাউকে ডাকতে হয় না। কেউ খরচ দেয় না। সবাই মিলে করে।

নেতা নেই। কিন্তু নিয়ম আছে।

তালতলি বাজারের বটগাছ এখনও আছে।

পর্ব ৭

কিশু আর কোনোদিন বড় আয়োজন করেনি। ছোট ছোট করে মানুষ নিজেরা করত। কিশু শুধু পাশে থাকত। পরামর্শ দিত।

ধনু ৫ বছর পর আবার নির্বাচন করল। এবারও নির্বাচিত হলো। কিন্তু মানুষ আগের মতো ভিড় করল না। ধনুর মিছিলে লোক কম হলো।

কিশু বুড়ো হলো। হাঁটতে কষ্ট হতো। লাঠি লাগত। বাচু লাঠি দিয়ে কিশুকে ধরে নিয়ে যেত।

এক শীতের সকালে কিশু আর উঠল না। ঘুমের মধ্যেই চলে গেল। বটগাছের নিচের বেঞ্চ খালি পড়ে রইল।

খবরটা সারা তালতলি বাজারে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষজন কাঁদতে কাঁদতে এলো। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল।

বাচু কিশুর পাশে বসে ছিল। বাচু কারো সাথে কথা বলল না। শুধু মাঝে মাঝে কিশুর হাত ধরছিল।

কিশুকে দাফন করার পর ৩ দিন পর্যন্ত মানুষ ঘরে খাবার রান্না করেনি। শোক পালন করল।

চতুর্থ দিন সকালে আবার বটগাছের নিচে চাটাই পাতা হলো। মানুষ নিজেরা রান্না করল। বাচু সবার মাঝে বসে খাইলো। কারো চোখে পানি ছিল। কারো মুখে হাসি ছিল।

সেই থেকে নিয়ম হলো। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে মানুষ নিজেরা আয়োজন করে। কাউকে ডাকতে হয় না। কেউ খরচ দেয় না। সবাই মিলে করে।

নেতা নেই। কিন্তু নিয়ম আছে।

তালতলি বাজারের বটগাছ এখনও আছে। বেঞ্চটাও আছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেরা সেখানে বসে।

ওরা জিজ্ঞেস করে, "এই বেঞ্চ কার ছিল?"

বুড়োরা উত্তর দেয়, "একজন মানুষের। নাম ছিল কিশু।"

ছেলেরা আবার জিজ্ঞেস করে, "উনি কী করতেন?"

বুড়োরা বলে, "মানুষকে মানুষ বানাতে চাইতেন।"

সময় যায়। গল্প থাকে। (সমাপ্ত)

Popular posts from this blog

838) (Story_52) One day for the police inspector. (দারোগার একদিন।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman

839) (Story_53) Under the guise of fighting corruption. (দুর্নীতি দমনের আড়ালে।) _ Written by Junayed Ashrafur Rahman

583)(Story-26-19)Militant bases. (জঙ্গি ঘাঁটি।) - Written by Junayed Ashrafur Rahman ✒